গাজী লতিফ, একজন আশ্চর্য প্রাণের প্রস্থান

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:১৩ পিএম

গাজী ভাই, আমাদের কালের এক আশ্চর্য উজ্জ্বল মানুষ, চলে গেলেন আজ। যারা তাকে চেনেন না— তারা আর জানতেও পারবেন না কী দারুণ শিশু ছিলেন তিনি। সারাটা জীবন এক শিশুকে নিজের ভেতরে লালন করে গেছেন। ছিলেন শিল্পের মানুষ, সাহিত্যের মানুষ। গোপালগঞ্জ যখন খুব অবহেলিত এক মফস্বল, তখন তিনি সেখানকার কমবয়সী কিশোর-তরুণদের নিয়ে ছোটকাগজ শুরু করেছিলেন। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো এই কাজ। নিজের পকেটে টাকা নেই অথচ ছোটদের চা-সিগ্রেটের বিলটা দিতে হবে। কাগজ কেনার পয়সা নেই অথচ অন্য কেউ এলে আপ্যায়ন করতে হবে। পত্রিকা কম্পোজের টাকা নেই, বাজার করার টাকা থেকে দিয়ে দিতেন। দিনের পর দিন আমরা কখনও না বলতে শুনিনি তাকে। হয় নিজের পকেট থেকে, নয়তো অবস্থাপন্ন কাউকে নাছোড়বান্দার মতো ধরে কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতেন, দেওয়ার চেষ্টা করতেন। অনেকদিন পর্যন্ত বটবৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে ছিলেন তিনি।

মফস্বলকে বুকে ধারন করেন বলে হয়তো ঢাকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুব বড় মনে করতেন। ওদিকে আমরা কমবয়সীরা তখন আওড়াতাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ওই মোক্ষম লাইন, ‘আসলে কেউ বড় হয় না, বড়র মতো দেখায়’। তখন বলতেন বড় ভাবলেই বা ক্ষতি কী! তবুও আমরা সেই যৌবনের শুরু থেকেই কোনো বড়কে তেমন বড় মনে করতাম না। তার কথা মেনে না নিয়ে চা খেতে বসতাম একসাথে। এক আশ্চর্য গ্রহণযোগ্যতা ছিল তার মধ্যে। ছেলের চেয়েও ছোট বয়সীদের সাথে ইয়ার-বন্ধুর মতো মিশতেন। যারা তাকে বুঝতে পারত না, হয়তো অগ্রহণযোগ্য আচরণ করে ফেলত। কিন্তু গাজী ভাই নিমেষে ক্ষমা করে দিতেন। দিতে পারতেন। লোক দেখানো বিষয় নয়, মনেই রাখতেন না এসব। বলতেন, ওরা তো ভুল করবেই, আমি যদি মেনে নিতে না পারি তাহলে আমার ক্ষমতাটা কোথায়! তাহলে আমি বয়সে বড়ই বা হলাম কেন! এই যুক্তির পর আর কী-ই বা বলা যেতে পারে। যদিও খুব বিরক্ত লাগত সময়ে সময়ে।

গাজী লতিফের মতো আড্ডাবাজ মানুষও দেখা যায় না এখন। নিমেষে হয়ে যেতেন আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু। যে পরিবেশেই যেতেন সেখানটাকে আপন ভেবে নিতেন, তার মধ্যে আড়ষ্টতা কাজ করত না। মনেই হত না তিনি নতুন পরিবেশে আছেন। মনে হত যেন এক যুগ ধরে তিনি এখানেই আড্ডা মারেন। শোনা কথা, অনেকেই আছেন যারা সত্যতা নির্ধারণ করতে পারবেন, একবার নাকি সকালে নদীর ঘাট থেকে মাছ কিনে গাজী ভাইয়ের দেখা হয়ে যায় এক বন্ধুর সাথে। তারপর আড্ডা জমে ওঠে, একে একে ওখানে আরও লোকজন যুক্ত হয়। সকাল গড়িয়ে দুপুর, তারপর সন্ধ্যা। চেয়ারের নিচ থেকে পচা মাছের দুর্গন্ধ নাকে এলে গাজী লতিফের খেয়াল হয় ব্যাগে মাছ আছে। বাসায় যাওয়ার কথা তার। পচা মাছ ফেলে দিয়ে বাকি আড্ডা শেষ করে তবেই বাড়ি ফেরেন তিনি।

শিল্প-সাহিত্যের জন্য একজন মফস্বলের মানুষ যে এতটা পাগলামি করতে পারেন, সেটা গাজী লতিফকে যারা না দেখেছেন তারা বুঝবেন না। আমাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা অবসর সময়ে শিল্প-সাহিত্য করতাম। কিন্তু গাজী ভাইয়ের ব্যাপারটা ছিল আলাদা, তিনি বরং জীবনধারনের জন্য অন্যান্য কাজগুলোই করতেন অবসর সময়ে। সারাদিন কবিতার ঘোরের মধ্যে থাকতেন। শিশুর মতো সারল্যে তার জীবন কেটেছে। জীবনের কাছে এও তো কম পাওয়া নয়। গোপালগঞ্জের মতো অবহেলিত জনপদের অনেক মানুষকে তিনি কবিতার কথা শুনিয়েছেন, শিল্পের প্রতি অনুরাগী করেছেন। সকলে কবি নয়, কিন্তু সকলের মধ্যেই তিনি কাব্যানুরাগ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। অনেকে মনে করত ক্ষেপাটে। কিন্তু তিনি সেসব কিছু আমলে নিতেন না।

গাজী লতিফের সঙ্গে দুই কবি রাহেল রাজীব ও মেহেদি রাসেল

গাজী ভাইয়ের সাথে যখন আমার পরিচয় হয় তখন তিনি সারা দেশে পরিচিত ‘দূর্বা’ নামক ছোটকাগজটি সম্পাদনা করেন। কাগজটির সঙ্গে ছিলেন সোহেল রহমান, সারফুদ্দিন আহমেদ, সাঈদ জুবেরি, রূপম রোহান, নাজমুল ইসলামসহ আরও অনেকে। বছর দুয়েক পর ‘দূর্বা’র কোনো একটা সংখ্যা সম্পাদনার দায়িত্ব আমার ওপর বর্তায়। সারা দেশ থেকে তখন চিঠির খামে ভরে কবিতা আসত। প্রচুর নামজাদা কবি কবিতা পাঠাতেন। নামজাদা অর্থ হলো সারা দেশের সাহিত্য পত্রিকা এবং দৈনিকের সাময়িকীগুলোতে যারা ঘুরেফিরে লিখতেন। বেশ কিছু নাম ছিল কমন। তো, সম্পাদনা করতে গিয়ে আমি দেখলাম এসব নামকরা কবিদের কবিতা ঠিক যেন কবিতা হয়ে ওঠেনি। অনেকেই দায়সারা সব কবিতা দিয়েছেন। অথচ নামের কারণে ছাপতে হবে হয়তো। কিন্তু আমি যখন সম্পাদনা করব, তখন আমার মতই শেষ কথা। আমি এমনসব অকবিতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে কাগজের ঝুড়ি ভরে ফেলেছিলাম। গাজী ভাই বাইরে থেকে এসে দেখেন এই অবস্থা! হা হা করে উঠলেন। বললেন, এত বড় বড় নাম তুই ঝুড়িতে ফেলে দিলি! পরক্ষণেই মুখটা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। বললেন, পত্রিকা সম্পাদকের তো এমনই হওয়া চাই। সাবাস! ফালতু কবিতা ফেলে দিতে হবে, সেটা শামসুর রাহমান লিখলেও। সেদিন খুশি হয়েছিলাম। যদিও তিনি ফালতু কবিতা ফেলতেন না সবসময়, নানাবিধ কারণে বয়স বাড়লে সেটা করা যায় না। কম বয়সে অনেক কিছুই করা যায়।  

একটা ছোট ঘটনা দিয়ে শেষ করি। গাজী ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের ঘটনা। তখন সম্ভবত সদ্য কলেজে পড়ি, গোপালগঞ্জ থেকে একটা ভাঁজপত্র বের হলো। সেখানে একটা ছড়া লিখলাম। কলেজের বন্ধুদের কারো মাধ্যমে লেখার উপলক্ষটা এসেছিল এটুকু মনে আছে। তখন কেবল বছর আড়াই হয় গোপালগঞ্জে থিতু হয়েছি। সেই ছড়াটার অন্ত্যমিল দেখে মুগ্ধ হয়ে গাজী লতিফ প্রায় মাসখানেকের চেষ্টায় আমাকে খুঁজে বের করেন। পিতার সাথে একদিন আমাদের বাসায় এসে হাজির হন আচমকা। সেদিন তিনি পরিবারের অন্য সবার সামনে এমন সব কথা বলেন যেন মনে হয় আমি বিরাট একটা কিছু ঘটিয়ে ফেলেছি। খুব প্রশংসাযোগ্য কিছু, খুব অন্যরকম কিছু। কিন্তু এর আগেই দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার শিশু সাহিত্য পাতায় (সম্ভবত নাম ছিল চাঁদের হাসি) আমি নিয়মিত ছড়া লিখছিলাম। সেই পত্রিকার কয়েকটামাত্র কপি আসত গোপালগঞ্জ, কেটে কেটে জমিয়ে রাখতাম সেসব ছড়া। খুব কাছের দুয়েকজন ছাড়া কাউকে দেখাতে পারিনি সংকোচে। কিন্তু স্থানীয় একটা সামান্য ভাঁজপত্রের লেখার কারণে আমার একটা সংবর্ধনাই হয়ে গেল যেন পরিবারের সামনে।

অসংখ্য স্মৃতি মনে আসছে গাজী ভাইয়ের। কিন্তু লেখা কষ্টকর। যেহেতু কান্না পায় না আর ছোটবেলার পর, এই লেখাই কান্নার এক রূপান্তর। লিখতে বলতেন আমাদের সবাইকে, অনেক লিখতে বলতেন। দেখুন গাজী ভাই আপনার মৃত্যুর পরও আপনি আমাকে দিয়ে ঠিকই লিখিয়ে নিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত