নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

'বাংলাদেশে রুগ্ন গণতন্ত্রের একপাক্ষিক নির্বাচন'

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:০৯ পিএম

রবিবার নির্বাচনে টানা চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসবেন তা নিয়ে তেমন সন্দেহ নেই। কিন্তু বড় প্রশ্নটি হলো- দেশটির গণতন্ত্রের কতটুকু আর বাকী থাকবে?

প্রধান বিরোধী দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দমন করা হয়েছে। তাদের তৎপর হওয়ার সক্ষমতা নেই বললেই চলে। দলটির যেসব নেতা জেলের বাইরে আছেন তারা আদালতে অবিরাম হাজিরায় জর্জরিত অথবা যারা পালিয়ে আছেন তাদের পেছনে লেগে আছে পুলিশ। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ প্রতিযোগীতার পথে এতটাই একপাক্ষিকভাবে পরিষ্কার করেছে যে এখন দলটি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের ডামি প্রার্থীর সঙ্গে লড়ার আহ্বান জানায়, যাতে মনে হয় নির্বাচন চ্যালেঞ্জবিহীন হয়নি।

নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরে যাওয়ার দাবি করেছিল বিএনপি, যেন তার বদলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা যায়। কিন্তু তাদের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন শেখ হাসিনা। ফলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে।   

এমনকি বাংলাদেশ যখন দৃশ্যত সমৃদ্ধির পথ খুঁজে পেয়েছে, অভ্যুত্থান ও হত্যকাণ্ডের একটি যুগ অতিক্রম করেছে, তখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এই নির্বাচন এটাই দেখিয়ে দেয় যে- ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটি কয়েক দশক ধরে প্রধান দুটি দলের মধ্যে পুরনো বিবাদে জিম্মি হয়ে আছে।

সহিংসতার আশঙ্কা বাতাসে ভাসছে। বিরোধীরা ভোটের বিরোধিতা করছে। তারা বার বার দেশজুড়ে ধর্মঘট, অবরোধ ও গণঅসহযোগ আহ্বান করেছে। জবাবে তাদের ওপর তীব্র দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতা ও আইনজীবিদের মতে, অক্টোবরের মহাসমাবেশের পর বিএনপির কমপক্ষে ২০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভিতরকার ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় অবস্থানরত কূটনীতিকরা বলেছেন, কারাগারগুলো উপচে পড়ছে।   

মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর থেকে জেলে মারা গেছেন বিরোধী দলের কমপক্ষে ৯ জন নেতা-কর্মী। বিএনপি দেশজুড়ে আরও একটি হরতাল আহ্বান করেছে। এবার নির্বাচনের ঠিক আগে এই হরতাল। এর প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও অন্য অঞ্চলগুলোতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

শুক্রবার দিন শেষে ঢাকার একটি ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, ধারণা করা হচ্ছে এটি নাশকতা, যে ঘটনায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন। সংকট কেবল বাড়ছেই, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পরোক্ষভাবে এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা প্রত্যক্ষভাবে এই আগুন লাগানোর জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক পিয়েরে প্রকাশ বলেছেন, ‘নির্বাচনের পর উভয় পক্ষের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধির ঝুঁকি আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি যদি ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাদের অহিংস কৌশল ব্যর্থ বলে মনে করে, তাহলে অতীতের প্রকাশ্য সহিংসতার দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপের মুখে পড়তে পারে।’ পিয়েরে প্রকাশ বলেন, ‘যদি বিএনপি ব্যাপক সহিংসতা শুরু করে তাহলে তারা একটি ফাঁদে পা দেবে। প্রধানমন্ত্রীর দল আরও বিস্তৃত দমনপীড়নের পথে হাঁটছে, তারা বিরোধীদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘খুনি’ বলে বর্ণনা করে।’    

দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনে দেশটি পরিণত হয়েছে সাংঘর্ষিক ঘটনার উভয়মুখী সংকটে।

দেশটিতে গার্মেন্ট রপ্তানি শিল্পে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া শুরু হয়। এতে অর্থনীতি চমৎকার প্রবৃদ্ধি পায়। এতে এক পর্যায়ে গড় আয় ভারতকে ছাড়িয়ে যায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি গ্রহণের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, ৭৬ বছর বয়সী শেখ হাসিনা দেশটিকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। নিরাপত্তা বিষয়ক এজেন্সি থেকে শুরু করে আদালত, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। তাদেরকে যাদের সঙ্গে মতে মেলে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন।

সর্বশেষ উদাহরণ হলো শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ৬ মাসের জেল দেওয়া হয়েছে। একে ড. ইউনূস রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইউনূস জামিনে মুক্ত আছেন এবং আপিল করছেন। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটি রাজনৈতিক নয় এবং এটা শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা।  

বিএনপিকে ভেঙে ফেলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টাকে তার ব্যক্তিগত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ বলে মনে হয়।

বাঙালিদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক নিষ্পেষণ চালানোর পর রক্তাক্ত এক যুদ্ধে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। তখন থেকে বেশির ভাগ সময় দেশটি শাসন করছে এই দুটি দল। স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী নেতা ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। একই সঙ্গে পরিবারের অনেক সদস্যকে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অবঃ) জিয়াউর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় উত্থান হয় তার। জিয়া, এ নামেই তিনি বেশি পরিচিত, যিনি পরে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।

শেখ হাসিনা বিএনপিকে দেখেন সামরিক ক্যাডারদের দিয়ে গঠিত দল হিসেবে, যারা তার পিতার খুনিদের রক্ষা করেছিল। তার সহযোগীরা বলেন, এই দলটিকে ধ্বংস করে দিতে তার এই চেষ্টা অধিক পরিমাণে ব্যক্তিগত। ২০০০ এর দশকের শুরুর দিকে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন ওই সময়কার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার এক র‌্যালিতে গ্রেনেড হামলায় অনেক মানুষ মারা যান। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য রক্ষা পান। কিন্তু দলের নেতা ও কর্মী মিলে কমপক্ষে ২০ জন নিহত হন।

গত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ক্ষয় দেখা দিয়েছে, এ কারণে শেখ হাসিনার দমনপীড়ন বিশেষ করে তীব্র হয়ে উঠেছে।

করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধ পর্যায়ক্রমে আঘাত হানায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সংকুচিত করে বিপজ্জনক নিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ওই সঙ্কটে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।

এই সঙ্কট শুধু গার্মেন্ট শিল্পের ওপর বাংলাদেশের অধিক নির্ভরতার কথাই প্রকাশ করেছে এমন নয়, একই সঙ্গে ঢাকায় পশ্চিমা কূটনীতিকরা বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে লুকিয়ে আছে ‘ক্লেপ্টোক্রেটিক’ চর্চা। কূটনীতিকরা বলেন, দেশের অভিজাত শ্রেণি ব্যাংকগুলোকে কুক্ষিগত করেছেন এবং ধনীরা সামান্য জবাবদিহিতায় রয়েছেন। পার্লামেন্টের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ সদস্য ব্যবসায়ী। অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা গভীরভাবে জড়িত। এতে অর্থনৈতিক সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিরোধীরা ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য নিয়ে জনক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। অনেক বছরের মধ্যে প্রথম বড় মহাসমাবেশ করে। কিন্তু তা দীর্ঘ-স্থায়ী হয়নি কারণ, তাদের ওপর সরকারের দমনপীড়ন তীব্র হয়েছে।

বিএনপির দাবি তারা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়- যা নতুন নয়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় এই একই দাবি করেছিলেন শেখ হাসিনা। এই ব্যবস্থায় তিনি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীন দলের অপব্যবহারের জন্য এতটাই নাজুক যে, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে ভোট না হলে কোনো বিরোধী দল নির্বাচনে জয়ী হয়নি।

কিন্তু শেখ হাসিনা বিএনপির দাবিকে সংবিধানের লঙ্ঘন বলে মনে করেন। কারণ, তিনি ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়কের চর্চাকে বেআইনি এবং গণতান্ত্রিক চর্চায় বাধা, আখ্যা দিয়ে সংবিধান সংশোধন করেন।  

২০১৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল পার্লামেন্টের কমপক্ষে অর্ধেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়। এবার তা এড়াতে আওয়ামী লীগ ছোট ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নিয়েছে। তারা এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, দলটি একটি নতুন ‘টোকেন’ বিরোধী দল সাজিয়েছে। তাদের অনেকে নির্বাচনী পোস্টারে নিজেদের তাদের অবস্থান উল্লেখ করেছেন ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ হিসেবে।

বিএনপির নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গৃহবন্দি। তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে নির্বাসনে। দলটির বেশির ভাগ নেতা জেলে। এ অবস্থায় রবিবারের ভোটকে সামনে রেখে দলটির দৃশ্যমানতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন করে যাচ্ছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির হাতেগোণা যে কয়েকজন নেতাকে জেলে নেয়া হয়নি, তিনি তাদের অন্যতম। রিজভীর নিজের বিরুদ্ধে ১৮০টি মামলা আছে আদালতে। এক সময় তিনি দলীয় কার্যালয়ে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন। ঘুমিয়েছেন এক কোণায় ছোট্ট একটি বিছানায়। সেখান থেকে বেরিয়ে এলেই তিনি গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে। ১৯৮০র দশকে সাবেক সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভকালে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। এ কারণে একটি বেতের লাঠির ওপর ভর দিয়ে তাকে হাঁটতে হয়। বৃহস্পতিবার ভার্চ্যুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এই নির্বাচন বর্জন করেছি আমরা এবং সমমনা দলগুলো। এ সময় তিনি শনিবার নতুন করে হরতালের ঘোষণা দেন। তিনি আরও বলেন, এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং জনগণ এরই মধ্যে বুঝে গেছে যে, এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের একটি মহড়া। এটা একপক্ষীয় নির্বাচন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দুঃখজনক। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনে থাকলে নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত