বাম রাজনীতির বাস্তবতার পোস্টমর্টেম

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৫৯ এএম

হারতে বসেও জিতে গেছেন ১৪ দলীয় জোটপ্রার্থী, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। নৌকায় চড়ে ভোটে এগিয়েছেন লঞ্চের গতিতে। ১ লাখ ২২ হাজার ১৭৫ ভোটে জিতেছেন। তাও বাংলার বাঘ শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নাতি ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী একে ফাইয়াজুল হককে হারিয়ে। এবারের ভোটের বাজারে এটি যেনতেন ব্যাপার নয়। যেখানে মেননের সহকর্মী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর লঞ্চ গেছে, পঞ্চও গেছে। করুণ দশা হয়েছে  কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে। নৌকার প্রার্থী হয়েও ট্রাকডলা খেয়েছেন। ট্রাক মার্কার স্বতন্ত্র কামরুল আরেফিন জিতেছেন এক লাখ ১৫ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে। কেবলই নৌকার গুইে টানা গত তিনবারের এমপি ইনু হেরে গেছেন ২৩ হাজার ৩৫৪ ভোটের ব্যবধানে।

ইনু-মেননসহ চৌদ্দদলীয় তথা জোট মিত্রদের অনেকের খুব আশা ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের জিতিয়ে আনার গ্যারান্টার হবেন। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসতে হবে। টানা ১৫ বছর সরকার এবং ক্ষমতার সঙ্গে থেকেও কেন তারা নির্বাচনে জেতার মুরোদ অর্জন করতে পারেননি, সেজন্য ভর্ৎসনাও করেছেন। তারা সামনাসামনি দাঁত কেলিয়ে হেসেছেন। ঘাড়-মাথা চুলকিয়েছেন। ভেতরে ভেতরে মাইন্ড করেছেন। ভয়ও পেয়েছেন। এক পর্যায়ে তাদের নৌকায় চড়িয়ে দিয়েছেন, যেন অন্তত মার্কার জোরে পাস করতে পারেন। সেই সামর্থ্যও হয়নি তাদের। নিজে ডুবেছেন। আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকাকেও ডুবিয়েছেন।

এর আগে তাদের কয়েকজনকে তথ্য, বিমান, শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও করা হয়েছে। কয়েকজনকে স্থায়ী কমিটিতে দেওয়া হয়েছে। মেনন-ইনুর স্ত্রীদের সংসদের সংরক্ষিত আসনে এমপি পর্যন্ত করা হয়েছে। বাম শীর্ষ দুই নেতাকে হজ পর্যন্ত করিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু, চেয়ার পাওয়ার পর এক এক জনের ভিন্ন চেহারা দেখা গেছে। সাম্য-গণতন্ত্র মেহনতি মানুষের দরদ বা  বাম চর্চার বদলে কারও কারও বিরুদ্ধে ক্যাসিনো থেকে শুরু করে ওয়াইফাই-কলসেন্টার, ডিশ, ভিসা কারবারসহ নানা আজেবাজে কাজের অভিযোগ শুনতে হয়েছে। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণসহ মোটা ফাইলও গেছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এসবের জেরে গেল দফায় আর তাদের মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি। তবে, ছায়া দিয়ে রাখা হয়েছে। আবার অবিরাম সতর্কও করা হয়েছে। বার বার সতর্ক করায় তারা গোস্যা করেছেন। মাঝেমধ্যে টুকটাক হুমকিও ছেড়েছেন। তারা না থাকলে আওয়ামী লীগকে রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরতে হবে এমন সতর্কতা প্রকাশ্যে দিয়েছেন হাসানুল হক ইনু। তাদের খুচরা ভাবার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, তাদের নিয়েই আনায় আনায় মিলিয়েই ষোলো আনা হয়েছে সরকারের। নির্বাচনের ক’দিন আগেও সমঝোতা নিয়ে অসন্তুষ্টির মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ ঝেড়েছেন তিনি। থ্রেট করেই বলেছেন, ‘বিপদে ঐক্য, বিপদ কেটে গেছে মনে করে আত্মপ্রসাদে ভুগে ঐক্যকে অবহেলা করা আত্মঘাতী।’

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বামপন্থি কয়েকটি দলের জোটের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ইনু বলেন, ‘এটা ভুলে গেলে চলবে না যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন এবং তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনা রাজনৈতিক ঐক্যেরই ফলাফল।’ আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে তিনি এও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে বড়র অহংকার এবং ছোটর হীনমন্যতা পরিহার করা উচিত।’ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ তার এসব জ্ঞানী কথার কষ্ট হজম করেছেন। কুষ্টিয়ার স্থানীয় নেতাকর্মীরা হজম করেননি। তারা ইনুকে চুবাতে গিয়ে নিজেদের দলীয় প্রতীক নৌকাকে ডুবিয়েছেন। জিতিয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কামরুলকে।

অন্যদিকে, রাশেদ খান মেনন আগে থেকেই হাওয়া বুঝে সতর্ক থেকেছেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে বরিশাল-২ উজিরপুর-বানারীপাড়ায় নিয়ে ফেললেও গোস্যা দেখাননি। নির্বাচনী পোস্টারে বিসমিল্লাহ লাগানোসহ সরকার তথা আওয়ামী লীগ থেকে যা বলা হয়েছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আস্থায় নিয়েছেন। বোন জামাই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের স্বজন, বোন বিএনপি নেত্রী সেলিমা রহমানসহ পারিবারিক সোর্সে স্থানীয় বিএনপির সঙ্গেও একটি বোঝাপড়া করেছেন। এগুলোর বরকত পেয়েছেন। গত মেয়াদে মন্ত্রী না করায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে (২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি, নিজেই তার প্রমাণসহ) টুকটাক মন্তব্যের বিষয়গুলোরও ফয়সালা করেছেন। আওয়ামী লীগকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, হুবহু এ রকম বলেননি তিনি। মিডিয়া এগুলো রঙ লাগিয়ে প্রচার করেছে। আওয়ামী লীগের জন্য জীবন দিয়ে দেবেন, চীনের সঙ্গে তার খাস খাতির সরকারের কল্যাণে নিবেদন করবেন বলে তার প্রতি বিশ্বাস ফিরেছে আওয়ামী লীগের।

আরেক বাম নেতা সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াও হাল ছাড়ছেন না। এর আগেরবার টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী করার কথা তিনি স্মরণে রেখেছেন। মাঝে কয়েক দিন মুখ ফসকে দুর্নীতি-লুটপাট, পাচার-জালিয়াতি নিয়ে একটু আধটু বললেও সামনে আর বলবেন না বলে আশ্বাস দিয়ে চলছেন। তার চীনা কানেকশনের প্রচারও আছে। আওয়ামী লীগ বা সরকার একজন দিলীপ বড়ুয়ার আশ্বাসের ধার ধারে কিনা, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তবে, এবার নির্বাচনের মাঠে তিনি কোনো ডিমান্ড করেননি, উল্টাপাল্টা কিছু বলেনওনি তাও সত্য। 

এটিই বাংলাদেশের হাল বাম রাজনীতির বাস্তবতা বা পোস্টমর্টেম। কৌতুকের আইটেমও। ট্র্যাজেডি তো বটেই। মার্কস, লেনিন, মাও সে তুংয়ের সহোদরদের সততা, নির্মোহতা চর্চার নমুনা কোথায় এসে ঠেকেছে? ঘরে-বাইরে তাদের কত শান-সমাদর, যশ-খ্যাতি। ডিগবাজির ফজিলতে এখন কত ভক্ত-মুরিদ এই পাতি কমরেডদের! দুনিয়ার সুখ আর আখেরাতের সম্ভোগ সবই কব্জায় নেওয়ার চেষ্টা। তারা ইহকাল-পরকাল দুই দুনিয়াতেই গোল্ডেন জিপিএ। এলাকার মুসল্লিদের সঙ্গে মোলাকাত করেন। 

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দল আর বামদের বেশ মিল। জামায়াতি-হেফাজতিদের মতিগতিও এমনই। এরা সবাই শুদ্ধতাবাদী। সবারই দাবি শুদ্ধ ইসলামের খেদমতগার একমাত্র তিনিই। তারাই ইসলামের একমাত্র পরিবেশক। প্রতিটি বাম দলও ভাবভঙ্গিতে বোঝায় তারা ছাড়া শুদ্ধ বামের সোল এজেন্ট আর কেউ নন। এই গোছের শুদ্ধ বামরা কিছুদিন পর ভেঙেচুরে শুদ্ধতম হন। এক চিমটে মার্কস, আধখানা চে, সিকিখানা লেনিন, এক চামচ জলিল-তাহের, আড়াই চামচ তদ্বির ব্যবসা, সোয়া তিন গ্রাম শ্রেণি সংঘাত, কয়েক পিস শত্রু খতমের যজ্ঞে তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন নিজেদের শুদ্ধতা। তাদের প্রতি মুগ্ধতায় বামপন্থার মিছিলে কত হাজার হাজার মানুষই ভিড়েছে। আবার ছেড়ে চলেও গেছে হাজারে হাজারে। কারণ এদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এমনকি জাতীয় পার্টি করলেও ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার সুযোগ-সম্ভাবনা ব্যাপক। তা হেলায় হারাবে ক’জনে। আবার ইহকালে ক্ষমতার পাশাপাশি পরজনমে পরম শান্তির মোহাসক্ত হওয়ার কমরেডও এদেশে কম নন। এমনিতেই সারল্য-মমতায় গৌরব খোঁজার আহাম্মকের সংখ্যা দুনিয়াতে প্রায় শূন্যের কোটায়। বাম ঘরানার অধঃপতন আরও বেশি। সেখানে প্রবঞ্চনার পথে সাফল্য খোঁজার তুমুল প্রতিযোগিতা। প্রতারক, মিথ্যুক, শঠদের সঙ্গে পেরে ওঠার লড়াই। যে কারণে অন্তঃপ্রাণের কমরেডদের অনল বর্ষণেও এই প্রজন্মের তৃপ্তি মেলে না, মিলবে না।  বরং তাদের কাছে কখনো কখনো এর চেয়ে রাস্তার পাশে ঢোল মলমের ক্যানভাসারের লেকচার বেশি উপভোগ্য। তারা সাদা চোখেই দেখছে কমরেডদের কায়কারবার। অন্তত আমাদের কুমিল্লা অঞ্চলে কমরেড দেখলে এ প্রজন্ম বলে ওঠে এমুই ন, হেমুই যান। এবার জিরান। হরি খাঁড়ান।

এক ইনু, এক মেনন, এক দিলীপ বড়ুয়া কেউই এখন একমাত্র নন। তাদের আশেকানরা অনেকেই মনে মনে ইনু-মেনন, দিলীপে অনন্য। এই শুদ্ধাশুদ্ধিতে এখন যত বাম তত ভাগ। তাদের কাণ্ডকীর্তিতে ধর্ম, প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, কমিউনিস্ট-সোশ্যালিস্ট, আস্তিক-নাস্তিক সব একাকার-ম্যাসাকার। তারা কেউ কেউ শোষণ-দুর্নীতি অব্যাহত রাখতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। কেউ চায় আবার ক্ষমতায় যেতে। এত ঠুনকো, কম দামি মাল ছিলেন না বামরা।  রাজপথে তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কোথায় ছিল না তাদের সাহসী ভূমিকা? দুঃখজনকভাবে আন্দোলন সংগঠন, পরিচালন, বেগবানকরণে বামদের অবদান হাইজ্যাক হয়েছে বুর্জোয়াদের কাছে। নিজেদের আঁতলামি আর জ্ঞানগরিমার তত্ত্বের ক্যাচালের সুযোগই নিয়েছে বুর্জোয়ারা। কমরেটে বেচাবিক্রি করে ফেলা যায় বামদের। সেই সূত্রে নামকরা বামদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টির উঠান চষেন। বাকিদের অবস্থা করুণ। রাজনীতি, সমাজ-সংসার সবখানেই অনুপযুক্ত-অখাদ্য হয়ে তাদের কষ্টকর দিনাতিপাত। কোনো রকমে দম-নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকা এই শ্রেণিকে ভোটাররা বাতিল মাল মনে করে। স্বজনরাও এড়িয়ে চলে। এতে দেশে-সমাজে বাড়ছে সময়োপযোগী বোধ-বুদ্ধিমান। এই বুঝবানরা মলমূত্র ছাড়া আর কিছুই ত্যাগ না করার ব্যাপারে আপসহীন।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত