মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন সামরিক জান্তার লড়াই ক্রমে তীব্রতর হচ্ছে। সংঘাতের কারণে রাজধানী সিত্তে থেকে পালাচ্ছে মানুষ। হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ছেড়ে অন্য জায়গায় যাচ্ছে নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু অনেক বাসিন্দা শহর ছাড়তে পারছে না। এই মুহূর্তে শহরটিতে কার্যত বন্দিদশায় রয়েছেন মানুষ। এদিকে বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি রাখাইনের বুথিডংয়ে জান্তার বাহিনীর হামলায় এক ডজনেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছে। সারা রাখাইনেই জান্তার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই হচ্ছে আরাকান আর্মির। জান্তার সেনারা সিত্তে শহরের দিকে কেন্দ্রীভূত হতে যাচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সম্প্রতি দুপক্ষের লড়াই যেন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরাকান আর্মি জান্তার বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। রাজধানী সিত্তের আশপাশের এলাকা থেকে উচ্ছেদ হয়েছে জান্তার অনুগত বাহিনী। বিশেষ করে মারুক-ইউ, মিনবিয়া, কিয়াউকতাউ এবং রাথেনদং এলাকা থেকে জান্তার বাহিনীকে বিতাড়িত করেছে আরাকান আর্মি।
গতকাল শনিবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন ‘ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা রো নায় স্যান রিউইন বলেন, গত দুই দিনে বুথিডংয়ের হাপন নিও লেক গ্রামে সামরিক বাহিনী এক ডজনেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে জান্তা।
এদিকে সামরিক জান্তা গত বছরের নভেম্বর থেকে রাখাইনের রাজপথ ও জলপথ বন্ধ করে রেখেছে। আরাকান আর্মির অব্যাহত আক্রমণের মুখে জান্তার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই তীব্র হওয়ার কারণে মানুষ রাজধানী সিত্তে শহর ছাড়তে চাইছে। কিন্তু জান্তর বাধায় তা করতে পারছে না মানুষ। যেসব মানুষ বাড়িতে অবস্থান করতে চাইছেন তারা বাড়িতেই বাংকার খুঁড়েছেন। কিন্তু যারা এলাকা ছাড়তে মরিয়া তারা কাছের প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে চাইছেন। মোটকথা তারা এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অস্থির সময় পার করছেন।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানী সিত্তের একজন বাসিন্দা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সিত্তে শহরে আপনি রাস্তা ও জলপথ ব্যবহার করতে পারবেন না। তাই অনেকে ইয়াঙ্গুনে যেতে চাইছেন এবং সেখানে যেতে আকাশপথই একমাত্র ভরসা।’ সিত্তে থেকে ইয়াঙ্গুনে প্রতিদিন মাত্র চারটি ফ্লাইট রয়েছে। প্রতি ফ্লাইটে মাত্র ৫০ জন লোক যায়। আগামী মার্চের শেষ পর্যন্ত সিত্তে থেকে ইয়াঙ্গুনের বিমান টিকিট শেষ হয়ে গিয়েছে। মানুষের শহর ছাড়ার হিড়িক পড়েছে।
সিত্তে শহরের জনসংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। এর মধ্যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও রয়েছেন। তবে এই হিসাবটি ২০১৯ সালের। বর্তমানে জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, সংঘাতের জেরে সিত্তে ছেড়েছেন ৩০ শতাংশের মতো বাসিন্দা।
আরাকান আর্মি আরও দুটি জাতিগত নৃতাত্ত্বিক সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গঠন করেছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে তারা যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। এর ফলে দেশের উত্তর ও পশ্চিমে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে জান্তার বাহিনী। গত সপ্তাহে আরাকান আর্মির কাছে প্রায় ৩০০ সেনা আত্মসমর্পণ করেছে। এতে জান্তার হাত থেকে ছুটে যায় কিয়াউকতাউ এলাকার দুটি চৌকি। গত বুধবার অ্যালায়েন্স একটি বিবৃতিতে বলে, সিত্তে শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরের বন্দরনগরী পাউকতাউ দখল করে নিয়েছে আরাকান আর্মি।
রাখাইনে সিত্তে শহরসহ উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলিতে ইন্টারনেট ও টেলিফোন মোবাইলফোন সংযোগ বন্ধ। ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলতে দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্য কিনতে নানা সংকটের মুখে পড়েছে মানুষ। তেল থেকে শুরু করে খাবার-সব কিছুর ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে সিত্তেসহ আশপাশের এলাকায়।
বাসিন্দারা জানান, সিত্তে থেকে ইয়াঙ্গুনের বিমানের টিকিটের চড়া দাম। টিকিটের দাম ১৬৬ ডলার থেকে শুরু করে ২৩৮ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। দরিদ্র মানুষরা টিকিট কিনতেও পারছে না এবং তাদের যাওয়ার মতো উপায়ও নেই। আবার ইয়াঙ্গুনের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক। সেখানে গিয়ে আরও বিপাকে পড়ার শঙ্কায় মানুষ।
