মাঠের খালেদা আর ফিরবেন না

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৫৯ এএম

সংসদে না হলেও রাজনীতির মাঠে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করার মতো শারীরিক অবস্থায় নেই আপসহীন নেত্রী অভিধাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া। নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন তিনি শয্যাশায়ী। বয়সের ভারেও ভারাক্রান্ত। গত ১৫ আগস্ট ৭৯ বছরে পা দিয়েছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।

প্রায় ছয় বছর প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দল পরিচালনায় কার্যত নিষ্ক্রিয় তিনি; আগামী দিনেও সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখন বিএনপির নেতৃত্ব কার্যত তার বড় ছেলে তারেক রহমানের হাতে। দলটির সিনিয়র নেতারাও সভা-সমাবেশে জোর দিয়ে বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বেই বিএনপির এক দফার আন্দোলন চলছে। আন্দোলনে সফলতা না আসায় কিছুটা চিন্তিত খালেদা জিয়া।

বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, কৌশলে সরকার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করে সরকার গঠনও করেছে। নির্বাচনের সময় বিএনপিপ্রধান রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া নেতাকর্মীদের কাছে জিজ্ঞেস করেছেন। আন্দোলন সফল না হওয়ায় ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন তিনি।

গত ১১ জানুয়ারি খালেদা জিয়া তার গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় ফিরেছেন। জানা গেছে, ওইদিনের পর দলের কোনো নেতা তার সঙ্গে দেখা করতে যাননি বা তিনি তাদের দেখা করতে দেননি।

দলের সাধারণ নেতাকর্মী, দেশের সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা তিনি কি নিভন্ত? সবখানে আলোচনা খালেদা জিয়া কি আর রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়াতে পারবেন না? এরশাদবিরোধী ভূমিকা এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার জীবন কি অস্তাচলে যেতে বসেছে?

বিএনপির নেতারা অবশ্য বলছেন, আপাতত খালেদা জিয়ার শারীরিক সুস্থতাকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। তারা বলেন, খালেদা জিয়াই দলের এবং সরকারবিরোধী রাজনীতির ‘ঐক্যের প্রতীক’। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, আবার জেলে যাওয়ার মতো অবস্থায় তিনি নেই। আবার দলের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার সুযোগও নেই।

এখন তারেক রহমানের হাতেই দলের স্টিয়ারিং। দলটির সিনিয়র একাধিক নেতার মতে, হয়তো বিএনপিপ্রধান সুস্থ হয়ে উঠবেন; দেশের পক্ষে, দলের পক্ষে রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন। কিন্তু বিএনপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থায় তিনি পৌঁছতে পারবেন না। আগের মতো মাঠ দাপিয়ে বেড়াতে পারবেন না।

বিএনপির অন্তত চারজন নীতিনির্ধারক নেতা সম্প্রতি খালেদা জিয়ার রাজনীতি প্রসঙ্গে বক্তব্য দিয়েছেন। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা-সক্ষমতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বিষয়টি নির্ভর করছে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং আমাদের দলের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর।’ স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জানাজা নিয়ে যা ঘটল তাতে শেখ হাসিনার সময়ে খালেদা জিয়ার জানাজা আমরা ঠিকমতো করতে পারব কি না সন্দেহ।’ স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসুন এবং এসে দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিন এ আশা করি।’ স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা নিশ্চিত তিনি আবার রাজনীতিতে ফিরবেন, লাখো-কোটি মানুষের সামনে বক্তব্য দেবেন।’

এ নেতাদের কথাতেও খালেদা জিয়ার সুস্থতা একটি আশার বিষয়, পরিপূর্ণ নিশ্চয়তার বিষয় নয়। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিল বিএনপি, তবু তারা আন্দোলন করেছে। চলতি বছর ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ‘এক দফা’র আন্দোলন করছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে এখনো বিএনপি কর্মসূচি পালন করে। দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুতে আরও কর্মসূচি দিতে যাচ্ছে তারা।

বিদেশে না যাওয়া ও নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়া এ দুই শর্তে কারাগার থেকে নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি পান খালেদা জিয়া। তখন থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে রয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে দেশে ফিরে দুর্নীতির মামলা মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তাকে কারাগারে যেতে হবে এটা ভাবেননি দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের ধারণা ছিল, কিছুদিনের মধ্যেই খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। এখন তিনি বাসায় এবং নিষ্ক্রিয়ই বলা চলে।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে থাকা একজন চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো আপসহীন নেত্রীকে আর পুরনো রূপে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এখন তিনি যে শারীরিক অবস্থায় রয়েছেন তাতে চিকিৎসকরা ভেঙে যাওয়া দেয়াল কোনোমতে সোজা রাখার বা ঠেকিয়ে ব্যবস্থা করেছেন মাত্র। তার রোগগুলো পরিপূর্ণভাবে সারানো সম্ভব নয়। বার্ধক্যজনিত রোগও আছে। রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ একেবারেই নেই বলা যায়। তবে ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকতে পারবেন।’

১৫৬ দিন হাসপাতালে থেকে ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় ফিরেছেন তিনি।

তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে ম্যাডাম বাসায় গেছেন। বোর্ড এখন তার চিকিৎসা বাসায় গিয়ে করবে।’

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তারেক রহমানের হাতে। লন্ডন থেকে তিনি দল পরিচালনা করছেন। স্থায়ী কমিটির সভাগুলোও তার সভাপতিত্বেই হচ্ছে।

বিএনপির নেতারা আশা করছেন, চেয়ারপারসন সুস্থ হয়ে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন। তার আগপর্যন্ত তারেকের নেতৃত্বেই দল চলবে। আর তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়েছেন খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তেই। এখনো দলের সব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খালেদা জিয়া অবগত থাকেন।

ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বেপারি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনীতি প্রসঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করতে সরকার ব্যস্ত। সরকারও বিশ্বাস করে, খালেদা জিয়ার চলাফেরার সক্ষমতা নেই। তিনি দলের একজন অতুলনীয় নেতা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘মাঠে থাকার একটা প্রভাব তো থাকেই, যা চিরকালীন। এখন যা অবস্থা তিনি (খালেদা জিয়া) আবার মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবেন বলে মনে হয় না। হয়তো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পারবেন কিন্তু মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো আর হবে না। তবে তিনি দেশি বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির ট্রাম্পকার্ড।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত