কোন আলো লাগল চোখে...

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:০৫ এএম

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছিলেন, ‘বইয়ের মতো এত বিশ্বস্ত বন্ধু আর নেই।’ আবার মার্ক টোয়েনের সেই উক্তি, ‘ভালো বন্ধু, ভালো বই এবং একটি শান্ত বিবেক : এটিই আদর্শ জীবন।’ গতকাল শুক্রবারের সকাল। রাজপথে ‘আলোর’ শোভাযাত্রা। যোগ দিয়েছেন বইকে বিশ্বস্ত বন্ধু করে নেওয়া শত শত আলোকিত মানুষ। শোভাযাত্রার সামনে আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আলোর মিছিলে যোগ দিয়েছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজসহ দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বরা। এ ছাড়া শোভাযাত্রার বাড়তি লাবণ্য দিয়েছে বইপ্রেমী সর্বস্তরের মানুষ। এ যেন কবিগুরুর সেই কথা, ‘বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেওয়া সাঁকো।’

গতকাল শুক্রবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছিল ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদযাপন। এ উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে শুরু হয় শোভাযাত্রা। এতে গ্রামীণ ঐতিহ্যে ছাপা পোশাক আর মাথায় বর্ণিল টোপর পরে অংশ নেন বইপ্রেমীরা। শোভাযাত্রার বাড়তি আকর্ষণ বাংলার ঢাক, চাকমা ও মণিপুরী নৃত্য, লাঠিখেলা, মুহুর্মুহু বাদ্যযন্ত্র। শোভাযাত্রাটি বাংলা মোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এসে শেষ হয়।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবন সাজানো হয় মনোমুগ্ধকর সাজে। এই সাজসজ্জায় গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের লোকশিল্প। সড়ক ও দেয়ালে আঁকা হয়েছে আলপনা। আলপনায় তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নানান কার্যক্রম।

এ ছাড়া দিনব্যাপী আয়োজনে দেশাত্মবোধক গান, নাচ, বাউলসংগীত, আবৃত্তি ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সব বয়সী মানুষের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। অনুষ্ঠান ঘিরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সামনে কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত, কেউবা বই পড়ার পুরনো সঙ্গীকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত।

দীর্ঘদিন পর বিশ্বসাহিত্য প্রাঙ্গণে এসে খাইরুল আলম নামে একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলেজপর্যায়ে বই পড়ার মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আমার আত্মার বন্ধন তৈরি হয়। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে দল বেঁধে বই পড়তে আসতাম। এখন চাকরি-সংসারের চাপে তেমন আসা হয় না। তবে ছুটির দিনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হওয়ায় ছেলেকে নিয়ে এসেছি। চমকপ্রদ অনুষ্ঠানে এসে পুরনো দিনের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। সব মিলে আজকের আয়োজন বইপ্রেমীদের মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।’

অনুষ্ঠানে আলোচনাসভায় বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব খায়রুল আলম সবুজ বলেন, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা অনেক দিনের। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে শুরু থেকেই আছি। ইন্দিরা রোড থেকে শুরু করে বর্তমান নতুন ভবন সবখানেই স্যারকে সঙ্গ দিয়েছি আমরা। একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও সাহস দিয়ে স্যার দেখিয়ে দিয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকেও বড় কিছু করা যায়।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৪৫ বছরে বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্রোতের বিপরীতে গিয়েও যে কিছু একটা করা যায়, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। রাস্তায় রাস্তায় বইয়ের লাইব্রেরি ছুটে বেড়ানোর বিষয়টি একসময় অকল্পনীয় ছিল। আমার ধারণা, আরও ৪০ বছর পর সমগ্র বাংলাদেশেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলো ছড়িয়ে পড়বে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে তরুণরা আজ বিপথগামিতার দিকে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ তরুণরা বই পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ তাদের বইপ্রেমী করে গড়ে তোলা। সারা দেশে প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত