নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বাহক শীতলক্ষ্যা নদী। এ নদীকে ঘিরেই জেলার গোড়াপত্তন। জেলাটি শিল্প-বাণিজ্যসমৃদ্ধ নগরীতে রূপান্তরিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম আদি ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে সৃষ্ট শতাধিক কিলোমিটার দীর্ঘ শীতলক্ষ্যা নদী। কিন্তু এখন স্বার্থান্বেষী মহলের আগ্রাসন আর দূষণের কবলে পড়ে নদীটি ধুঁকছে।
দেখা গেছে, শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীর ও আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে শিল্প কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানের শিল্প ও তরল বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীতে। বহু ডাইং কারখানার বর্জ্য ফেলার পাইপগুলো পানির নিচ দিয়ে নদীতে নেওয়া হয়েছে, যাতে দৃশ্যমান না হয়। বছরভর অবিরাম শিল্প প্রতিষ্ঠানের দূষিত বর্জ্য নদীতে ফেলায় বর্ষাকালে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও শুকনো মৌসুমে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নেয়। পানির রঙ কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় আর হুমকির মধ্যে পড়ে জনস্বাস্থ্য। নদীর তীরের বাসিন্দারা পড়েন দুর্ভোগে।
স্থানীয়রা জানান, এক সময় শীতলক্ষ্যা নদীই ছিলে দুই পাড়ের বাসিন্দাদের ভরসা। গোসল, রান্নাবান্না এমনকি নদীর পানি পানও করা হতো। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা। নদীর পাড়ের পরিবেশ ছিল সুন্দর। আজও নদীর বিভিন্ন স্থানে পাকা ঘাট থাকলেও গোসল আর হাঁড়িপাতিল ধোয়ার দৃশ্য হারিয়ে গেছে। সেসব ঘাট দিয়ে এখন ওঠানামা করছে পাথর, বালু আর বিভিন্ন মালামাল।
নদীতীরের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল, আঁটি, ওয়াপদা, আজিবপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদী ও তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শিল্প কারখানার বর্জ্য ও বিষাক্ত পানি পাইপ দিয়ে পড়ছে নদীতে। নদীর পাড়ের সৌন্দর্যের জন্য করা ইকোপার্কের গাছ ও ওয়াকওয়ে নষ্ট করে চালানো হচ্ছে দখল আগ্রাসন। নদীতে অবৈধভাবে বসানো হয়েছে একাধিক ড্রেজার। সরকারি অর্থে গড়ে তোলা বনায়ন নষ্ট করে রাখা হয়েছে পাথর বালুর স্তূপ।
নদীতীরের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, তখন নদীর পানি দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করা হতো। এমনকি নদীর পানি পানও করতাম। জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গোসলের জন্য বিভিন্ন স্থানে পাকা ঘাট ছিল। এখন কিছু ঘাট থাকলেও বর্ষাকালে গোসল ও কাপড় ধোয়া ছাড়া অন্য কোনো কাজে নদীর পানি ব্যবহার করা যায় না। আবার শুকনো মৌসুমে দুর্গন্ধে পানির কাছে যাওয়া যায় না।’
নদীতীরের আরেক বাসিন্দা আলমগীর বলেন, ‘দখল ও দূষণের পাশাপাশি নদীটি হয়ে গেছে লাশ গুমের অন্যতম মাধ্যম। কিছুদিন পরপরই নদীর বিভিন্ন এলাকায় ভেসে ওঠে মানুষের মৃতদেহ। পুলিশ লাশ উদ্ধার করলেও অধিকাংশের পরিচয় শনাক্ত হয় না। তারা হত্যার শিকার হলেও তথ্যপ্রমাণের অভাবে ঘাতকরা পায় না কোনো সাজা।
নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, নদীটিকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।