যদি না দেই

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:২৭ পিএম

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে দাঁড়ালাম।

উৎসাহের তাড়না এসেছিল বন্ধুদের মাধ্যমে।

আমাদের বাঙালিদের মধ্যে বহুকাল চর্চিত একটি প্রবণতা আছে। আপনি যদি অনন্যোপায় হয়ে বা কোনো মহৎ কাজ করার জন্য সক্ষম বন্ধুদের কাছে ধার চানশ্ব আপনি পাবেন না। কিন্তু আপনাকে বিবাহিত করতে উৎসাহী বন্ধুদের কাছে ধার পাবেনশ্ব প্রায় না চাইতেই।

নির্বাচনের সময় সঙ্গ দেওয়া উৎসাহী বন্ধুরা অনেকটা এই বিবাহজনিত ধার দেওয়া বন্ধুদের তরিকার।

তবে ক্যাম্পেইন শেষে সান্তনা হয়ে ফেরার পথে এক প্লেট মোরগ পোলাও বা বিরিয়ানি যে এসব বন্ধুদের একটি উদ্দীপক সেটা আমি জোর গলায় বলতে চাই না। তাদের আন্তরিকতায় আমার আস্থা আছে-ছিল।

যে পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি, সেটা শুনলে আসার দুর্বুদ্ধির প্রতি আপনার কিঞ্চিৎ অনুকম্পা হবে। সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র সংসদে শ্রেণি প্রতিনিধি। শুনতে খুব হেলাফেলার মনে হচ্ছে তো!

কিন্তু সেই ১৯৭০ সালের উন্মাতাল সময়ের শখানেক ছাত্রছাত্রীর প্রতিনিধি হওয়া সহজ বৈতরণী ছিল না।

দিনের বেলায় কোনোরকমে ক্লাসে হাজিরা দিয়ে মিছিল করতে বের হতাম। বিকেলে কলেজের ইউওটিসির অধীনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাবিলদারের ওস্তাদিতে সামরিক ট্রেনিং নিই।

ভারী বুট, নয় পাউন্ড ওজনের ৩০৩ এনফিল্ড রাইফেল, বেয়োনেট নিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের তড়পানির পর শরীরে কথা বলার শক্তি থাকে নাশ্ব গাল দিতে ইচ্ছা হয়।

বাসায় ফিরে শিঙাড়া-ছানা খেয়ে শরীরে বল পাই। তখনই জেগে ওঠে ক্যাম্পেইনে খাবার উত্তেজনা। আমাদের ক্লাসের দুই সেকশন মিলিয়ে শতাধিক ছাত্রছাত্রী ভোটার। দিনের বেলা কলেজেই ছেলে বন্ধুদের কাছে ভোট চাই। সহপাঠী ছাত্রীদের সঙ্গে কলেজে কথাবার্তা হওয়ার সুযোগ ছিল না। ছাত্রীদের সংখ্যা কম না। ত্রিশজন।

আমার নির্বাচন উপদেষ্টাদের নিয়ে ছাত্রীবন্ধুদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে ভোট চাওয়ার মধ্যে অন্যরকম পুলক জাগানিয়া উত্তেজনা ছিল।

কিছু ভালো রেজাল্ট করায় বাবা একপ্রস্ত স্যুট সেলাই করিয়ে দিয়েছিলেন আমার জন্য। পৌষের শীত উপেক্ষা করে আমরা সহপাঠিনীদের বাড়ি যেতাম। সফস্বল শহর ফরিদপুর। জনবিরল শীতার্ত সড়কে নিঃসঙ্গ লাইটপোস্ট কেঁপে কেঁপে উঠত। কেউ হারমোনিয়ামে সুর ভাজাত। সাড়া পেতাম। শীতকুহেলীকে জমাট বেঁধে থাকত ধূপ, ছাতিম ফুলের গন্ধ। আমরা বিকল হয়ে পড়তাম।

বেশ চলছিল। আমার উপদেশকম-লীর প্রবল পক্ষ বন্ধু কমল একদিন এসে বলল, তোকে সুখেন দা জরুরি তলব করেছে।

ভুলেই গিয়েছিলাম মফস্বল শহরে এই সময়টা থিয়েটার, বাণিজ্য মেলার সময়।

শহরের প্রবীণদের নাট্যানুষ্ঠান এক মহা-তামাশার ব্যাপার। শহরের নামকরা ডাক্তার, উকিল-মোক্তার, থানার দারোগা পর্যন্ত মঞ্চে অবতীর্ণ হন। নারী চরিত্রে আজকাল আর পুরুষদের দর্শকরা নিতে চান না। বাধ্য হয়ে নারী অভিনেত্রী ভাড়া করতে হয়। অভিনয়ের দিন প্রধান অতিথি হন ডিসি সাহেব, নয়তো এমপি সাহেব। দর্শকাসনের সামনের সারি আলোকিত করেন আড়তদার, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, শুঁড়িখানার মালিক, বাজার সমিতির নেতা, যজ্ঞের যজমান তো এরাই।

রাত ১০টায় পর্দা ওঠে, যবনিকা হয় ভোরবেলা। কল্যাণ মিত্রের নাটক বলে কথা!

রেডিওতে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের নাটক শুনতাম নিয়মিত। নিজের উচ্চারণ ঘষে নিতাম। আমাদের পাড়াতুতো নাট্যদলের অধিকারী সুখেন দার সঙ্গে কেতার নাটকের অভিনয় কুশলতা নিয়ে অনেক গুড় গুড় কথা হতো। সেই সুবাদে গতবার আমাকে প্রম্পটার বানিয়ে দিলেন। এ বছর ইলেকশন ব্যস্ততায় আর ওমুখো হইনি। সুখেন দার ডাকে তাই ঘাবড়ে গেলাম। কমল ভরসা দিল। মহড়া প্রায় শেষের দিকে। সাত দিন পরই মঞ্চায়ন হবে।

ভাবলাম গিয়েই দেখি না!

আমাদের পাড়ার নাটকের মহড়া হয় এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশস্ত কামরায়। দলের সদস্যরা অধিকাংশ আমার বয়সী, সুখেন দাশ্ব তার দু-চারজন বন্ধুবান্ধব আমাদের চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় হবেন। এখানে মেয়েরাই মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করে। কারও বোন বা তার বান্ধবী, নায়িকা হন, পাশর্^চরিত্রে মাসি পিসিরাও।

মহড়া ঘরে ঢুকে দেখলাম, চায়ের বিরতি চলছে। সুখেন দা ঘরে নেই। বোধ হয় বাইরে চাসহ সিগারেট ফুঁকছেন। ঘর জুড়ে সতরঞ্জি পাতাশ্ব যেখানটায় বাদ পড়েছে, চটের বস্তা পেতে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর কুশীলবরা চাদর এঁটে বসে গরম চা পান করতে করতে মশা আর শৈত্য এড়াচ্ছে। টিমটিমে একশ পাওয়ারের একটি বাল্ব ঝুলে আছে সিলিং থেকে। এই মাহফিলে সুটেড-বুটেড আমাকে বোধ হয় একটা চাকচিক্যের মতো লাগছিলশ্ব বোধ হয়।

কমল আমাকে বাঁচিয়ে ঘাড়ে চাপ দিয়ে সতরঞ্চির ওপর বসিয়ে দিল। হাতে ধরিয়ে দিল এক কাপ চা।

একটু গুছিয়ে বসতেই চোখে পড়ল। অবাক চোখে তাকিয়ে সে। চোখের কোণে হাসির রেখা, অথচ ঠোঁট কুঞ্চিত হয়নি। আমার ধড়াচূড়াই যে তির্যক দৃষ্টির কারণ, সেটা বোঝার বুদ্ধি আমার ছিল।

এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের প্রায় সবাইকে চিনি। কিন্তু একে তো আগে দেখিনি। আমাদের বয়সীই হবেন, হয়তো! লাল পশমি চাদরে শরীর ঢাকা, সরু এককালি টেপ গলায়। মুখের গড়নের জন্য হয়তো দেহপট একটু ভারী মনে হচ্ছিল- আমার ভুলও হতে পারে। নাকটা খানিক চাপা না হলে ইনি রীতিমতো সুন্দরী গণ্য হতেন। সেকালের সৌন্দর্যের মান তার ছিল। মুচকুন্দ চাপা ফুলের মতো গায়ের রঙ, নিশিন্দাপাতার মতো চোখের কাঁদছিল। শুধু দুধের শিশু বয়সে তার নাক কেউ টেনে তোলেননি বোধ হয়।

অনীক আসছিল! স্ক্রিপটা ধর তো, মডিউলেশন করে প্রম্প করবি। পড়া দিবিশ্ব টেল ড্রপ যাতে না হয়। আমার জানা সব নাট্যবিদ্যা উজাড় করে প্রম্পট করেছিলাম। ফেরার পথে সুখেন দা কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, এই কয়টা দিন চালিয়ে নে ভাই, রাত দশটার দিকে ফিরছি। রাস্তা বিকল নেই ভালোই হলো। কারুর সঙ্গ চাই না। কাছেই একটা আমগাছের উঁচু ডাল থেকে একটা নিম পেঁচা কুউক, কুউক বিরতি দিয়ে ডাকছে। ডাকলে মানুষ অমঙ্গল মনে করে। আমার মাথায় কিছু ঢুকছিল না।

মহড়ায় নিয়মিত হয়েছি। এর মধ্যে কমল তাকে ডেকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। নাম জানলাম। কৌতুকমাখা চোখে ধার দিয়ে বলল, প্রম্পট তো ভালোই কত্তি পারবেনশ্ব নিজেই নায়ক হয়ে যান না? বলব সুখেন দা কে?

কথা শেষ হওয়ার আগেই কথা ফুরিয়ে বলল, ও আপনার দ্বারা হবি না। আপনার যে বাটি ছাঁটের চুল? নায়কের লখিন্দরের বাবড়ি লাগে।

এরাম ছাঁট দিছেন ক্যান?

মিলিটারি ট্রেনিং নেই যে!

আপনি কি ওতে ভর্তি হবেন?

কীসে? মিলিটারিতে? না তো

তালি পরে ল্যাফট রাইট কইরে কী লাভ?

একটা বিদ্যা তো, সবার জানা দরকার।

হাত পাতেন তো।

হাতে কিছু পড়ল যেন।

বলল, এবারে মুখির মধ্যি ফ্যালান। সুগন্ধি সুপারি। সুবাস রন্ধ্রে রন্ধ্রে সঞ্চারিত হলো। মঞ্চায়নের দিন উইংসের পাশে একটা চেয়ার রাখছিলাম। তিন ঘণ্টার নাটকে ওখানেই আমাকে স্থানু হয়ে থাকতে হবে।

কোত্থেকে সেই মেয়ে এসে উপস্থিত।

এই যে আপনি আসিছেন! এত দেরি কন্ডি আছে!

আমি গরু খোঁজা খুঁজিছি।

সভয়ে বললাম, ব্যাপার কী?

তাড়াতাড়ি খোলেন, সময় নাই, দেন তো।

কী?

আরে আপনারে দিয়ে আমি কী করব। আঙুলের আংটিটা দেন। হাতে একখান আংটি না থাকলি নায়িকা মানায়, কই খোলেন।

শো শেষ হতে হতে রাত বারোটা। শো-এর সাফল্যে আমরা এতই উৎফুল্ল যে, নিজেদের প্রশংসায় রাত কাটিয়েই দিতাম, যদি পেটে টান না পড়ত। সে এসে তার হাতের পাতা ঘুরিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, আংটিখান, আমার হাতে কিরাম লাগতিছে?

কী বলব, ভেবে পাইনে।

ঘাড়টা ঘুরিয়ে মৃদুস্বরে বলল, যদি না দেই?

এ সময় আমার ক্যাম্পেইন উপদেশক শরীফ আমাকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এলো। বলল, এরাম কইরে তুমি ইলেকশন জেতবা?

ক্ষণিকের দুর্বলতায় কি ক্ষতি করে বেসে আছি, ভেবে লজ্জিত হলাম। নির্বাচনে জিততে হবে প্রাইডের জন্য সামরিক ট্রেনিং চৌকশভাবে শেষ করতে হবে দেশমাতৃকার জন্য। দেশ জেগে উঠেছে, রক্ত চায় শুদ্ধ হবে।

কমলেই সঙ্গে দেখা হতেই বলল, এই আংটি আনতে যাবি না? তোরে যাতি বলেছে।

কোথায়?

ওগির বাড়িতে।

ফেব্রুয়ারি মাস পড়ে গেছে। মিটিং মিছিল, রাতভর পোস্টার লেখা। নিজের সময় বলতে আর কিছু রইল না আমাদের। আলাপ-আলোচনা যাই হোক, আমরা জেনে গিয়েছিলাম, আমাদের লড়তে হবে। রক্তাপ্লুত মার্চ শেষ হলো।

একদিন কমল এসে আমার আংটিটি ফেরত দিল। সঙ্গে এক পাতার চিঠি।

লেখা, আমরা কাল ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি। আবার আসতে পারব কিনা জানি না। একবার আসলে দেখা হওয়ার চেয়ে বেশি কিছু হতো না।

মুক্তিবাহিনীর হাইড আউটে বর্ষণ ক্লান্ত সন্ধ্যায়।

কিছু মনে পড়ে।

কে যেন বলছে, যদি না দেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত