বসন্তে ফেলে আসা বাঁশি

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:২৬ পিএম

তখন হয়তো মাঘের বিদায় সমাসন্ন। বাতাসে ধূলি-গন্ধ প্রগাঢ় হতে শুরু করেছে। পর্ণমোচী গাছেদের শাখায় ফুটে উঠছে লালিমা। পুরু-মখমলি-পাপড়ি মেলে ঝরে পড়ছে দুই একটা শিমুল। আর পুলিপিঠার আকৃতি নিয়ে লালচে-কমলারঙা পলাশ আকাশচারী হয়ে আছে। কিছু কিছু ফুলের শরীরে হলুদাভা। যেনবা ওদের গায়েহলুদের লগ্ন উপস্থিত।

বিকেলগুলো কুয়াশা আর ধুলোতে মাখামাখি।

রান্নাঘরে কেরোসিনের স্টোভের উপর বসিয়ে রাখা এল্যুমিনিয়াম কেটলিতে টগবগিয়ে ফুটছে চায়ের জল। আব্বা বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে গাইছেন...

‘বিরহ না থাকে যদি/ মিলনে কি সুখ বল মেলে?/এইটুকু মনে রেখো তোমার আগেই চলে গেলে...’। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের এই গানটা ছোটকালে আব্বার গলায় বহুবার শুনেছি। তখন প্রেম কিংবা বিরহ বা মিলনের ছাইছাতু কিচ্ছু বুঝি নাকি আমি?

আম্মাকে দেখেছি সামান্য অবকাশ পেলেই নিপুণ হাতে এমব্রয়ডারি করছেন... বালিশের ধবধবে সাদা কভারের কোনায়। রেশমি সুতা আর সোনামুখী সুইয়ে ফুটিয়ে তুলছেন যুগল হাতের চিত্র। এক হাতে গোলাপ ধরে রাখা, চুড়ি পরা আরেকটি হাত বাড়িয়ে দেওয়া আছে ওই গোলাপটির জন্য।

বড় হতে হতে মনে জেগেছিল ওই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি হয়তো আনারকলির। যার কাছে শাহজাদা সেলিমের উপহার দেওয়া রক্তগোলাপটি অধরা থেকে গিয়েছিল চিরকাল। আনারকলির জ্যান্ত সমাধির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল এক ‘বড়া আ”্ছি প্রেম কাহানি’। তিলে তিলে মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে বাদশাহ আকবরের মা বেগম হামিদা আনারকলির হাতে গোপনে তুলে দিয়েছিলেন বিষের শিশি। এবং তা নাকি শাহজাদা সেলিমেরই অনুরোধে!

হায় প্রেম! কীসে সে স্বার্থক? মিলনে না বিরহে? বিরহে নাকি মিলনে? নাকি সর্বনাশে? এরিখ সেগাল ‘লাভ স্টোরিতে’ বলেনশ্ব ভালোবাসা মানে এই তো, তুমি কখনোই দুঃখিত হবে না। আর মৈত্রেয়ী আর মির্চার সেই প্রণয়গাথা?

শাশ্বতোইয়ং পুরানো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে, সবকিছুরই বিনাশ আছে, শুধু আত্মা হলো অজেয় অক্ষয়। আর এই আত্মাতেই নাকি ভালোবাসার জন্ম হয়।

ন হন্যতে লাইলিমজনু, শিরীফরহাদ, রোমিওজুলিয়েট আরও আছে রজকিনীচ-ীদাস। ইউসুফ এবং জোলেখা বিবি। রাধা আর কৃষ্ণ।

বয়সে ১৬ বছরের বড় রাধার প্রেমে আকুল হলো কৃষ্ণ। আর রাধাশ্ব যার ঘরে আছে ইমপোর্টেন্ট স্বামী আয়ান ঘোষাল। কীসে কী হয় তা অজানা। কে কার জন্য দিওয়ানা হয় সেসব খোঁজ করা বড়ই আহাম্মকি।

নিশিদিন অপেক্ষায় অন্তর দহন/ নিরন্তর অনিমিখে পথপানে ধায়/ বিরহ সাধনা তার সচকিত মন/প্রেমের আগুনে নিত্য পোড়ে প্রাণ-মন/ পাগলিনী শ্রীরাধিকা বনপথে ধায়/ রাধার পায়ের নিচে মর্মর। নুড়িপাথর। ক্ষতবিক্ষত পদযুগল। হৃদয় থেকে অবিরাম ঝরছে লোহু। কৃষ্ণ প্রেমে পাগলিনী রাধার হুঁশজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে প্রায়। কৃষ্ণ ছাড়া এ জীবন ধু-ধু মরুভূমি। তবুও আলেয়ার পেছনে ছুটে চলেছে রাধা। মন বাঁধা যে বড় দায়!

শাহ আব্দুল করিম লিখলেনশ্ব ‘প্রেম করে প্রাণবন্ধুর সনে/ যে দুঃখ পেয়েছি মনে/ আমার কেঁদে যায় দিন-রজনী/ আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো সজনী/ আমি কুলহারা কলঙ্কিনী/ আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো সজনী’। শাহ আব্দুল করিম হয়তো জেনেছিলেন প্রেমের আসল ব্যাপার-স্যাপার।

প্রেম হলো অন্তহীন বেদনার আধার। আনন্দের সরোবর। ডোপামিনের নিঃসরণ। ভরসার স্থানশ্ব দুনিয়া উলটে গেলেও সে আমাকে ঠকাবে না, বিট্রে করবে না। করবে না একরত্তি অপমান। কিংবা প্রেম হলো অধরা মাধুরী।

একটা ডানা ভাঙা শালিকের বিহ্বল চোখে এই পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকা! যে কিনা কোনো দিন আর উড়ে বেড়াতে পারবে না! হায়! কী নিষ্ঠুরই না এই স্থবির বসে থাকা! কী তীব্রই না প্রেমের এই অনুভূতি!

বারণ হোক আর বাধাশ্ব যাই হোক না কেন প্রেমে পড়বেই প্রাণী জগৎ।

প্রাণী মাত্রেই প্রেমিক। উদ্ভিদ জগতেও কি প্রেম নাই? যদি তা নাই থাকবে তাহলে স্বর্ণলতা কেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রাখে গুল্মরাজিকে? আর বনস্পতির ডালে ডালে দোল খায় কেন অর্কিডের পুষ্পমঞ্জরি?

প্রাণিকুলে পুরুষ পান্ডাদের মাঝে চলে প্রেমের লড়াই। সোমত্ত পান্ডারা জড়ো হয়ে লাগায় ধুন্ধুমার মারপিট। মারামারি করে যে জয় লাভ করে, সেই পায় সুন্দরী নারী ‘পান্ডাটিকে’।

অতঃপর ঘর হয়, সংসার এবং সন্তান। সন্তানের জন্মের পরপরই নারী পান্ডাটির মতিভ্রম ঘটে। সে তখন উদাস। হয়তো জেনে যায়শ্ব একবার পাইবার পর নিতান্তই মাটির মনে হয়, সোনার মোহর।

স্ত্রী পান্ডা হয় বিবাগী। হয়তো ব্লু ব্লুজের মরণ কামড়ে ঘর ছেড়ে পথে নামে। হয়তো তালাশ করে আসল সুখের। আশা করে কাক্সিক্ষত মিলন। চাহে প্রেম। মেলে কী মেলে না কে জানে? প্রেমিকা মাত্রই তো উদাসী। বিবাগী। ঘোর পাগলিনী। ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়াওে, সেই দুঃখে চোখেরও পানি, ও আমার চক্ষু নাই, পাড় নাই কিনার নাই রে ও আমার চক্ষু নাই, ঘর নাই ও মোর জন নাই...

ছোট, বড় কত যে প্রেমকাহিনি, প্রেমের সোনালি-রুপালি প্রসঙ্গ, সেসব বলে শেষ কি শেষ করা যাবে? আছে মহুয়া, মলুয়া, দেওয়ানা মদিনা। কান্দিয়া কান্দিয়া বিবির দুঃখে দিন যায়।/ খানাপিনা ছাড়্যা কেবল কেবল করে ‘হায় হায়’॥/ তারপরে না চিন্তায় শেষে হইলো পাগল।/ যাইনা মুখে লয় তাই বকয়ে কেবল।।/  খাওন বেগর আর এই না আবেস্থায়/  সোনার অংগ মৈলান হইয়া হাড়েতে মিশায়/  দিনে দিনে সর্ব অংগ হইল যে শেষ। / কালি কেশরতা মুখ হইলো বিশেষ।।/ তারপর না একদিন সগল চিন্তা লইয়া/ বেস্তের হুরী না গেল বেস্তেতে চলিয়া।।/(দেওয়ানা মদিনা)

এই হইলো আসল প্রেমের পরিণাম। বিলীন হও। মাটি হও। অদৃশ্য হও আর মিলিয়ে যাও। নকল প্রেমের পরিণামও কম জানা হয় নাই। বৃন্দাবন কারে দিয়া যাবিশ্ব এই দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যায় কতজনের! আহা! কত যে আকুতিভরা সুর! কত অশ্রুজলে গাঁথা হয় প্রণয়ের মালিকা। আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশে, বেণি যবে যাবে খুলিতে। তবুও আমারে দেব না ভুলিতে। ইহাই, সারস্বত ইহাইশ্ব ভুলো না আমায়। মনে রাখিও। ইয়াদ রাখিও। যতদিন শ্বাস, ইয়াদ রাখিও। আমরণ রাখিও স্মরণ। সারাজীবন যারে আমি ভালোবাসিলাম, সে তো বাসলো না। যার লাগিয়া সারাজীবন কাঁদিয়া গেলাম, সে তো কাঁদলো না... কান্না হলো মুক্তা, ঝিনুকের শক্ত খোলসের ভিতর লুকানো থাকে। তুমি তা দেখবে কী করে? কিংবা কান্না দেখার চক্ষুই নাই সকলের। যেমন প্রেম দেখার বা বোঝার। দেহকে ছাপিয়ে যায় যাহা, তাহা ভালোবাসা। আর দেহ ঘিরেই থাকে যে মেঘনীল-বেশ, উহাই প্রেম। প্রণয়। এই প্রণয় হতে পারে ক্ষণস্থায়ী। অথবা চিরস্থায়ী। হতে পারে মিলন ও বিরহে দোলায়মান। কিন্তু ভালোবাসা চিরজীবী। ক্ষয় নাই ইহার। অমর।

আহা আজি এ বসন্তে, কত ফুল ফোটে, কত বাঁশি বাজে, কত পাখি গায়... এত যে আয়োজন এই প্রকৃতির, সবই তো প্রণয় সম্ভাষণ। এসো এসো আমার ঘরে, এসো আমার ঘরে, বাহির হয়ে এসো তুমি, যে আছ অন্তরে... বলা কতই না সহজ! অন্তরের সবকিছুই প্রকাশিত হলে যে দাবানল জ্বলে উঠবে, তা নেভানোর উপায় স্বয়ং ঈশ্বরেরও জানা নাই। সুতরাং মনের কথা মনেই থাকুক।

শুধু তাকে চুপটি করে বলে দিন ভালোবাসিয়া তোমায় মিটিল না সাধ। তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব, আসিব এ ধরায়... কিন্তু ফের এসেই বা কী করবেন? সেই তো আনারকলি আর সেলিম, বাজিরাও মাস্তানী, শিরি আর ফরহাদ, রোমিওজুলিয়েট। লাইলি আর মজনু। ইউসুফ আর জোলেখা বিবি।

কেবলই অশ্রুপাত। রক্তক্ষরণ আর হলাহল পান। তবুও প্রেম চিরকাল! তবুও প্রেম এক সোনালি প্রসঙ্গ। যার কথা বললেও ফুরায় না। আমি এত কিছু বললাম তোমাকে, তবুও বলবার তৃষ্ণা তো যায় না... এ যেন অনেক চলে শুরুতে আবার আসা, বসন্তে ফেলে আসা বাঁশি। তোলে তার প্রাণের ভাষা। একবার শুনে যা আর ভোলা যায় না... তবে আধুনিক জীবনে এসে প্রেমও পরিবর্তন করেছে তার গতিপথ। এখন হিসাব-কিতাব না করে একেবারে নির্জলাপ্রেম, প্রায় অসম্ভব।

কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতোই। আমি বলি কি জীবনের ফলাফল যেখানে শূন্য, সেখানে কী দরকার এত হিসেবের? এত নিকেশের? এত জ্যামিতিক স্ট্রাকচারের? বরং মন ভরে ভালোবাসুন। প্রাণপ্রাচুর্যে বেঁচে থাকুন। যাকে সত্যিকার ভালোবাসেন তার জন্য অন্তত একটি ফুল কিনুন সংগোপনে। খুবই নাজুক সে ফুলশ্ব মোমবাতির মতো আলো ছড়িয়ে রাখা ঘিয়ে রঙের চন্দ্রমল্লিকা। সোনার রঙে রাঙিয়ে দিন প্রিয়মানুষের একটি দিন। সময় কিন্তু বড্ড কম। আর একটাই মাত্র জীবন। কুড়ি বছর পার করে গোপন কথাটি বলবার দরকার কী?

আমি তোমাকেই বলে দেব কী যে একা দীর্ঘরাত, আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে; ভুলে ভরা গল্পগুলো ওকে আজই বলে দিন।

লেখক, কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত