‘প্রেম’ কী? প্রেম একটা অনুভূতি, একটা ক্ষুধা, একটা অভিজ্ঞতা, বুক ঢিপঢিপ করা একটা বোধ, চার কোণায় ফুল তোলা সাদা রুমালের মধ্যিখানে লাল সুতোয় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটা দ্বিপদী কবিতা, ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেনো ভোলে না মোরে’।
নব যৌবন পাওয়া যে তরুণ রোজ দাঁড়িয়ে থাকে পথের পাশে, তার এক তরফা আকুলি-বিকুলির সাক্ষী থাকে মাঘের শীত, ফাল্গুনের হাওয়া, চৈত্রের রোদ, শ্রাবণের অঝোর ধারা। সেও যখন পায় না তার প্রাণের মানুষেরে, কী করে সে কাটায় তার বাকিটা জীবন? নাকি সময়ে তাও সয়ে যায়, বিচ্ছেদও?
ফাল্গুনে, প্রেমে, বিরহে, বেদনায়, মিলনে, বিচ্ছেদেশ্ব মাতা ধরিত্রী সংসারে পেতে রেখেছেন এক মায়ার ফাঁদ। সেই ফাঁদে পরেই দূর দেশ হতে যক্ষ তার প্রিয়ারে দেখতে পাঠায় মেঘ। সেই ফাঁদে পড়েই দেশে-দেশে কালে-কালে বাহিত হতে থাকে সাবিত্রী-সত্যবান, লায়লা-মজনু, চ-ীদাস-রজকিনী, শিরি-ফরহাদ, কাজল-রেখা, হীর-রাঞ্জা বা রোমিও-জুলিয়েটের কাহিনি।
সন্তু ভ্যালেন্টাইনের কাহিনিও খুব বেশি আলাদা নয়, অন্তত প্রচলিত মিথ অনুযায়ী।
২
মানুষ শুধু প্রকৃতির সন্তান নয়। সে নিজেই প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফাল্গুনের বাতাস যখন আততায়ীর মতন জানালা গলে ঘরে ঢুকে যায়, মধুর মতন রোদ যখন সোনার কানপাশার মতন ঝলকে-ঝলকে উছলায় গাঁয়ের উঠোনে-দাওয়ায়, শহুরে বারান্দার কাচে ও গ্রিলেশ্ব মন তখন
আপসে-আপ কথা কয়ে ওঠে।
শহুরে বারান্দার কাচে ও গ্রিলেশ্ব মন তখন আপসে-আপ কথা কয়ে ওঠে।
ফাল্গুনে আমের বোলের ঘ্রাণে, শিমুল বনের রাঙা আগুনে, গাছে-গাছে সবে উঁকি দেওয়া কচি-কচি কিশলয়ের মায়ায়, মাঝ দুপুরে ডেকে ওঠা ঘুঘুর স্বরে, লাগাতার চলতে থাকা কুহুতানে আর অচিনপুরের ঘ্রাণ বয়ে আনা লীলুয়া হাওয়ার টানে মানুষের মন আনচান করে উঠবে! এই তো মা প্রকৃতির ইচ্ছে!
এমন মন আনচান করা সময়ে, প্রকাশ্যে না হোক, অন্তত গোপনে যদি ‘হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়’, যদি আপনি তারে না পারেন এড়াতে, যদি ‘সব কাছ তুচ্ছ হয়, পন্ড মনে হয়’শ্ব সেই কী তবে প্রেম?
ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে! হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে ‘দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে’ লাল কাপড় বাঁধা থেকে শুরু করে ‘বিশ^ সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে’ আনা মিথের সেই ‘১০৮টি নীলপদ্ম’!
সুনীলের বরাতে আমরা তো জেনেছিলাম, ‘সত্যিকারের’ ভালোবাসলে নাকি প্রণয়ীর বুকেও একই রকম ‘আতরের গন্ধ হবে’। কই? তবু, যে যারে ভালোবাসে সে তারে পায় না কেন? তবু কেন পথ আলাদা হয়ে যায়? কেন মনে হয়, ‘তুম সাথ হো ইয়া না হো, কিয়া ফারক হ্যায়, বেদর্দ থি জিন্দেগি বেদর্দ হ্যায়’!
৩.
প্রেম এক শাশ্বত বোধ। ক্ষুধার মতন, কামের মতন, ক্রোধের মতন, মৃত্যুর মতন প্রেমও অমোঘ ও চিরায়ত। প্রেম হচ্ছে সেই বিনি সুতোর মালা, বিনা বাক্য ব্যয়ে যেই মালা পৃথিবীর সকল দেশের, সকল কালের, সকল ভাষার, সকল বয়সের মানুষকে বেঁধে ফেলে বন্ধনে। তাই, পৃথিবীর কোথাও প্রেমের গল্প কোনো দিন বিফলে যায় না। এমনকি ব্যর্থ প্রেমের গল্পেও লেগে থাকে প্রেম। দেবদাস বা পার্বতীর দুঃখের গল্পেও পাঠক তাই জারিত হয় প্রেমে।
প্রেমের কবিতা, গল্প, উপন্যাস বা সিনেমায় কোনো দিন দর্শক-পাঠকের ঘাটতি হবে না। এক প্রজন্ম যাবে, আরেক প্রজন্ম আসবে। নবপ্রজন্মে তৈরি হবে প্রেমের বাসনা। এই বাসনা চির নতুন। ক্ষুধা ও কামের মতন, এর কোনো লয়-ক্ষয় নাই।
প্রেম নিয়ে জ্ঞানী-গুণীজনদের কথা অনেক পাওয়া যায়। কিন্তু সাধারণেরাশ্ব যারা নিত্য প্রেমে পড়েন, প্রেম থেকে ওঠেন, প্রেমের ব্যথা বয়ে চলেনশ্ব তাদের বোধে প্রেমের অবস্থান কোথায়? এই বিষয়ে জানবার আমার কৌতূহল হলো। তাই, এই নিবন্ধ লিখতে যাওয়ার আগে এক লাইনে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলাম এভাবেশ্ব ‘আপনার কাছে প্রেম মানে কী’?
মাত্র এক ঘণ্টায় সেখানে মন্তব্য এসেছে ১০০-এর বেশি। এর পরবর্তী আরও ১০ ঘণ্টায়, সেখানে যুক্ত হয়েছে আরও শতাধিক মন্তব্য। শুধু প্রেম নয়, প্রেমের প্রশ্নও মানুষকে কী দারুণভাবে ছুঁয়ে যায়!
আমার প্রশ্নের নিচে আসা মন্তব্যগুলোকে মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভাজন করা যায়। এক শ্রেণির মন্তব্য হচ্ছে, দুষ্টুমি ভরপুর। এই মন্তব্যগুলোতে মন্তব্যকারীরা নিজের কোনো বোধ বা বক্তব্য জানাননি। হাস্যরস বা কৌতুককর মন্তব্য দিয়ে ‘প্রেম’কে তারা এড়িয়ে গেছেন। তারা নিজের মনোভঙ্গিকে প্রকাশ করেননি।
আরেক শ্রেণির মন্তব্যকারী মনে করেন, প্রেম একটা সাময়িক বোধ; এটা হরমোনের নিঃসরণ। পাশাপাশি প্রেমকে একটা বিড়ম্বনা ও ঝামেলা বা ‘প্যারা’র ব্যাপারও মনে করেছেন অনেকেই। আবার প্রেমকে ‘উদ্দাম যৌনতা’ বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
যারা খুব আগ্রহী হয়ে নিজের অনুভূতিটাকে মন্তব্যের ঘরে জানিয়েছেন তাদের মন্তব্যগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথম দল মনে করেন, সত্যিকারের প্রেম কেউ পায় না। এটা একটা ইলিউশন বা ঘোর বা বিভ্রম। যেমন লেখক ও সাংবাদিক ইশরাত জাহান ঊর্মির মন্তব্য হচ্ছে, ‘প্রেম এক ইউটোপিয়ান জাংসন, কেউ কোনো দিন পৌঁছায় না সেখানে’। তার এই মন্তব্যে লাইক দিয়ে সহমতের বহির্প্রকাশ করেছেন এগারোজন।
দ্বিতীয় দলের মতে, প্রেম মানে বেদনা-বিষাদ-বিরহ এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। প্রেম মানে একা একা বয়ে যাওয়া প্রণয়ীর বদলে যাওয়ার ব্যথা।
তৃতীয় দলটি মনে করেন, প্রেম এক মহার্ঘ ও স্বর্গীয় অনুভূতি। সত্যিকারের প্রেম খুব গভীর বা ইনটেন্স। এই দলে এমন মানুষ আছেন যারা মনে করেন, প্রেম মানে সমর্পণ। এদের দুই-একটি মন্তব্য দেখে নিতে পারি। ‘প্রেম মানে কী’শ্ব এই প্রশ্নের উত্তরে তিশাত রহমান লিখেছেন, ‘বুকে ব্যথা’। জাভেদ হোসেইনের ভাষায়, ‘প্রেম মানে বিহ্বলতা’।
প্রেমকে খুব অস্থির অনুভূতিদায়ক হিসেবেও উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ। প্রেম মানে পারস্পরিক দায়িত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ এবং সুখে-দুঃখে পাশে থাকার অঙ্গীকার বলেও মন্তব্য এসেছে। প্রেমকে ব্যাখ্যাতীত এক অদ্ভুত মায়া বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
যেমন ‘প্রেম কী’ প্রশ্নের উত্তরে উদ্যোক্ত খুজিস্থা বেগম জোনাকী লিখেছেন, ‘প্রেম হলো সুখ, পরক্ষণেই অসুখ’। সুমাইয়া খুশি লিখেছেন, ‘স্বর্গ আর নরকের মাঝের কিঞ্চিত ব্যবধান’।
প্রেম কী? প্রশ্ন একটাই। উত্তর কতই না ভিন্ন!
‘প্রেম কী’ প্রশ্নের উত্তরে সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম বাশার লিখেছেন, ‘মায়া। যেখানে সব কিছু ছাপিয়ে যায়। ফেলে দেওয়া ভাঙা কুলার প্রতিও যে মায়া থাকে সেটাও’। শান্ত জামান লিখেছেন, ‘প্রেম আসলে এমন এক মায়া, যা কখনো কাটানো যায় না’।
‘প্রেম কী’ প্রশ্নের উত্তরে মন্তব্যের ঘরে খ্যাতিমান সংবাদ-উপস্থাপক ফারাবি হাফিজ লিখেছেন, ‘মায়া বলতে পারেন। মোহও বলতে পারেন। আবার এক রকমের ভ্রমও মনে হয়’।
৪
আমার মা খুব সুন্দর সেলাইয়ের কাজ করতেন। অনেক রুমাল ছিল তার। আলমারির গোপন প্রকোষ্ঠে থাকত সেগুলো। রুমালে লাল-নীল-হলুদ সুতার কাজ। কোনোটাতে হলুদ পাখি লাল ফুল, কোনোটাতে সবুজ পাতা, নীল ময়ূর। কোনোটাতে লেখা, ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেনো ভোলে না মোরে’। কোনোটাতে লেখা, ‘বাঁশের পাতা নড়ে চড়ে, তোমার কথা মনে পড়ে’। কোনোটাতে লেখা, ‘গাছটা হইলো সবুজ বন্ধু, ফুলটা হইলো লাল, তোমার আমার ভালোবাসা থাকবে চিরকাল’।
প্রেম কি আসলে চিরকাল থাকে? মহৎ প্রেমের কাব্য ও কাহিনিগুলো কেন মহৎ ও স্মরণীয়? ত্যাগ ও তিতিক্ষার জন্য? নাকি চিরবিরহের গুণেই কাহিনিগুলো অমর?
‘মিলন হবে কত দিনে’ বলে আমরা আকুল হয়ে ওঠি। কিন্তু মিলনের পরে তো বিচ্ছেদ আর বিরহ ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই, তা কি আমরা মানি?
‘প্রেম’ একটা অদ্ভুত পরম অনুভূতি। যখন প্রেমের মানুষের থেকে একই তীব্র প্রেম পাওয়া যায়, তখন প্রাণ সারাক্ষণ শীতল পরশে স্নিগ্ধ হয়ে থাকে। দোঁহে দু’জনাতে ফানা হয়ে গেলে ‘স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখনি আমাদের কুঁড়েঘরে’।
তবুও পৃথিবীর অলঙ্ঘনীয় সত্য হলো, স্বর্গের উদ্যানেও এডাম ও ইভ ‘সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলেন’ বলে গল্পের ইতি হয় নাই। স্বর্গেও এডাম ও ইভের সংসারে কলহ লেগেছে। তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের দায় পড়েছে বেচারা শয়তানের কাঁধে।
শয়তান আর কেউ নয়। শয়তান আমাদের মন। গানে তো বলেছেই, ‘মনে মনে এক মন না হলে মিলবে না ওজন’। প্রেমে তাই ফানা হওয়াই ইবাদত। অবশ্য, ফানা হলেও যে ‘সুখে-শান্তিতে চিরকাল বসবাস করিতে লাগিল’ দিয়ে আপনার প্রেমের গল্পের সমাপ্তি হবে, এই গ্যারান্টি দেওয়ার উপায় নেই।
প্রেমে ফানা হলেও আপনার চিরসঙ্গী হতে পারে নীনা হামিদের গান, ‘সোনার ময়না পাখি, কোন দোষেতে গেলা উইড়া রে, দিয়া মোরে ফাঁকি’। প্রেম তাই ইবাদতের মতন, স্বর্গ প্রাপ্তির প্রত্যাশা ব্যতিরেকে হওয়াই উত্তম।
লেখক; কবি, প্রাবন্ধিক, জেন্ডার ও মিডিয়া গবেষক
