মাঠের নেত্রীদেরই বেছে নিল আ.লীগ

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪২ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে পর্দার অভিনেত্রী নন, একেবারেই মাঠের নেত্রীদের প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে এবারের সংরক্ষিত মহিলা আসনে সদস্য নির্বাচন করেছেন তিনি। কারও ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অবদান, আবার কারও ক্ষেত্রে পরিবারের অবদান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। মাঠের রাজনীতিতে ঘাম-শ্রম ঝরানো, ত্যাগের মূল্যায়ন করেই তাদের এ পুরস্কার দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূলের রাজনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে। ত্যাগী পরিবারের সদস্যকেও মনোনীত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বলা যেতে পারে, পুরস্কারে ভূষিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’ এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের রাজনীতি চাঙ্গা হবে বলে তিনি মনে করেন।

যুব মহিলা লীগের সাবেক নেতা কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি বলেন, ‘এককথায় চিরকৃতজ্ঞ আমি।’ সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য মনোনীত হওয়া এই নেতা আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখব।’

গতকাল বুধবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কোটাসহ আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা ৪৮টি আসন পেয়েছে। সবটিতেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে একটি আসন ১৪ দলীয় জোটের শরিক গণতন্ত্রী পার্টিকে দেওয়া হয়েছে।

চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩৪ জনই প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন। তারা তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ তালিকায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির আটজন রয়েছেন। এই আটজনের চারজন একেবারেই নতুন। বাকি চারজন এর আগের সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে একাদশ জাতীয় সংসদের সাতজন আবারও মনোনয়ন পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা টানা চার সংসদে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দাখিল করবে।

গতকাল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে গণভবনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ১ হাজার ৫৫৩ জনের দলীয় মনোনয়ন ফরম যাচাই-বাছাই শেষে তার মধ্যে সংরক্ষিত আসনের জন্য ৪৮টি বেছে নিতে হয়েছে। ওবায়দুল কাদের জানান, কানন আরা বেগমকে স্বতন্ত্র কোটায় ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের থেকে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি গণতন্ত্রী পার্টির।

মনোনয়ন পাওয়া বাকিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা যারা আছেন তাদের অন্যতম দলের অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান। তিনি টানা তিন সংসদে সদস্য হচ্ছেন। কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু জাসদকে আসন ছাড়ের জন্য তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হয়। তিনি নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন। শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন। স্বাস্থ্য সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা এবার প্রথম মনোনয়ন পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছিল। দলটির কার্যনির্বাহী সদস্য তারানা হালিম আবারও মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি এর আগে নবম ও দশম জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সানজিদা খানম। তিনি নবম সংসদে এ আসনের সদস্য ছিলেন। এরপর দশমে সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন। আবারও সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন পেয়েছেন। প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন দলের আরেক কার্যনির্বাহী সদস্য পারভীন জামান কল্পনা।

টানা চতুর্থবারের মতো সংরক্ষিত আসনের সদস্য পদে মনোনয়ন পেয়েছেন সদ্য সাবেক মন্ত্রিসভার সদস্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। গত তিন সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৩ আসনের সদস্য ছিলেন মন্নুজান সুফিয়ান। গত মন্ত্রিসভার শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ওই আসনটিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন মনোনয়ন পান। এবার সংরক্ষিত আসনের সদস্য পদে মনোনয়ন পেয়েছেন মন্নুজান সুফিয়ান।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো দলের মনোনয়ন পেয়েছেন আরমা দত্ত, অপরাজিতা হক, নাহিদ ইজাহার খান, ফরিদা খানম, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শবনম জাহান। দ্বিতীয়বারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা লীগের সভাপতি শাহিদা তারেখ দীপ্তি, যুব মহিলা লীগের সাবেক সভাপতি নাজমা আক্তার। মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি গত তিন সংসদে গাজীপুর-৫ আসনের সদস্য ছিলেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। তাকে সংরক্ষিত আসনের সদস্য প্রার্থী করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়া বাকি ৩০ নতুন মুখ হলেনশ্ব রেজিয়া ইসলাম (পঞ্চগড়), দ্রৌপদী দেবী আগরওয়ালা (ঠাকুরগাঁও), আশিকা সুলতানা (নীলফামারী), যুব মহিলা লীগের সাবেক সহভাপতি কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি (নাটোর), জারা জাবীন মাহবুব (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), রুনু রেজা (খুলনা), ফরিদা আক্তার বানু (বাগেরহাট), ফারজানা সুমি (বরগুনা), খালেদা বাহার বিউটি (ভোলা), নাজনীন নাহার রশিদ (পটুয়াখালী), জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন (নরসিংদী), উম্মি ফারজানা ছাত্তার (ময়মনসিংহ), নাদিয়া বিনতে আমিন (নেত্রকোনা), মাহফুজা সুলতানা মলি (জয়পুরহাট), লায়লা পারভীন (সাতক্ষীরা), বেদৌরা আহমেদ সালাম (গোপালগঞ্জ), পারুল আক্তার (ঢাকা), সাবেরা বেগম (ঢাকা), ঝর্ণা হাসান (ফরিদপুর), অনিমা মুক্তি গোমেজ (ঢাকা), শেখ আনার কলি পুতুল (ঢাকা), মাসুদা সিদ্দীক রোজি (নরসিংদী), হাছিনা বারী চৌধুরী (ঢাকা), রুমা চক্রবর্তী (সিলেট), আশ্রাফুন নেছা (লক্ষ্মীপুর), কানন আরা বেগম (নোয়াখালী), শামীমা হারুন লুবনা (চট্টগ্রাম), দিলোয়ারা ইউসুফ (চট্টগ্রাম), জ¦রতী তঞ্চঙ্গ্যাঁ (রাঙ্গামাটি), নাছিমা জামান ববি (রংপুর)।

কানন আরা বেগম গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। দলটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তর বলেন, কানন আরা বেগমের বাবা আবদুল হাদী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার বাড়ি নোয়াখালী।

দ্বাদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হওয়ার জন্য যারা দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নাটকের তারকা অভিনেত্রী আছেন। তারা হলেন নিপুণ আক্তার, অপু বিশ্বাস, মেহের আফরোজ শাওন, রোকেয়া প্রাচী, সোহানা সাবা, ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর, তানভিন সুইটি প্রমুখ।

এবার সংসদ নির্বাচনে চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস ঢাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাগুরা থেকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত