মিয়ানমারে সংঘাত চলছে শতাব্দীকাল ধরে। যার শেষ কোথায় কেউ জানে না। তাদের সংঘাত আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশ সীমান্তেও। বিভিন্ন সূত্র থেকে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
‘রেঙ্গুনে নাকি ভাগ্য ফেরে।’ সেই আশায় বাংলার কালজয়ী লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গিয়েছিলেন রেঙ্গুন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার ভাগ্য ফিরেছে বলা যাবে না। তখনকার বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে গিয়ে তিনি প্রথমে পড়েন মহামারী প্লেগের কবলে। বিয়ে করেন দুবার। আর্থিক, মানসিক নানা সংকটে পড়তে হয়। শরৎচন্দ্রের লেখা থেকে রেঙ্গুন তথা বার্মা সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের পাঠক কিছু তথ্য পান। তবে শুধু শরৎ নন, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার তথা বার্মার সম্পর্ক ঐতিহাসিক। হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাসে শোনা যায় মগদের কথা। যারা বার্মা থেকে এসে হানা দিত বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। বর্তমানে মিয়ানমারের চলতি সংঘাত বাংলাদেশের সীমানায় আবার হানা দিয়েছে। যে কারণে মিয়ানমার এখন শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায়।
ব্রহ্মদেশ
ইতিহাসবিদ ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছিলেন, ‘মিয়ানমার’ নাম ধারণের আগে এর নাম ছিল বার্মা, ছোটবেলায় আমরা বলতাম ব্রহ্মদেশ। আশির দশকেও এর সরকারি নাম ছিল ‘সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অব দ্য ইউনিয়ন অব বার্মা’।
বিবিসি জানায়, দেশটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল ১৮২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত টানা ১২৪ বছর। প্রথমে বার্মাকে ভারতের একটি প্রদেশ ধরা হতো। পরে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশরা বার্মা প্রদেশটিকে পৃথক রাষ্ট্র ঘোষণা করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ৫০ বছরের বেশি সময় থেকেছে সেনা শাসনের অধীনে। ব্রিটিশ উপনিবেশের আগেও মিয়ানমার হাজার বছর ধরে আলাদা বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত ছিল। যেমন শানরা তাদের নিজস্ব রাজা দ্বারা শাসিত ছিল। চিন, কাচিনসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীও নিজস্ব প্রধানদের দ্বারা শাসিত ছিল। ব্রিটিশ সরকার কেন্দ্রীয় বার্মা এবং সীমান্ত এলাকাগুলো আলাদাভাবে পরিচালনা করত। মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলো বরাবর শাসক শ্রেণি দ্বারা উপেক্ষিত ছিল। ঔপনিবেশিক শাসকরা বলত, সীমান্ত অঞ্চলগুলো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে কম উন্নত ছিল।
ইতিহাসে জানা যায়, বর্মণরা সবসময় মিয়ানমারের প্রধান জাতি হিসেবে দমন-পীড়ন চালিয়ে আসছে। তাদের বিপরীতে ঔপনিবেশিক আমলে খ্রিস্টান মিশনারিরা সীমান্ত এলাকার জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয় ছিল। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মণদের পছন্দের পালি লিপির পরিবর্তে রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করে। যা দিয়ে সীমান্তের জাতিগোষ্ঠীগুলো লিখিত ভাষা তৈরি করে। ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে খ্রিস্টান চিন, কাচিন এবং নাগাদের সঙ্গে বৌদ্ধ বর্মণদের দূরত্ব সবসময় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি (বিআইএ) অং সানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আশায় জাপানিদের পক্ষে ছিল। তবে সীমান্তের জাতিগুলো সাধারণভাবে ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিল।
প্রাথমিকভাবে জাপানিরা ব্রিটিশ বাহিনীকে বিতাড়িত করতে সফল হয়। তারপর তারা মিয়ানমারের দখল নেয়। অবশ্য পরে ২৭ মার্চ ১৯৪৫-এ বার্মিজ সেনাবাহিনী জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পক্ষ নেয়। যার নেতৃত্বে ছিলেন অং সান। ব্রিটিশরা ছেড়ে গেলে ১৯৪৭ সালে বার্মায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে অং সান নির্বাচিত হন। তবে পাঁচ মাস পর অং সান এবং তার মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যকে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন বর্তমানে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চির বাবা।
বর্মণরা (বামার নামেও পরিচিত) বর্তমান মিয়ানমারের বৃহত্তম জাতিগত এবং ভাষাগত গোষ্ঠী। তাদের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তারা মূলত ইরাবতি নদীর অববাহিকায় বাস করে এবং বার্মিজ ভাষায় কথা বলে। বর্মণরা মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মিয়ানমারের নাগরিকরা বর্মী নামে পরিচিত। বর্মণদের বর্মী বলা হয় না। তবে মিয়ানমারে শতাব্দীকাল ধরে এমন বর্মণদের আধিপত্য। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বলা হতো, বর্মী হতে হলে বৌদ্ধ হতে হবে।
জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময়
মিয়ানমারে বহু জাতির বাস। ২০০৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, মিয়ানমার ১৩৫টি জাতির একটি দেশ। জাতিগত সংঘাতই মিয়ানমারের ইতিহাস। এই সংঘাতের কবলে পড়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বিতাড়িত হয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছিলেন, নৃতাত্ত্বিকভাবে মিয়ানমারের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ তিব্বতীয় বর্মি, কারেন ও শান বংশোদ্ভূত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান আছে ১০-১৫ শতাংশ। মুসলমানদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। তারা হাজার বছর ধরে বাস করে আরাকান প্রদেশে। আরাকানের সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে। ১৯৪৭-এর আগস্টে যখন পাকিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন আরাকান পূর্ব পাকিস্তানে আসবে কি না, তা নিয়ে কথাবার্তা ও আন্দোলন হয়েছিল। বিখ্যাত নেত্রী সু চির বাবা তখনকার খ্যাতনামা নেতা অং সানের সঙ্গে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা হয়।
এই জাতিগত বিরোধ মিয়ানমারের মূল সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। একদিকে বর্মা প্রধান সেনাবাহিনী, অপরদিকে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বিরোধ। এ বিরোধ কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর মিয়ানমারকে কার্যত শাসন করছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও।
গত বছরের শুরুতে মিয়ানমারের স্বাধীনতা উদযাপনের সময় জান্তা নেতৃত্ব আশিন উইরাথু নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং জাতীয়তাবাদী চরমপন্থিকে ‘থিরি পিয়াঞ্চি’ উপাধিতে ভূষিত করে। যার অর্থ ছিল ‘মিয়ানমার ইউনিয়নের ভালোর জন্য অসামান্য কাজের স্বীকৃতি’। দেশের শীর্ষপর্যায়ে থেকে এ ধরনের আচরণ প্রমাণ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীতে বৌদ্ধ তথা বর্মণদের নিয়ন্ত্রণ কাজ করে। যেমন কারেন সম্প্রদায় চলমান সংঘর্ষের সময়ও বলছে, দেশটির সামরিক জেনারেলদের অধীনে তারা অবমাননার শিকার।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত অং সান সু চির সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। যা ব্যাপক অহিংস বিক্ষোভের জন্ম দেয়। অবশ্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস আচরণের পর যা দ্রুত সশস্ত্র বিদ্রোহে পরিণত হয়।
আল জাজিরা জানায়, এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমারের সামরিক-শাসিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে চায়। একটি ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার আকাক্সক্ষা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি জাতিগত সংখ্যালঘুদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠাও তাদের লক্ষ্য।
এ বিরোধ নিরসনে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ জানাচ্ছে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আইনি ও নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজন দেশটিতে। সেগুলো হলো নাগরিকত্ব, দেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং শান্তি প্রক্রিয়া। ১৯৮২ সালের আইন সংশোধনের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য সরকারি নথিতে জাতিগত এবং ধর্মীয় শনাক্তকরণ সরিয়ে সবার জন্য সমান নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা করা উচিত। এসব পরিবর্তন জনজীবনে জাতিগত বিভেদ কমাতে সাহায্য করবে। মিয়ানমারের সবার নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এতে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য প্রশমিত হবে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় তৈরি সম্ভব হবে।
গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, মিয়ানমারে প্রায় বিশটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এবং সামরিক শাখা রয়েছে। আবার কয়েক হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ আছে। যারা নিজেদের জাতির সঙ্গেও বিরোধে জড়িয়ে আছে। এরা আবার মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দ্বারা গঠিত বা তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ। তাদের কেউ কেউ সরাসরি সেনাবাহিনী থেকে অস্ত্র ও অর্থ পায়। আবার কেউ নিজেই সেসব সংগ্রহ করে। এসব গোষ্ঠীর আবার রাজনৈতিক অবস্থান নেই। তারা মূলত অবৈধ অর্থনৈতিক কারবারে যুক্ত। যেমন মাদক।
মিয়ানমারে আফিম উৎপাদনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫০ থেকে বিশে^র শীর্ষস্থানীয় আফিম উৎপাদনকারী এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। যা অন্তত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় পর্যন্ত প্রসারিত। আফিমের বেশিরভাগই পূর্ব মিয়ানমারের শান রাজ্যে উৎপাদিত হয়, যা কুখ্যাত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের একটি অংশ। মিয়ানমার, লাওস এবং
থাইল্যান্ডের একটি প্রত্যন্ত এবং মোটামুটি আইনহীন অঞ্চল নিয়ে এ ট্রায়াঙ্গল।
আফিম উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল শান রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ সীমান্ত অঞ্চলে। সেখানে বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ লেগেই থাকে। এই অস্থিতিশীলতার সুযোগে সীমান্ত হয়ে ওঠে মাদক কারবারের সুবিধাজনক স্থান। আবার এ মাদক কারবারে লাভের অর্থ বিদ্রোহী সেনাবাহিনী এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী উভয়ে পেয়ে থাকে।
এ ছাড়া ইয়াবাও তাদের অন্যতম মাদক।
চির অনিশ্চয়তা
মিয়ানমার যেন চির অনিশ্চয়তার দেশ। নামকরণের ক্ষেত্রেও তারা স্থির থাকতে পারেনি। বিবিসি বাংলা জানায়, ১৯৮৯ সালে দেশটির সামরিক সরকার বার্মার নতুন নামকরণ করে মিয়ানমার রাখে এবং রাজধানী রেঙ্গুনের নতুন নাম রাখা হয় ‘ইয়াঙ্গুন’। ২০০৫ সালে ইয়াঙ্গুন দেশের রাজধানীর মর্যাদা হারায়। বর্তমানে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো এবং ইয়াঙ্গুন তাদের দেশের প্রধান শহর।
১৯৪৮ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছর এএফপিএফএল মিয়ানমারের শাসনক্ষমতায় ছিল। ১৯৫৮ সালে এএফপিএফএলে ভাঙন দেখা দিলে তাদের হটিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হয়। এরপর ১৯৬০ সালের নির্বাচনে এএফপিএফএলের একটি অংশ জয়ী হলেও তাদের রাজনৈতিক নীতিমালা সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করে।
এরপর ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বার্মার ক্ষমতা দখল করে দেশটির সামরিক জান্তা। এরপর ৫০ বছরের বেশি সময় দেশটি সেনা শাসনের অধীনে থেকেছে। ২০১৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় পায়।
