সঠিক পরিসংখ্যান গণতন্ত্র রক্ষার হাতিয়ার

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা গেলে আমলাতন্ত্রের জটিলতা কমে আসে। বিগ-ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝা যায় কারা সরকারি সুবিধা পাচ্ছে, আর কারা বঞ্চিত হচ্ছে। যার ওপর ভিত্তি করে নীতি পলিসি নেওয়া যায়। আর পরিসংখ্যান গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। তাই দেশে পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী কমিটি বা মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সেমিনারে এসব আলোচনা উঠে এসেছে।

গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস মিলনায়তনে ‘চেঞ্জিং হরিজন অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন ভারতের জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. রাধা বিনোদ বর্মন। সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন।

সেমিনারে ড. রাধা বিনোদ বর্মন বলেন, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে ওপর থেকে আমাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে জনগণের আসলে কতটা উপকার হচ্ছে। কিন্তু জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিগ-ডেটা বিশ্লেষণ করলে নীতি গ্রহণে তা সহায়ক হতে পারত। এতে লেনদেন চিহ্নিত করে ঋণ দেওয়া যেত। এমন নানা ধরনের নতুন নতুন কাজ করা যায়। কারণ তথ্যই আগামী দিনের তেল বা কারেন্সি।

অর্থনীতির বিশ্লেষণের বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, শুধু অর্থনীতি দিয়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে তা সঠিক হবে না। এখন দর্শন এবং রাজনীতিও এখানে যুক্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। আর মানুষকে নীতি গ্রহণে সম্পৃক্ত করতে হবে। ভারতে আধার কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার বিগ-ডেটা ব্যবহার করতে অনেক ডেটা পাচ্ছে। এসব ডেটা ব্যবহার করে সঠিক নীতি এবং প্রকৃত প্রক্ষেপণ করা যাচ্ছে। এমনকি ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে নিখুঁতভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বিগ-ডেটা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে পারে। কারণ ব্যাস্টিক অর্থনীতি ঠিক না

থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যর্থ হবে।

ভারতের জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, কোন খাতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, বাজার ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ কী হবে এবং এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করতে হবে এসব প্রশ্নের সমাধানে বিগ-ডেটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনীতির থিওরিগুলো পরিসংখ্যান দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেক তথ্য আছে। কিন্তু সেগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ফলে অনেক সময় এগুলোর সঠিক ব্যবহার করা যায় না। এজন্য একটি বিগ-ডেটা সেন্টারে সব তথ্য এক জায়গায় থাকলে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে তথ্যে মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মানসম্মত তথ্য ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সঠিকভাবে কাজে আসবে না। পাশাপাশি খাতভিত্তিক বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এখন ডিজিটাল যুগ। তাই বিভিন্ন খাতের তথ্য আছে। সেগুলো নিয়ে অ্যানালাইসিস করতে হবে। যেমন : জমির রেজিস্ট্রেশনের তথ্য, ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্যসহ নানা খাতভিত্তিক তথ্য আছে ঠিকই, সেগুলো এক জায়গায় এনে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে কোন মানুষের অবস্থা কী। তাদের কার জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। এখন দেখা যায়, তথ্যের অভাবে অনেকেই সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না। আবার অনেকেই বেশি পাচ্ছেন। কেউ কেউ কম পাচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সঠিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে বিনায়ক সেন বলেন, ‘ভারতের মতো আমাদের তথ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার। এটি যে ভারতের মতো হতে হবে, সেটি নয়। আমরা যেখানে ভালো কিছু পাব, সেটাকে গ্রহণ করব। তবে একটা কাউন্সিল গঠন করা হলেও সেটি এখনো কার্যকর নয়। আমাদের খাতভিত্তিক অনেক তথ্যই আছে। কিন্তু সেগুলো হালনাগাদ নয়। পাশাপাশি ইন্টার সেক্টরাল কো-অর্ডিনেশন দরকার। আমাদের দেশে বিগ-ডেটা বা ডেটা ওয়্যার হাউজ সিস্টেমে যেতে হলে বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। শুধু এককেন্দ্রিক পরিসংখ্যান সংস্থার ওপর সবকিছু চাপিয়ে দিলে হবে না। তবে ভারতে যেমন পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় এবং একজন মন্ত্রী আছেন, তেমনি আমাদের দেশেও এটা করা যেতে পারে।’

ড. বিনায়ক বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশন নেই, এটা বড় একটি গ্যাপ। এজন্য আমাদের ব্যবস্থাপনার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। যেমন : জেলাগুলোতে নিজস্ব পরিসংখ্যান হ্যান্ডবুক থাকতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত