২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের সূচনা করে রাশিয়া। দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলমান এ যুদ্ধ ইউক্রেনে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে নিয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে রুশ সামরিক বাহিনীও। রাশিয়ার শহরগুলোতেও কামানের গোলা ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। লাখো রুশ জনগণকে সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যুদ্ধের এই দুই বছরে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি শহর দখলে নিয়েছে রাশিয়া। এছাড়া গেল বছর রাশিয়াতে ইউক্রেনের পাল্টা হামলা ব্যর্থ হওয়ার পর আরও আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়সংকল্প হয়ে উঠছেন পুতিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। আর ইউক্রেন যুদ্ধকে পুরো পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রাশিয়ার অর্থনীতি
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ দেশটির মুদ্রা রুবেলের পতন ও বিদেশী বিনিয়োগকারী হারানোর ফলে সাময়িক অন্ধকার দেখা দেয় রুশ অর্থনীতিতে। এসবের পাশাপাশি ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা।
একাধিক চাপ ও পরীক্ষার মধ্যে দিয়েও সেসব নিষেধাজ্ঞা খুব দ্রুতই কাটিয়ে উঠেছে রুশ অর্থনীতি।
অর্থনীতিবিদ আর্টেম কোচনেভ বলেন, “২০১৪ সালে রাশিয়ার ওপর প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকেই দেশটি বিশেষভাবে একটি জাতীয় আর্থিক অবকাঠামো তৈরি করে এবং আর্থিক খাতের উপর আঁকড়ে ধরে তা থেকে কিছু শিক্ষা নিয়েছিল। এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতেও খুব দ্রুত সামলে উঠেছিল দেশটি। আগের এসব অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়েছিল দেশটি। “
কোচেনেভ আরও বলেন, “নিষেধাজ্ঞাগুলোর ধীর বাস্তবায়ন রাশিয়াকে তার তেল রপ্তানি পুনর্বিন্যাস করার জন্য সময় দিয়েছে।“
ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দিলেও রাশিয়া চীন এবং ভারতের কাছে তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমানে দেশ দুটিতে শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক রাশিয়াই।
বলা চলে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বেড়েছে রাশিয়ার অর্থনীতি। এমনকি রুশ অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির হার ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ উভয়কেই ছাড়িয়ে গেছে। রাশিয়ার ফেডারেল স্টেট স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভিসের তথ্য মতে, গত বছর রাশিয়ার অর্থনীতি ৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামরিক উৎপাদনে অর্থনীতি চাঙ্গা
র্যান্ড কর্পোরেশনের এক সিনিয়র অর্থনীতিবিদ হাওয়ার্ড জে. শাটজ ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উৎস চিহ্নিত করা কঠিন নয়। দেশটির প্রবৃদ্ধির পেছনে যে কারণটি বহুলাংশে কাজ করছে তা হচ্ছে সেখানে ব্যাপক আর্থিক প্রণোদনা দেয়টা হচ্ছে।“
তিনি আরও বলেন, “তারা প্রতিরক্ষা শিল্পকে সমর্থন করছে। তারা কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করছে। তারা সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানের জন্য জনগণকে বোনাস দিচ্ছে,”
তিনি বলেন, “তারা নিহত সেনা সদস্যদের পরিবারকে অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। তারা আহত সেনা সদস্যদের বেতন দিচ্ছেন, কিছু ভাগ্যবান যাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।’’
প্রণোদনার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে ২০২৩ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৪ শতাংশ যা ২০২২ সালের ১১.৯ শতাংশ থেকে কম। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে সুদের হার বাড়িয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ করেছে।
পুতিনের অবস্থান
গত বছর রাশিয়ার ভাড়াটে যুদ্ধবাহিনী ভাগনার দ্বারা নাটকীয় বিদ্রোহ সত্ত্বেও, পুতিনের অবস্থান স্থিতিশীল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাশিয়া আসন্ন নির্বাচনে পঞ্চম মেয়াদে ছয় বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট চেয়ারে আবারও তিনিই বসবেন ধারণা সবার। নির্বাচিত হলে এবং সেই মেয়াদ পূর্ণ হলে তিনিই হবেন সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা রাশিয়ান নেতা।
ন্যাটোর সাবেক প্রধান লর্ড রবার্টসনের মতে ‘পুতিনের অহংবোধ বাড়ছে’।
একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর পরাশক্তি হিসেবে ধরা হতো। তবে বর্তমানেঅ সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখে রাশিয়া এমনটাই ধারণা সাবেক এই ন্যাটো প্রধানের।
ন্যাটোর সাবেক প্রধান বলেন, ‘পুতিনের বাড়তে থাকা অহংবোধের কারণে একসময় ন্যাটোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাওয়া পুতিন এখন এই জোটকে হুমকি হিসেবে দেখেন।’
এছাড়া যুদ্ধের এই দুই বছর দেশে ও বিদেশে শত্রু দমন পুতিনকে দিন দিন আরও আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়সংকল্প করে তুলেছে। এই সময়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। আর ইউক্রেন যুদ্ধকে পুরো পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরেছেন। পুতিনের ভাষ্য, এটা রাশিয়ার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।
এরই জেরে যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় ঘটনা ভাড়াটে যোদ্ধা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভাগনারের বিদ্রোহের পর এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ভাগনার প্রধান প্রিগোঝিন। যুদ্ধের দুই বছরের মাথায় কিছুদিন আগে মৃত্যু হল পুতিনের সবচেয়ে বড় সমালোচক নাভালনির।
জীবন চলছে ‘স্বাভাবিক নিয়মে’
ভয়েজ অব আমেরিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশিরভাগ রাশিয়ান, বিশেষ করে যারা বড় শহরগুলোতে বাস করেন তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় নয় বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মারিয়া স্নেগোভায়া।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় রয়েছে, তবে শ্রমিকদের উচ্চ বেতনের কারণে তা পুষিয়ে যাচ্ছে, যেহেতু বেকারত্বের হার এখন ঐতিহাসিকভাবে প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়।
তিনি আরও জানান, “রাশিয়াতে এখনও মানুষের কাজ আছে। সেখানে পশ্চিমা পণ্যের স্থান দখল করে নিয়েছে চীনা পণ্য। এছাড়া রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা এড়ানোরও নানা উপায়ও খুঁজে বের করে। সুতরাং, সেখানে জিনিসপত্রের ব্যপক ঘাটতি নেই।“
তবে প্রধান প্রধান শহরের বাইরের অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। পণ্য সরবরাহের একটা বড় অংশ স্পষ্টতই বড় শহরগুলোতে চলে যাওয়ায় ঘাটতিতে পরে শহর থেকে দূরে থাকা অঞ্চলগুলো।
ইউক্রেনকে আরও ৮৮ কোটি ডলার দিচ্ছে আইএমএফ
ইমরানের দাবি ‘প্রত্যাখ্যান’ করে পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করবে আইএমএফ
অনুমতি ছাড়া হজ করলে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা