শৈশবের শবে বরাত

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:২৪ পিএম

আজ থেকে ২০ বা ২৫ বছর আগে শবে মেরাজের রাত থেকেই ধর্মপ্রাণ পরিবারগুলোতে বয়ে যেত পবিত্র রমজানের আগমনী উচ্ছ্বাস। ‘রোজা আসছে’—এই একটি বাক্য কত স্বপ্ন, পরিকল্পনা আর প্রেরণা জোগাত কিশোরমনে তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। শবে বরাতের রাতে সে উচ্ছ্বাস পূর্ণতা পেত। রাতভর বিভিন্ন আউলিয়ায়ে কেরামের মাজারে যাওয়া, এ দরবার থেকে ও দরবারে ছুটোছুটি করার মধ্যে যে মানসিক তৃপ্তি ছিল তা সারাবছর আর মিলত কোথায়? শাবানের এ রাতটির জন্য তাই উন্মুখ হয়ে বসে থাকতাম ১২টা মাস। শবে বরাত এলো মানেই রোজা চলে এলো।

বার্ষিক পরীক্ষা শেষে গ্রামে থাকা ভাই-বোনগুলো যেমন শহরের চাচাতো ভাই-বোনদের বেড়াতে আসার অপেক্ষায় থাকত ঠিক তেমনই ছিল বিষয়টি। মেহমান আসবে বলে যেভাবে গোছানো হত ঘর, প্রস্তুতি নেওয়া হত ভালো-মন্দ খাওয়া-দাওয়ার, অতিথিকে খুশি রাখার— ঠিক সেভাবেই শবে বরাত এলেই মনের ঢালা সাজিয়ে অপেক্ষা করতাম রমজানের জন্য। রমজান তখনো আমাদের কাছে মেহমানের মতোই। সম্মানিত। যার জন্য অধীর আগ্রহে কাটত সারাক্ষণ। মূলত অতিথিকে সময় দেওয়ার মধ্যে নিজেই আনন্দ-সুখ লাভ করতাম। তেমনি নিজেকে রোজার মধ্যে ডুবিয়ে তৃপ্তির সাগরে ভাসতাম। তা, কেমন ছিল সে তৃপ্তি?

কিশোরবেলায় সারাবছর নামাজে অনিয়মিত থাকারা সবাই হয়ে যেতাম পাক্কা মুসল্লি। মাথায় ওঠে যেত টুপি। আজান হলেই মসজিদে দে ছুট। ফজরের নামাজেও ভরপুর মুসল্লি। তারাবিহতে হাফেজে কোরআনের মোহনীয় তেলাওয়াতে বুঁদ হয়ে ডুবে থাকা। মুখে ভুলেও মিথ্যা কথা বেরিয়ে গেলে দুই গালে চড় মেরে তওবা করা। খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে কে কতবার কোরআন খতম আদায় করেছে তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতাম। রমজান আমাদের মধ্যে যে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসত তাতে নিজেরাই অবাক হতাম। এ পরিবর্তনের আনন্দ ছুঁয়ে যেত মন ও হৃদয়। ইফতার-সাহরির জন্য সে কী উদগ্রিব অপেক্ষা—তা বোঝাব কোন ভাষায়।

রোজা শুরুর আগে একটা তোহফাও (রমজানের ক্যালেন্ডারকে তখন আমরা তোহফা বলতাম। তোহফা শব্দের অর্থ উপহার) আমাদের নিষ্পাপ মনকে অকৃত্রিম খুশিতে ভরিয়ে তুলত। উপহার পেলে কে না খুশি হয়। এমন নিষ্পাপ-নির্মোহ আনন্দ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিল প্রযুক্তি। হাতে হাতে এলো মোবাইল ফোন। যুক্তিরা সব দলবেঁধে, দৌড়ে হাজির হলো আমাদের মগজে। 

শবে বরাতের রাত ইবাদতের রাত। এ রাতে মাজারে মাজারে ছুটোছুটি করে অহেতুক সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। ‘বড় হুজুর’ ওয়াজে বলেছেন— মনকে বুঝাই আর যেন শবে বরাতের রাতে মাজারে না যাই। ভাই, বন্ধু, প্রতিবেশি— সবার হাতেই মোবাইল। সবাই শুনল সে ওয়াজ। ব্যাস, আর কি! মাজারে যাওয়া কমতে লাগল। কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নামতে শুরু করেছে শবে বরাতের রাতে অলি-আল্লাহ, মুরব্বিদের কবর জেয়ারত।

আরেকদল বললেন— আসলে শবে বরাত নামে কোনো কিছু নেই। সব বিদআত। এ সব হালুয়া-রুটি খাওয়ার ধান্দা। ভারত-বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও শবে বরাত নেই। কথা শুনে মনে হয়, আমরাও বোধহয় হযরত শাহজালালের (র.) মতো ইয়েমেন থেকে এ দেশে এসেছি। আমাদের পিতৃপরিচয়, সংস্কৃতি সব ‘সৌদি আরবে নেই’ দলিলে পিষ্ট হতে লাগল। কেউ মানলাম, কেউ মানলাম না ওসব কথা। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষিত মানুষজন অবলীলায় ধোঁকায় পড়তে লাগল ওই সব ভিউনির্ভর ওয়াজের। আমজনতা তাদের যুক্তি শুনে থ হয়ে যায়। আমরা মনে মনে তওবাতিল্লা করি, না ওসবের মধ্যে আর নেই।

নীরবে পার হয়ে যায় ‘লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান’। মধ্য শাবানের রাত্রি চলে যায় ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে বিদআত আর সুন্নাতের তর্কযুদ্ধ করতে করতে। সকালে আবার সব বিদআতি-সুন্নাতি বন্ধুই রয়ে যায়। মা-বাবার পিড়াপিড়িতে হয়তো বাজার থেকে একটা মুরগি জবাই করে নিয়ে আসি— এতটুকুতেই শেষ। মুরগিটা নিজের হাতে জবাই করার মধ্যেও যে ইবাদতের আনন্দ লাভ করা যায় তা মনেই থাকে না। রুটি-হালুয়া বানানো, প্রতিবেশীর ঘরে দিয়ে আসা, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনকে দাওয়াত দিয়ে বাসায় এনে খাওয়ানো, খুঁজে খুঁজে মিসকিনদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসা আমাদের কাছে পরিণত হলো বিলাসিতায়।

এশার পর ১২ রাকাত নফল নামাজ পড়ে অন্য সবদিনের মতো ঘুমানোর প্রস্তুতি নিই। একবারের জন্যও মনে পড়ে না অন্ধকার কবরে সন্তানের দোয়ার জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বাবা। সন্তান আসবে। দোয়া-দরুদ পড়বে। আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করবে— রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা। না-হ, সন্তান থাকে শহরে, মা-বাবার কবর গ্রামে। এ রাতে সেখানে যাওয়া মানে ‘অযথা সময় নষ্ট’ করা। তার চেয়ে ঘুমানোটাই বড় ইবাদত; বড় হুজুর বলেছেন। মনে মনে সে ওয়াজকে যুক্তির খেরোখাতায় তুলে এনে মনকে প্রবোধ দিই। মাজারে যাই না- বিদআত বলে, শিরক বলে। মা-বাবার কবরে যাই না, ইবাদত নষ্ট হবে বলে। সন্তানদেরও নিয়ে যাই না, শেখাই না ধর্মীয় আচার-অনুষঙ্গ। সন্তান যদি ব্যাকডেটেড হয়ে যায়— এই ভয়ে। ভুলে যাই ছোটবেলায় রাত জেগে পালন করা একটা শবে বরাত কতটা শক্তিশালী ছিল।

জীবনেও কোনোদিন আয়ামে বিজের রোজা না রাখা মানুষটাও শবে বরাতের উসিলায় শাবান মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখত। নিজের অজান্তেই হয়ে যেত একটি পূণ্যময় নফল ইবাদত। সারাবছর নফল ইবাদতে সময় না দেয়া মানুষটাও পার করত নির্ঘুম রাত। কত আনন্দময় ছিল সেসব দিন। কিন্তু এক শ্রেণির আলেম সমাজ সুন্দর সুন্দর কথা বলে, সবকিছুতে বিদআতের ধোঁয়া তুলে আড়ালে নিজেদের মতাদর্শই আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলেন। ভারতবর্ষে এসে অনুপম সুন্দর চরিত্র আর দৃঢ় ঈমানের জোরে নব্বই লাখ বির্ধমীকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন ‘মঈনুদ্দিনে মিল্লাত’ খাজা গরীবে নেওয়াজ (র.)। আমরা সে নব্বই লাখ নও মুসলিমের বংশধর— ভুলেও সে কথা মনে পড়ে না আমাদের। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত নসিব করুন, আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত