মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে কমেছে প্রবৃদ্ধির গতি

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ০৩:০৩ এএম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। হাতে নগদ টাকা কমে যাওয়ায় ক্রয়ক্ষমতাও কমে গেছে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আয়ের সব টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে জীবন ধারণে। যার প্রভাব পড়েছে বীমা শিল্পে। ফলে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে গ্রস প্রিমিয়াম আয়ে বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়ে ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা হয়েছে। এর আগের বছর এটির প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১৬ হাজার ১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল।

গত জানুয়ারিতে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে ঠেকেছে। যদিও সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে এ অর্থবছরের বাকি সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণীত মুদ্রানীতি এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কমাতে তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের আয়ের স্তর সরাসরি বীমার প্রিমিয়ামের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে গত দুই বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ মোট পলিসির সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ কমে গেছে। 

মূল্যস্ফীতির এ কঠিন সময়ে মানুষকে বীমার দিকে আকৃষ্ট করার প্রক্রিয়া কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে আইডিআরএ মুখপাত্র জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোম্পানিগুলো সব সময় একই নীতিতে চললে মানুষ আকৃষ্ট হবে না। প্রতি বছর তাদের কৌশল পরিবর্তন করলে মানুষ এতে বেশি আসবে। প্রতি বছর নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোলে মানুষের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়। এতে তারা আকৃষ্ট হবেন।

এদিকে প্রিমিয়াম আয়ে প্রবৃদ্ধি কমলেও বীমায় দাবি নিষ্পত্তির হার বেড়েছে, যেটি গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির। ২০২৩ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোতে মোট বীমা দাবির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ৮ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বীমা কোম্পানিগুলো। দাবি পরিশোধের হার ৭২ শতাংশ। ২০২২ সালে দাবি পরিশোধের হার ছিল ৬৭ শতাংশ।

বীমা খাতের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বীমাকে আরও জনবান্ধব করতে আইডিআরএ নানা রকমের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটাতে যাতে কেউ সুযোগ নিতে না পারে সেজন্য কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকটি জীবন বীমা কোম্পানির এমডিদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম তুলে আনার জন্য আমরা নিয়মিত তদন্ত করছি। আপনি দেখবেন গত ছয় মাসে অন্য সময়ের তুলনায় জীবন বীমার অবস্থা ভালো। এরকম পদক্ষেপ নেওয়ায় জনগণ খাতটির প্রতি আকৃষ্ট হবে।

মানুষ যাতে দাবিকৃত বীমার টাকা ঠিক সময়ে ফেরত পায় সেজন্য আমরা কার্যক্রম শক্তভাবে চালিয়ে যাচ্ছি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুসারে, ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়নের মধ্যে জ্বালানির উচ্চ ব্যয়, কাঁচামালের উচ্চ দামের কারণে ২০২২-২৩ সালে প্রায় ৬২ শতাংশ স্থানীয় কোম্পানির মুনাফা কমেছে। যদিও ২০২৩ সালে বীমাকারীদের প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি কমে গিয়েছিল, তবে তাদের সম্পদ এবং বিনিয়োগ বেড়েছে।

এক বছরে গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিগুলোর ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়। বীমাকারীরা একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ব্যয় করতে পারে যা তারা আগুন এবং অন্যান্য ধরনের বীমা থেকে প্রিমিয়াম আকারে প্রাপ্ত হয়। তবে সামুদ্রিক বীমা আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।

আইডিআরএ ২০১২ সালে সব জীবন বীমা কোম্পানিকে তাদের এজেন্ট কমিশন ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। এর আগ পর্যন্ত অনেক কোম্পানি তাদের এজেন্টদের একটি পলিসির বিপরীতে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতেন। কর্তৃপক্ষের এমন আদেশের পরও অনেকেই এ নির্দেশনা পালন করেননি। গত বছর আইডিআরএ আবার নির্দেশনা দিয়ে বলেছে, তারা নজরদারি জোরদার করবে, যাতে কোম্পানিগুলো তাদের নির্দেশনা মেনে চলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত