অফিসের অনুমোদনে চলেছে রেস্টুরেন্ট

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ০২:৪৪ এএম

আবাসিক ভবনের চেয়ে বাণিজ্যিক ভবনে এমনিতেই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি। তার ওপর যদি বাণিজ্যিক ভবনে একাধিক রেস্টুরেন্ট থাকে তাহলে সেটি হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। যে কারণে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় বাণিজ্যিক ভবনগুলো আবাসিক ভবন থেকে আলাদা নকশায় নির্মাণ করা হয়ে থাকে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এমদাদুল ইসলাম। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের যে ভবনটিতে আগুন লেগে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে সেটি প্রথমে আবাসিক হিসেবে অনুমোদন নিলেও পরবর্তীকালে বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। আর বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার শুরু হলেও নকশায় পরিবর্তন এনে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।

এমদাদুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেইলি রোড একটি আবাসিক এলাকা। যে ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সেটি আবাসিক ভবন হিসেবে অনুমোদন নিয়েছে। পরে এটি বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিতে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তর ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ছাড়পত্র লাগে, কিন্তু সেগুলো নেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ভবনটি আবাসিক হিসেবে নির্মাণ করে বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। একটি আবাসিক ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন (অবকাঠামোগত নকশা) আর একটি বাণিজ্যিক ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন একরকম নয়। আটতলা একটি আবাসিক ভবনে একটি সিঁড়ি হলেই চলত। কিন্তু বাণিজ্যিক ভবনে দুটি সিঁড়ি রাখতে হবে, যার একটি ফায়ার এক্সিট হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। কারণ আবাসিক ভবনে হলে মানুষের সমাগম হবে কম। আর বাণিজ্যিক হলে মানুষের সমাগম হবে বেশি। তাছাড়া বাণিজ্যিক ভবনে রান্নার জন্য গ্যাসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস সরঞ্জামের ব্যবহার বেশি হবে। যে কারণে বাণিজ্যিক ভবনগুলো আবাসিক ভবন থেকে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আর যদি পুরো ভবন জুড়ে রেস্টুরেন্ট থাকে তাহলে ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই আরও বেড়ে যায়।

জানা গেছে, ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যাওয়া বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ নামের ভবনটি আবাসিক কাম অফিস (এ-২ এবং এফ-১) হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন ছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক)। কিন্তু ভবনটি আবাসিক কাম রেস্টুরেন্ট (এ-২ এবং এফ-২) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইউজেবল ডেভিয়েশনের (ব্যবহার বিচ্যুতি) কারণে সেখানে আগুন লাগার পর তা মারাত্মক আকার ধারণ করে বলে জানিয়েছেন রাজউক কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, ভবনটিতে দোকান-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। যারা লাইসেন্স দিয়েছে তাদের আগে দেখার দরকার ছিল ভবনটির ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম (অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা) ঠিক আছে কি না।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনটির নিচতলায় ‘স্যামসাং’ ও ‘গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার’ নামে দুটি ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম বিক্রির দোকান, ‘শেখলিক’ নামে একটি জুস বার (ফলের রস বিক্রির দোকান) ও ‘চুমুক’ নামে একটি চা-কফি বিক্রির দোকান ছিল। দ্বিতীয়তলায় ‘কাচ্চি ভাই’ নামে একটি রেস্তোরাঁ, তৃতীয়তলায় ‘ইলিয়ন’ নামে একটি পোশাকের দোকান, চতুর্থতলায় ‘খানাস’ ও ‘ফুকো’ নামে দুটি রেস্তোরাঁ, পঞ্চমতলায় ‘পিৎজা ইন’ নামে একটি রেস্তোরাঁ, ষষ্ঠতলায় ‘জেসটি’ ও ‘স্ট্রিট ওভেন’ নামে দুটি রেস্তোরাঁ এবং ছাদের একাংশে ‘অ্যামব্রোসিয়া’ নামে আরেকটি রেস্তোরাঁ ছিল। অবশ্য ভবনের ছবিতে সপ্তমতলায় ‘হাক্কাঢাকা’ নামে একটি রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড দেখা যায়, যা ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে আসেনি। ভবনের সব তলাতেই দোকান ও রেস্টুরেন্ট ছিল।

রাজউকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রিন কোজি কটেজ ভবনটি আবাসিক কাম অফিস হিসেবে নকশা অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হলেও পরে সেটি আবাসিক কাম রেস্টুরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভবনটিতে দোকান-রেস্টুরেন্ট পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশন যখন ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে তখন দেখা দরকার ছিল ভবনটির নকশার অনুমোদনে কী আছে এবং ফায়ার এক্সিট ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামাদি পর্যাপ্ত আছে কি না। এ বিষয়গুলো সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের দেখার কথা। রাজউক স্ট্রাকচারাল কোনো ডেভিয়েশন (নকশার বিচ্যুতি) আছে কি না, সেটি দেখে থাকে। ভবনটির সেটব্যাক ঠিকই আছে, অর্থাৎ ভবনের স্ট্রাকচারাল কোনো ডেভিয়েশন পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভবনটি আবাসিক কাম অফিসের বদলে আবাসিক কাম রেস্টুরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবনের ইউজেবল ডেভিয়েশন আছে। এ কারণে অগ্নিকাণ্ড মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

জানা গেছে, বেইলি রোড এলাকাটি রাজউকের জোন-৬-এর আওতাভুক্ত। ওই জোনের পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়া গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনটি আবাসিক কাম অফিস স্পেস হিসেবে একটি বেজমেন্টসহ আটতলা নির্মাণে নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। আমরা দেখেছি ভবনটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় রাজউকের একটি টিম ঘটনাস্থলে ছিল। কী কারণে আগুন ভয়াবহ রূপ পেল এবং কেন এত প্রাণহানি ঘটল তা খতিয়ে দেখতে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০১১ সালে একটি বেজমেন্টসহ আটতলা আবাসিক কাম বাণিজ্যিক (এ-২, এফ-১) হিসেবে গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। ভবনের জমির মালিক হামিদা খাতুন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভবনটি নির্মাণ শেষে ২০১৩ সালে হস্তান্তর করে।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, আগুন লাগার পরপরই রাউজকের একদল কর্মকর্তা সেখানে যান। তারা দেখেছেন, ভবনের সিঁড়ি নকশা অনুযায়ীই ছিল। আইন অনুযায়ী কোনো ভবন দশতলার বেশি উচ্চতার হলে সেখানে ফায়ার এক্সিট লাগে। কিন্তু ওই ভবনটি আটতলা হওয়ায় ফায়ার এক্সিট রাখেনি। আটতলা ভবনের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ভবনটি যেহেতু বাণিজ্যিক, সেহেতু আলাদা অগ্নিনির্গমন পথ রাখা দরকার ছিল। কারণ আবাসিক ভবন হলে কম লোক বাস করেন, আগুন লাগলে দ্রুত নামতে পারেন। কিন্তু বাণিজ্যিক ভবনে বহু মানুষ আসা-যাওয়া করে। আবার ভবনের একমাত্র সিঁড়িতে গ্যাসের সিলিন্ডার, দোকানের মালামাল রাখা ছিল। ফলে মানুষ বের হতে পারেনি। এতে হতাহত বেশি হয়েছে।

আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ভবনটিতে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মাত্র একটি সিঁড়ি ও ভবনের একটি ছাড়া প্রায় প্রতিটি তলায় খাবারের দোকান থাকায় গ্যাস সিলিন্ডারগুলো রাখা ছিল অপরিকল্পিতভাবে।

                        ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মানায় এত হতাহত : মেয়র তাপস

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ঢাদসিক) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মানায় বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে এবং অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। গতকাল দুপুরে বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রোগী এবং বেইলি রোডের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি সংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

মেয়র বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক পরিদর্শন এবং তথ্য থেকে আমরা যতটুকু জানতে ও দেখতে পেয়েছি, এই ভবন নির্মাণে অনেক গাফিলতি করা হয়েছে। এ ভবন নির্মাণে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, বিএনবিসি কোডে যে নির্ণায়কগুলো রয়েছে সেগুলো সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘন করা হয়েছে। আমরা পরিদর্শনে দেখলাম, দশতলা ভবন হওয়া সত্ত্বেও মাত্র একটি সিঁড়ি রয়েছে এবং সেই সিঁড়িটাও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রশস্ত নয়। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী পাঁচতলার ওপরে ভবন হলেই একটি ভবনে দুটো সিঁড়ি থাকতেই হবে এবং একটি সিঁড়ি জরুরি সাড়া প্রদানের জন্য নির্ধারিত থাকবে। অগ্নিকাণ্ড, ভূমিধসসহ যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে সেটি ব্যবহৃত হবে। কিন্তু এ ভবনে তা মানা হয়নি বলেই অগ্নিকাণ্ডে এত হতাহত হয়েছে।’

ফজলে নূর তাপস আরও বলেন, ‘এ ধরনের ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন ও পরিপালন একান্ত আবশ্যক। বিগত বছরগুলোতে যে দুর্যোগগুলো হয়েছে সেগুলোর আলোকে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি সাড়া প্রদানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করছে। তাছাড়া ইমারত নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে সিটি করপোরেশনের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করে আমরা একটি নীতিমালা সরকারের কাছে প্রেরণ করেছি। সেটি নিয়ে বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় চলছে। আমরা আশা করব, সরকার দ্রুত এ নীতিমালাটির অনুমোদন দেবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত