একত্র হওয়ার ঘটনা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। গুহাবাসী থেকে অনলাইনবাসী সবার কাছে সংগঠিত হওয়ার যে তাগিদ তা সম্ভবত আমাদের ডিএনএতেই লিখিত। বিভিন্ন জ্ঞানকান্ড যেমন অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান নানাভাবে সংগঠনকে বুঝতে চেয়েছে। কেননা সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার এবং বিকশিত হওয়ার বিষয়টি জড়িত।
আমাদের প্রথম আদি সংগঠনটি সম্ভবত পরিবার। সম্ভবত এ কারণে বলছি, কারণ এরও আগে মানুষকে দলবদ্ধভাবে থাকতে হয়েছে। জ্ঞাতি ও বংশের মাধ্যমে মানুষজন তার প্রতিদিনকার প্রয়োজনের বিষয়টি বিভিন্ন দলে ভাগ করে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করেছে। ব্যক্তিমালিকানা ও উত্তরাধিকারেরও প্রবণতা দেখা দিয়েছে। দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে অধিকারও নিশ্চিত করেছে। আবার কিছু বাধ্যবাধকতাও আরোপণ করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্র ও প্রান্ত তৈরি করেছে। নৃবিজ্ঞানের যে দিকটিকে আমি শ্রদ্ধা করি তা হলো, এটি সবকিছুর মূল ভিত্তির ওপর আলোকপাত করতে সহায়তা করে। ফলে মানুষের সংগঠিত হওয়ার যাত্রায় আমরা দেখতে পারি তিনটি ধাপ ১. বোঝাপড়া, ঠাহর করা বা বোধশক্তি ২. যোগাযোগ, ৩. সহযোগিতা। তিনটি ধাপ এতই মৌলিক এবং সহজ সত্য যে, এর গভীরতা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করতে চাই। যদিও আমি যদি এখনই ‘মিনা সান! ইমা গেনকি দেস কা’ লিখি তাহলে বাংলা ভাষার পাঠকরা একটু ধাক্কা খাবেন। কারণ বাক্যটি জাপানি যার অর্থ সবাই কেমন আছেন? আর এরপরই যোগাযোগের সেতুটি ভেঙে পড়বে। সহযোগিতা সুদূরপরাহত। পাঠকের সঙ্গে লেখকের যে বোঝাপড়া ও যোগাযোগ তা দাঁড়িয়ে আছে বাংলা ভাষা নামক প্রতীকী ব্যবস্থার ওপর। এ ব্যবস্থার ওপর আমাদের অশেষ ঋণ।
এ ঋণ আমাদের বড় হওয়ার সঙ্গেও। পাড়া ও মহল্লায় নানাবিধ সংগঠনের মধ্য দিয়ে আমরা বড় হয়েছি। পাড়ার ক্লাবগুলোর কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। ক্যারম ক্লাব, ব্যাডমিন্টন ক্লাব, চাঁদরাত উদযাপন ক্লাব, পূজা উদযাপন ক্লাব, পাঠচক্র, ত্রাণ বিতরণ, রক্ত সংগ্রহ আর কত না কিছু। আরও নিশ্চয়ই মনে পড়বে শিক্ষক ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব, লেডিস ক্লাব ইত্যাদি। পেশার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের পরিবর্তন, অংশগ্রহণ করার ক্ষমতার পরিবর্তন করার কথাও। অথবা দামি ক্লাবগুলোর কথা যেখানে সদস্য হতে হলে মোটা অঙ্কের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পুঁজি থাকতে হয়। ফলে সংগঠনের একটা কাজও কিন্তু অপর করা, সদস্যপদকে বিশেষায়িত করা। আরও একটা কাজ সংগঠনের সেটা হলো পরিসর ভাগ করে দেওয়া। জেন্ডারের ভিত্তিতে পরিসর ভাগ করা, অর্থনৈতিক শ্রেণির ভিত্তিতে ভাগ করা।
আজ সামাজিক সংগঠনের যে পরিবর্তন নিয়ে আলাপ তার সঙ্গে দুটি মহাপরিবর্তন যুক্ত একটি সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যটি নিউলিবারেল অর্থনীতি। পুরো গল্পটা রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোকে বিচার করা যাক। ২০০৬ থেকে ২০১২-এর সময়টাতে বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারের উত্থানের ফলে সংগঠনের ধারণায় একটা গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল ঘটে। শহুরে তরুণদের অনেকেই প্রথাগত অনেক রাজনৈতিক ও বেরাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবার অনেকেই ছিলেন না। তবে ইন্টারনেট, যোগাযোগের এতদিনকার ধারণাকেই পাল্টে দেয় আর সহযোগিতার নতুন দিগন্তও তৈরি করে। ফলে নানান দেশে ছড়িয়ে থাকা মানুষজন নিজেদের একটা বড় সামাজিক সংগঠনের (যেমন ব্লগ) সদস্য ভাবতে শুরু করেন, যা ইন্টারনেটভিত্তিক এবং বাংলা ভাষায়। অনলাইন কমিউনিটির ধারণা এখান থেকেই শুরু। সামাজিক সংগঠনের একটা বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে বিশেষ ইস্যুভিত্তিক তৎপরতা; যেমন ইভটিজিং, বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বৃদ্ধি এসবের বিরুদ্ধে তৎপরতা ও মানবিক সাহায্যের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া সবই ঘটতে থাকে। ফলে একটি ব্লগসাইট সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কাজও করতে থাকে। ব্লগার একটি আত্মপরিচয়ও হয়ে উঠতে থাকে। পূর্বতন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে এর কিছু গুণগত পার্থক্য ঘটে। যেকোনো সংগঠনের কমিটি বানানোর এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কোনো নেতা বা পদের তোয়াক্কা না করেই যিনি যে কাজে যতটুকু পারদর্শী তার মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। ফলে সবারই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নেতা এবং সহযোগী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। হাততালি এবং গালিগালাজ দুটোই জোটে। এই যে, যে কারোরই যুক্ত এবং নেতৃত্বশীল হওয়ার সম্ভাবনা সেটিকে প্রথাগত সংগঠন থেকে আলাদা করতে দেখতে হবে, যেমন প্রথাগত পেশাজীবী সংগঠনগুলোতে চাকরির পদের ক্রমানুসারে সংগঠনের নেতা-নেত্রী হওয়ার খায়েশ এবং চিরকাল সালাম পাওয়ার বাসনা তা এ ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে না। ফলে ব্লগভিত্তিক যে সংগঠন দেখা দেয়, সেখানে নেতাগিরির চেয়ে কাজ দিয়ে নিজের জায়গা তৈরির প্রচেষ্টা বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জাতীয় স্বার্থে ব্লগার ও অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক তাই এই নতুন ধারার অনলাইনভিত্তিক সংগঠন। এরও অনেক পরে বোয়ান বা ব্লগার ও অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক এদের কার্যক্রম শুরু হয়।
সামাজিক সংগঠনের এ অনলাইন বিন্যাসেও ক্ষমতার ভরগুলো পরিবর্তিত হয়। ব্লগের মডারেটররা অনলাইন কমিউনিটির ক্ষমতাবান কেন্দ্র হয়ে ওঠেন, জনপ্রিয় ব্লগাররা ওপিনিয়ন লিডার হয়ে ওঠেন। এদিকে ব্লগাররা না থাকলে ব্লগ থাকবে না এই বিষয়টি ব্লগ কর্তৃপক্ষকে ততটা স্বেচ্ছাচারী হতে দেয় না। অনলাইন কমিউনিটিতে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা মানুষটি আবার অফলাইনেও ক্ষমতাবান হতে থাকেন। একই কমিউনিটির মধ্যে প্রচুর আগ্রহভিত্তিক ছোট ছোট দল তৈরি হয়। যেমন সিনেমাখোর গ্রুপ, ফটোব্লগার গ্রুপ ইত্যাদি। অনলাইনের সাংগঠনিকতা কিন্তু আমরা দেখতে পাই পেজ বা গ্রুপগুলোর অ্যাডমিনদের মধ্যে। এরা অনলাইনে এবং তাই অফলাইনেও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
অনলাইন কমিউনিটির অর্থনৈতিক শক্তির দিকটা বড় আকারে বিকশিত হয় ফেসবুকের মধ্য দিয়ে। ফেসবুক আসলে আপনাকে ব্যবসায়ী হতে উৎসাহিত করে। একটা পেজ, পেজের মধ্যকার মানুষের যোগাযোগ ও মনোযোগ মনিটাইজ করার সুযোগ দেয়। খেয়াল করে দেখবেন যে, দশ হাজার সদস্যওয়ালা পেজ বিক্রির বিজ্ঞাপন আপনি ফেসবুকেই পাবেন। এক বিষয়ে পেজ খুলে সেই বিষয়ে লোকজন/ইউজার সংগ্রহ করে পরে নাম পরিবর্তন করে দেয়। মূল চেহারা পাল্টে যায়। কভিডের সময়ে অনলাইনভিত্তিক অর্থনীতির একটা বিপুল জোয়ার আসে। অফলাইন বা দৈহিক দূরত্ব কাটাতে মানুষজন অনলাইন সামাজিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অনলাইনভিত্তিক বেচাবিক্রিও একটা সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পেজের মাধ্যমে প্রচার করে এবং কভিডের সময়ে বিপুল সাহায্য সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মনোযোগ কাড়ে বিভিন্ন দাতব্য ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অনেকে তাদের কার্যক্রম শুরুই করেন অনলাইন সমাজে। সেখানে সফল হয়ে তিনি অফলাইনে খ্যাতিমান হন, প্রতিষ্ঠিত হন। অনলাইন সংগঠনের এই যে ফ্লেক্সিবিলিটি এটার বহু রকমের প্রভাব আছে। ফেসবুক নিজেই যেখানে প্রতিটি ইউজারকে উৎসাহ দিচ্ছে ব্যবসায়ী হও, সেটার সমান্তরালেই কিন্তু প্রবল ট্রেন্ড শুরু হয়েছে ইউটিউবার হওয়ার, ফুড ভøগার হওয়ার, ভাইরাল হওয়ার, ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার। অনেকের কাছেই স্বপ্ন এবং অনেকের কাছেই বাস্তব হয়ে উঠেছে অনলাইনের মধ্য দিয়ে খ্যাতিমান, পেশাজীবী হওয়ার। তরুণরা অনেক অর্থ ও পরিশ্রম বিনিয়োগ করছেন।
আমি অনেক দিন ধরেই বলে আসছি যে, সোশ্যাল মিডিয়া আর শুধু মিডিয়া নয় বরং সমাজও। সামাজিকতার বা সোশ্যালিটির এই যে পরিবর্তন, তাতে খুব করে মনে রাখতে হবে যে, প্ল্যাটফর্মের দর্শন ও উদ্দেশ্য কী? প্রচুর মানুষ/ইউজার/শ্রমিক যেন অহরহ নানান বিষয় নিয়ে এই প্ল্যাটফর্মে নিযুক্ত থাকেন। স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতি এবং সাংগঠনিকতার তোয়াক্কা খুব করেন কি? সাংগঠনিকতা যেসব নৈতিক চ্যালেঞ্জ হাজির করে সেসবের দায়িত্ব নেয় কি? আপনারা যেমন পেজে অর্ডার করে অনেক নতুন কিছু পেয়েছেন, বাসায় বাসায় মাল পৌঁছে দেওয়ার যে পুরো ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়েছে সেসব তো ভালো। কিন্তু কোনো পেজ যদি গোপনে নৃশংসতা শেখায়, পর্নো বিক্রি করে সেসব থেকে অপরিণত সদস্যদের আপনি রক্ষা করবেন কীভাবে? অনলাইনের সামাজিকতায় অতি দক্ষ তরুণটি যখন সামনাসামনি আর কথা বলতে পারেন না, মিশতে পারেন না তখন কী হবে? যে অনলাইন জনগোষ্ঠী একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী তথ্য ও বিভ্রান্তিতে প্রতিদিন ডুবে যাচ্ছেন, তাদের জন্য কী করা হচ্ছে? ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলা আর এর সামষ্টিক রাজনীতি এবং বিপদ সম্পর্কে কতজন ওয়াকিবহাল? সামাজিক সংগঠন যে রাজনৈতিক শক্তি ও নৈতিকতার জোগান দিত তা কি অনলাইন দিতে পারছে?
আপাতত সহজ মনে হলেও এ এক মহাপরিবর্তন। বহু বছরের যাপিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সামাজিক সংগঠনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, সেই তুলনায় অনলাইন পরিবর্তন গত ১৫ বছরের। মানুষ চাইলেই এত দ্রুত অভিযোজন করতে সক্ষম কি? ফলে খেয়াল করে দেখবেন যে সমাজে অতি রক্ষণশীলতার একটি বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। এই পক্ষ না হয় ওই পক্ষ এমন প্রবণতা বাড়ছে। স্ক্রিন আসক্তি তৈরি হয়েছে। শিশুরা স্ক্রিন ছাড়া শান্ত হচ্ছে না। এর একটাই মানে, মানুষজন তাদের মিলিয়ন বছরের মৌল প্রবণতার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। আমি মনে করি এখনই সময় বাস্তবের সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়া। শিশুরা, বয়স্কদের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি কথা বলবে, আড্ডা দেবে, তরুণরা ঘাড় গুঁজে স্ক্রিনে আটকে থাকবে না। আকাশ দেখবে, বাতাস নেবে, জীবনের সবকিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য অস্থির হবে না। সমাজের সদস্য হিসেবে আগে সামাজিকতা শিখবে, অনলাইন সমাজের সম্ভাবনা এবং বিপদগুলো বুঝবে। শুধু তখনই আমরা অনলাইন সমাজকে মানুষের উপযোগী করে রাখতে পারব। আবার আমাদের স্বাভাবিক সংগঠনের ক্ষমতাকে ফিরে পাব।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক সোশ্যাল মিডিয়া তাত্ত্বিক