হার তবুও ‘কালো’ ছেলের আলোয় ভাসল সিলেট

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪, ১১:০৪ পিএম

সিলেটে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২০৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ থেমেছে ২০৩ রানে। হারের ব্যবধান মাত্র ৩ রানের। হার ছাপিয়ে লাক্কাতুরা উদ্ভাসিত হয়েছে ‘কালো’ ছেলে জাকের আলী অনিকের আলোয়। তার সিনিয়র দলে অভিষেক ইনিংসটি ঠিক ২০০ স্ট্রাইক রেটে ৩৪ বলে ৬৮ রানের। তাতে ৪টি চারের সঙ্গে ৬টি ছক্কার মার।

বাংলাদেশের নামী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেছিলেন, ‘কালো বলেই হয়তো নির্বাচকদের চোখে পড়েন না জাকের। নান্নু-হাবিবুলদের নির্বাচক প্যানেল বিদায়ের সঙ্গে আর আলিস আল ইসলামের চোটে ভাগ্য খোলে জাকেরের। দলে ডাক পান। সুযোগ পান ঘরের মাঠে একাদশেও। যে ফিনিশার রোলের জন্য দলে এসেছেন জাকের তা পালন করেছেন ৯৯ ভাগ। শেষ ওভারে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে শানাকার স্লোয়ারে বাউন্ডারিতে ধরা না পড়লে আজ হয়তো বিজয়ী দলটির নাম বাংলাদেশ হতো।

জাকের আলী অনিক

মাহমুদউল্লাহ আর জাকের আলি অনিক যখন ব্যাট করছিলেন, তখন ইএসপিএনক্রিকইনফোর উইন পার্সেন্টেজ বলছিল, বাংলাদেশের জয়ের সম্ভবনা ৪.১৭%। সেই ম্যাচটাও যে জেতার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ, তাতে ৪ রানে হারের পরও কৃতিত্ব দিতে হয়। কারণ ৪০টা ওভার জুড়েই ম্যাচের পাল্লা ঝুঁকেছে এদিক থেকে ওদিকে। ছিল হার-জিত নিয়ে অনিশ্চয়তা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আসল মজা তো এই ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলে, ২০৭ রান তাড়া করার ম্যাচেও যে শেষ অবধি বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা টিকেছিল; প্রাপ্তি হিসেবে এটাই বা কম কি!

অথচ শুরুটা হয়েছিল দারুণ। শরিফুল ইসলামের প্রথম বলটা সিøপ ফিল্ডার না থাকায় আভিস্কা ফার্নান্দো বাউন্ডারি পেলেও পরের বলে বাঁচতে পারেননি, লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে নিয়েছেন বিদায়। তাসকিন আহমেদও নিজের প্রথম ওভারের শুরুটা করেছেন দারুণ এক ডেলিভারিতে। ওয়ানডাউনে নামা কামিন্দু মেন্ডিসের ক্যাচটা যখন মিডউইকেটে সৌম্য সরকার হাতে জমিয়ে ফেললেন, তখন শ্রীলঙ্কার রান ২ উইকেটে ৩৭। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে শ্রীলঙ্কা ২ উইকেটে ৪৫, ম্যাচের এই সময়টুকুতে বাংলাদেশই এগিয়ে। ম্যাচটা ফসকে যেতে লাগল তৃতীয় উইকেট জুটির ব্যাটিংয়ে। কুশল মেন্ডিস আর সাদিরা সামারা বিক্রমার ৬১ বলে ৯৬ রানের জুটিতে। অবশ্য জুটিটা একটু আগেও ভাঙতে পারত, যদি না লিটন কুশল মেন্ডিসকে ৫৬ রানে থাকা অবস্থায় টপ এজ হওয়া ক্যাচটা মুঠোয় নিয়েও না ফেলতেন। ৫৯ রানে মেন্ডিস আউট হলেও সামারাবিক্রমা থেকে যান ৪৮ বলে ৬১ রানে অপরাজিত, সঙ্গে চারিথ আসালাঙ্কার ৬ ছক্কায় ২১ বলে ৪৪ রানে ২০ ওভারে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ ৩ উইকেটে ২০৬ রান। শেষ ২ ওভারে ৩৫ রান নিয়েছে শ্রীলঙ্কা, মোস্তাফিজ শেষ ওভারেই দিয়েছেন ২৪ রান।

রান তাড়ায় শুরুতেই আউট লিটন দাস, ইনিংসের তৃতীয় বলেই অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসের বলটা খেলতে লিটন অফসাইডে সরে এসে কীভাবে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিলেন সে এক রহস্য। অনুশীলন করেও সেটা কঠিন। ১১ বলে ১২ রান করে বিদায় নিয়েছেন সৌম্য সরকারও। প্রথম বলে ছয় মেরেও ৫ বলে ৮ রান করে বিদায় তাওহিদ হৃদয়ের। বিপিএল জুড়ে রানের জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া নাজমুল হোসেন শান্তর ২২ বলে ২০ রানের সংগ্রামী ইনিংসের সমাপ্তি পাথিরানার বলে। ৬৪ রানে ৪ উইকেট হারানো বাংলাদেশের সামনে যখন সম্মানজনক হারের আশঙ্কা, তখনই জাকের আলী অনিক আর মাহমুদউল্লাহর পাল্টা মারের শুরু।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

মাহমুদউল্লাহ শুরু করলেন প্রথম বলটাতেই ছয় মেরে। ২৭ বলে হাফসেঞ্চুরি করার পর ৩১ বলে ৫৪ রানের ইনিংস খেলে বিদায় মাহমুদউল্লাহর। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ খেলার পর আর টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা হয়নি তার, নেই কেন্দ্রীয় চুক্তিতেও এই সংস্করণে তাকে রাখেনি বিসিবি। অন্যদিকে জাকের আলি অনিক। মিনহাজুল আবেদীনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটি এই সিরিজের জন্য যে দল দিয়েছে, সেখানে ছিলেন না এই ক্রিকেটার। ২ মার্চ, চোটগ্রস্ত আলিস আল ইসলামের বদলি হিসেবে তার দলে আসা। বিপিএলে যে দলে সবশেষ মৌসুমে খেলেছেন জাকের, সেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেছিলেন যে কালো বলেই তাকে দেখে না নির্বাচকরা।

নতুন প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু প্রথম যে সিদ্ধান্তটা দিয়েছেন, সেটা হচ্ছে দলে জাকেরের অন্তর্ভুক্তি। কাল চাপের মুখে জাকেরের ৩৪ বলে ৬৮ রানের ইনিংসটাই ছিল বাংলাদেশের অক্সিজেন। জাকের যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, জয়ের আশা ছিল বাংলাদেশের। শেষ ওভারে ৬ বলে যখন ১২ রান লাগে, তখন জাকেরই ভরসা। প্রথম বলে রিশাদ আউট হলেন, এরপর আসা তাসকিন সিঙ্গেল নিয়ে জাকেরকে স্ট্রাইক দেওয়ার সময় জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ৪ বলে ১০ রান। ৭ নম্বর ছয়ের প্রচেষ্টায় শানাকার ফুলটস বলটা লং অফে চারিথ আসালাঙ্কার হাতে তুলে দিলেন জাকির, সেখানেই বাংলাদেশের জয়ের আশার সমাধি। অথচ ২০৭ রান তাড়ায় ৪ বাউন্ডারি আর ৬ ছক্কা মেরে আশার মশালটা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন জাকিরই। এরপর শরিফুল এসে একটা চার মেরেছেন, তারপর আর হয়নি। শেষ দুই বলে একটা লেগ বাই আর একটা সিঙ্গেল। ৪ রানের দূরত্ব থেকেই গেল। ৮ উইকেটে ২০৩ রানে থেমে গেল বাংলাদেশ। 

মাস দেড়েকের বেশি সময়ে একডজনের বেশি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন বাংলাদেশ দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটার। সম্মানজনক হারের চেয়ে পাল্টা আঘাত করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রয়াসটা নিঃসন্দেহে বিপিএলেরই সুফল। আর শেষ ওভারে ৬ বলে ১২ রানের সমীকরণ না মেলানোর আক্ষেপটাও বিপিএল নিয়ে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের মন্তব্যেরই প্রমাণ। গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় বিদেশি নির্ভরতার জন্যই যে গড়ে ওঠে না কঠিন ম্যাচ জয়ের মানসিকতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত