জনতুষ্টির তাওয়ায় দুর্নীতির ভূরিভোজ 

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৬:৪০ পিএম

আজকের সংবাদপত্রগুলো খুলে দেখি সামনের পাতাজুড়ে ঢাউস কিছু ছবি। কিছু লোক হাতুড়ি, শাবল ইত্যাদি দিয়ে বেশ কিছু ভবন ভাঙচুর করছে। সঙ্গেই সঙ্গেই মনে হলো কোন দুষ্কৃতকারী কিংবা দখলদারেরা মনে হয় এই ধ্বংসে লিপ্ত। কিন্তু, ক্যাপশন আর খবরগুলো পড়ে বুঝলাম, মহাসমারোহে রাজধানীর ‘অবৈধ’ রেস্তোরাঁগুলো ভাঙা হচ্ছে। 

বলাই বাহুল্য, কয়েক দিন আগে বেইলি রোডের মর্মান্তিক কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডে প্রায় অর্ধশত মানুষের পুড়ে মরে যাওয়ার পর এই হচ্ছে কর্তৃপক্ষের যুদ্ধংদেহী প্রতিক্রিয়া। গণমানুষের রাগের তাওয়া গরম থাকতে থাকতে কয়েকটা জনতুষ্টির রুটি ভেজে নেওয়া। 

কিন্তু, কর্তৃপক্ষের এইরকম আচরণ উগ্র জনতুষ্টিকে শান্ত করলেও তা আসলে কতটা ফলপ্রসূ? কতটাই বা আইনের শাসন? এই ব্যাপারে আমরা সংক্ষেপে আইনের শাসন ব্যাপারটা বুঝি। 

এখনো পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যা আবিষ্কার করেছেন তাতে দেখা যায়, হাম্মুরাবি নামক একজন ব্যাবিলনীয় রাজাই প্রথম শাসক, যিনি সুদীর্ঘ এক আইনি ধারা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। হাম্মুরাবি কোড নামে এই ধারাগুলো আইনের শাসনের ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ। 

এর আগে নিশ্চিতভাবেই ‘আইনের শাসন’ ছিল, যা ছাড়া সমাজের স্থিতিশীলতা অসম্ভব। কিন্তু, হাম্মুরাবি কোডের গুরুত্ব হচ্ছে, এই কোড লিখিত। ফলে, এর ভিত্তিতে সর্বজনীন ভাবে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার করা সম্ভব হয়েছিল। 

আইন ব্যাপারটি খুব মোটা দাগেই তাই। সেই আদিমকালের রাজা হাম্মুরাবিও বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা বজায় রাখতে এমন কিছু নিয়ম দরকার, যেগুলো সার্বিকভাবে বিচার করবে, কোন ঘটনা ঘটার পর সর্বোচ্চ ইনসাফ প্রদান করবে। 

অনেকেই হাম্মুরাবির আইনকে সেকেলে বলেন। সেকেলে তো বটেই হাজার চারেক বছরের পুরোনো বলে কথা। সেখানে চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত তোলার কথা বলা হয়েছে। সে যুগের নিয়মে অভিজাত ও দাসদের অধিকারে বিপুল পার্থক্য করেছে। কিন্তু, এমনকি সেই প্রাচীন আইনেও বলা হয় নাই, অপরাধ হওয়ার পর হারেরে করে অগ্রশ্চাত বিবেচনা না করে জনতুষ্টির বেলুনকে ফোলানো। সেই আইনের মূল কথা হচ্ছে, আইন অপরাধের প্রতিরোধ না, প্রতিকার করবে। অপরাধ হলে তা নিয়ে শাস্তি প্রদানই আইন না, বরং সকলে ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করলে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে সেইটাই আইনের উদ্দেশ্য। 

অথচ, চার সহস্রকাল পরে, বঙ্গীয় বদ্বীপে ঠিক তার বিপরীতটাই ঘটছে। একবার না, বারংবার, প্রতিবার। 

কোথাও একটা আগুনের ঘটনা ঘটার পরেই কেবল যথাযথ কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। কোথায় একটা আলোচিত ছিনতাই বা হত্যাকাণ্ড হওয়ার পরেই দেখা যায় অপরাধের আশপাশের স্থলে চিরুনি অভিযান চলে। চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনা ঘটলেই গাড়ি কিংবা চালকের কাগজপত্র খোঁজার হিড়িক পড়ে। 

পুরো ব্যাপারটিই যেন কোন ব্যাপারটা কতটা আলোচ্য হয়েছে তাঁর ওপর নির্ভর করে। ব্যাপারটা এমন যে, একজন মানুষকে সারা বছর অপুষ্টি আর অবহেলায় ফেলে রাখা হলো, এরপর অসুখ হলে দায়িত্বশীলদের খুব হম্বি তম্বি। আর মরে গেলে আরও বিপুল বেগে রাগের প্রকাশ। 

সাধারণ চোখে ব্যাপারটি দেখলে খুবই বিস্ময়কর মনে হবে। মনে হতে পারে, ভবনের, রাস্তার বা অন্যান্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেতনভোগী এই সব সরকারি কর্মচারীরা খুবই অদক্ষ। কিন্তু, দুর্নীতির চোখ দিয়ে দেখলে এ এক দারুণ দক্ষতা। 

একদিকে বছরের পর বছর ঘুষের বিনিময়ে উনারা চোখ বন্ধ করে থাকেন। অনুমোদনহীন রেস্তোরাঁ বা গাড়ির কাগজে সই করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেন। অন্যদিকে, যখন সত্যিই দুর্ঘটনা ঘটে তখন এই সব ব্যবসায়ীদের আরেক দফা চাপ দেওয়া যায়। 

এই সব কর্মকর্তারা জানেন, জনতার চাপ খুব ক্ষণস্থায়ী। সেই সময়টা উতরে যেতে পারলেই হলো। বরং সেই প্রতিকূল সময়ে নিজেদের বাঁচাতে অসৎ ব্যবসায়ীরা বহু গুন উৎকোচ দিতে প্রস্তুত থাকে। দুর্নীতির রুল বুকের এক দারুণ আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রয়োগ।

কোন সন্দেহ নাই, এই চক্রে ব্যবসায়ী, ভবন মালিকেরাও দায়ী। তাঁদের এই সব অপকর্মের জন্য কঠোর শাস্তি হওয়া জরুরি। কিন্তু, এই জনতুষ্টিবাদী, দুর্নীতির মচ্ছবে লোক দেখানো শাস্তি অবস্থার কোন পরিবর্তন করবে না। ব্যবসায়ী পরেরবার জানবেন, শ খানেক মানুষ মেরে ফেললে লাশপ্রতি হয়তো ঘুষের রেটটা একটু বাড়াতে হবে, এই যা! 
যেই অসহায়, ক্রোধান্ধ জনতা এই খেলায় আগুন জোগালো সেই বেচারারা সব দিক দিয়েই হেরে যাবে। একেতো নিজেরা আগুনে পুড়ে কাবাব হবে, উগ্র গাড়ির চাপায় মরবে, ভবন ধসে ভর্তা হয়ে যাবে, অন্যদিকে সে দেখবে তাঁর রক্ষাকবচ আইনের পরাজয়। 

দিন সাতেক পর মাথা নিচু করে, মরে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে এই মানুষগুলোকেই রেস্তোরাঁয় যেতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে চলতে হবে। তাঁর যে আর গতি নাই! সে কোথায় যাবে! লুটপাটের মচ্ছবে সে যে বেঁচে আছে এই ব্যাপারটাকেই সৌভাগ্য বলে সে শোকর করবে। 

এই জনতা কেবল ভোক্তা না, রেস্টুরেন্টগুলো কর্মসংস্থান হওয়া হাজারো হাজারো মানুষ আছে। জান হাতে নিয়ে রাস্তায় নামা লাখো লাখো পরিবহন শ্রমিক। কোন এক আড্ডায় এক বন্ধু বলছিলেন, মরে যাওয়ার চেয়ে আধুনিক যুগে চাকরি হারানো অনেক বেশি আশঙ্কার। মরে যাওয়া মানে সব দুশ্চিন্তার শেষ, চাকরি যাওয়া মানে অনিঃশেষ দুশ্চিন্তা। 
উনি যা বলেন নাই, তা হচ্ছে, বেঁচে থাকলে আমরা পুড়ে মরব, মরে গেলে রাজনীতি আর দুর্নীতির শিকার হব। আর আমাদের মরা লাশে, জনতুষ্টির আগুনে ঝলসানো হবে বারবিকিউ উৎসব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত