সবার শুরুতে আপনাকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা। একজন নারী হিসেবে বিশেষ এ দিনটি নিয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই?
শারমিন আক্তার রত্না: নারীদের অধিকার নিয়ে যুগে যুগে অনেক কথা হয়ে আসছে। এই দিনটিতে এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও বেশি কথা হয়। নারীদের দাবি—দাওয়া, কোথায় অন্যায়ের শিকার হচ্ছে, এসব নিয়ে সেমিনার—সিম্পোজিয়ামে অনেক আলোচনা হতে শুনি। একজন নারী হিসেবে অবশ্যই চাইব সবকিছুতেই সমঅধিকার আসুক। তবে তার আগে চাওয়া মানুষ হিসেবে নারীদের মূল্যায়ন করা হোক। সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই মেয়ে মানুষকে ‘মানুষ’ই মনে করা হয় না। মেয়েরা সব জায়গায় যেতে পারবে না, এমনকি পারিবারিক কথাবার্তায়ও অনেক সময় মেয়েদের থাকার অধিকার নেই।
ক্রীড়াঙ্গনের নারীদের নিয়ে কী বলবেন?
রত্না : সাফল্যের বিচার যদি করেন এখন তো নারীরাই দেশের জন্য বড় বড় সম্মান বয়ে আনছে। ক্রিকেটের কথা ধরেন, বৈশি^ক শিরোপা কিন্তু প্রথম এসেছে মেয়েদের হাত ধরে। তারা এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন করেছে দেশকে। পুরুষরা কিন্তু সেটা এখনো করতে পারেনি। ফুটবলেও মেয়েরা সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এশিয়া পর্যায়েও তারা ভালো করছে। তারপরও নারীরা বৈষ্যমের শিকার হয় প্রতিনিয়ত। পুরুষদেরই সব জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপন বলুন, কিংবা কোনো পণ্যের শুভেচ্ছাদূত কিন্তু ছেলেদেরই করা হচ্ছে। ক্রিকেটারের স্ত্রী হিসেবে শুভেচ্ছাদূত হয়ে গেছে অনেকে। অথচ ক্রিকেটার হয়ে কোনো নারী কোনো পণ্যের শুভেচ্ছাদূত হতে পারেননি। আমাদের সমাজটা পুরুষতান্ত্রিক বলেই কি না, জানি না। তবে আমার কাছে মনে হয় পুরুষরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে নারীদের সাফল্যে। কারণ তারা জানে নারীরা কতটা ক্ষমতাবান। নারীদের সুযোগ দেওয়া হলে, পুরুষদের অস্তিত্ব থাকবে না। এ কারণেই নারীদের দাবায়ে রাখা হয়। এ ছাড়া আর কিছু না। আসলে সবখানেই বৈষম্য। পুরো সমাজেই। ক্রীড়াঙ্গন তো সমাজেরই একটা অংশমাত্র। অনেকেই বলে প্রধানমন্ত্রীও তো একজন নারী। তাহলে কেন এত অধিকারের প্রশ্ন ওঠে। আমি শুধু বলব, উনি ওনার যোগ্যতা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে চলে গেছেন। দেশ পরিচালনা করছেন। কিন্তু সবাই তো এ রকম সুযোগ কিংবা ক্ষেত্র পাবে না। আমাদের যে সব দিক থেকেই বেঁধে রাখা হয়।
তবে যতদূর শুনেছি শুটিংয়ে বৈষম্যটা অনেক কম?
রত্না : ঠিকই শুনেছেন। অন্যান্য খেলার সঙ্গে যদি তুলনা করেন, শুটিংয়ে এই বৈষম্যটা নেই বললেই চলে। এখানে লিঙ্গ দিয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করা হয় না। এখানে পারফরম্যান্সই প্রথম শর্ত। তা ছাড়া জাতীয় দলের ক্যাম্পে নারী ও পুরুষদের সমান সুযোগ—সুবিধা দেওয়া হয়। ভেদাভেদ নেই বললেই চলে। ভীষণ নিরাপদও আবাসিক ক্যাম্প। আমি তাই বলব, অন্য খেলাগুলোর তুলনায় শুটিং অঙ্গন নারীদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। নারী শুটারদের সঙ্গে সবাই অনেক বিনয়ী ব্যবহার করে। ফলে অভিভাবকরা নিজেরা এসেই তাদের মেয়েদের শুটিংয়ে দেন।
অনেক প্রতিকূলতা সয়ে নারীদের খেলাধুলা করতে হয়। এই অঙ্গনে টিকে থাকতে হয়। আপনার কী মনে হয়, এই জায়গাটায় আরও একটু দৃষ্টি দেওয়া উচিত?
রত্না : দেখুন, সত্তর—আশির দশকে যে নারীরা খেলাধুলা করতেন, ছবিতে তাদের দেখে মনে হয়েছে, তারা অনেক বেশি মুক্ত ও স্বাধীন ছিলেন, অবাধে চলাফেরার মতো খেলাধুলাও করতে পারতেন। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন মেয়েদের খেলতে হলে অনেক সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা অতিক্রম করে আসতে হয়। মেয়েদের পর্দা করার দাবিতে পুরুষরা রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যান। এটা ভীষণ অপমানের। পুরুষদের তো মসজিদে গিয়ে জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার বিধান আছে। সেটা কজন পালন করছে বলুন। সে সময় তো নারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়াচ্ছে না। অনেকে বলে, মেয়েরা শারীরিক পরিশ্রম করতে পারে না বলেই খেলাধুলায় ভালো করে না। কথাটা ভুল। একজন নারী ঘরে যে পরিমাণ পরিশ্রম করে, সেটা একটা পুরুষ কখনোই করে না। আর নারীরা প্রমাণ দিয়েছে ক্রীড়াঙ্গনে তারাও সফল হতে পারে।
আপনার তো দীর্ঘ ক্যারিয়ার। অনেক চড়াই—উতরাই গেছে। অনেক আলোচিতও হয়েছেন নানা কারণে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কতটা তৃপ্ত?
রত্না : আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে মোটেও তৃপ্ত নই। ২০১৯ সালে খেলা ছেড়েছিলাম সর্বশেষ এসএ গেমসে অংশ নিয়ে। এর আগে অনেক সাফল্যই হয়তো পেয়েছি, তবে সেগুলো ছিল একটা পর্যায়ে। সেই পর্যায়টা পেরিয়ে আরও বড় সাফল্য না পাওয়ার জন্য মূলত আমি নিজেকেই প্রথম দায়ী করব। কারণ খেলোয়াড়ি জীবনে শুধু সফলতা নিয়ে ভাবিনি। ভেবেছি, সোচ্চার হয়েছি শুটারদের সুযোগ—সুবিধা নিয়ে। এটা করতে গিয়ে নিজের পারফরম্যান্সে শতভাগ মনোনিবেশ করিনি। এটাই আমি মনে করি সবচেয়ে বড় ভুল। কেবল খেলাটাকেই গুরুত্ব দিলে হয়তো আরও বড় মঞ্চে সাফল্য পেতাম। তা ছাড়া খেলোয়াড়ি জীবনেই বিয়ে করেছিলাম। তখন টাকা—পয়সা নিয়ে খুব বেশি ভাবতাম না। চিন্তা করতাম নিজে যা পাচ্ছি তা দিয়ে তো চলেই যাচ্ছে। যাকে বিয়ে করেছিলাম, তিনি তো একসময় প্রতিষ্ঠিত হবেনই। সেই আশাতেই ছিলাম। কিন্তু সেটাও পরে ভুল প্রমাণিত হলো।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে চাই না। শুধু বলেন, ভালো আছেন তো?
রত্না : আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। খেলা ছাড়ার পর ২০২২ সালের পুরোটাই ফেডারেশনের কোচ হিসেবে কাজ করেছি। সে সময় জাতীয় দলের সহকারী কোচের দায়িত্বে ছিলাম। তবে দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেওয়ায় বছরের শেষ দিকে চাকরিটা ছেড়ে দিই। এরপর থেকে বাচ্চাদের লালন—পালন করছি। আমার দুটি সন্তান, ওদের ঘিরেই আমার জগৎ আবর্তিত। পাশাপাশি কিছু একটা করার চেষ্টা করছি, সেটাও শুটিংকে ঘিরেই। দেখা যাক।
শোনা যাচ্ছে আপনার নাম রয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের তালিকায়। যে তালিকাটা এখন মন্ত্রিপরিষদে চূড়ান্ত মনোনয়নের অপেক্ষায় আছে। নিশ্চয় খুশি এটা শুনে?
রত্না : আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে শুনতে পেরে সত্যিই উচ্ছ্বসিত। তবে যে প্রক্রিয়ায় এই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়, সেটা নিয়ে আমার একটা প্রশ্ন আছে। এই পুরস্কারটা পেতে হলে ক্রীড়াবিদদের সরকারের কাছে আবেদন করতে হয়। আমি নিজেও যেমন আবেদন করেছি। এই আবেদনের বিষয়টি যদি না থাকে সবচেয়ে ভালো হয়। সরকার যোগ্য যাদের মনে করবে, তাদেরই স্বীকৃতি দেবে।
আবেদনের বিষয়টি নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে আপনার মতো অনেকেরই আপত্তি আছে। তবে ক্রীড়াঙ্গনে কতগুলো বিষয় দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে, যা বদলে ফেলার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না?
রত্না : ঠিকই বলেছেন। আসলে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোকের ভীষণ অভাব। এই যেমন রোমান সানার হঠাৎ অবসরের পর যে কথাগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো নিয়ে কিন্তু আমরা ক্রীড়াবিদরা একটি কমন প্ল্যাটফর্মে আসতে পারিনি। সুযোগ—সুবিধা যা দেওয়া হয়, তা দিয়ে যদি বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখা হয়, সেটা ঠিক নয়। একটা সম্মানজনক সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা যদি আন্তর্জাতিক পদকজয়ীদের জন্য থাকত, তাহলে তারা আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা পেত। তা ছাড়া ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমাদেরও উচিত ছিল রোমানের ঘটনাটা প্রকাশ হওয়ার পর সমবেতভাবে সরকারের উচ্চমহলে সুযোগ—সুবিধা বাড়ানোর ব্যাপারে স্মারকলিপি দেওয়া। সেটাও তো আমরা করিনি। শুধু পরিবেশ বদলালে হবে না, বদলাতে হবে আমাদেরও।
