জাতীয় দৈনিক দেশ রূপান্তরের শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানা গত ৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কিছু তথ্য চেয়ে ‘তথ্য অধিকার আইনে’ আবেদন করেন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় কেনা কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া উম্মুল বানিনের বরাবর আবেদন করেন রানা। তিনি আবেদনের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। ইউএনও ক্ষিপ্ত হয়ে উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. শিহাবুল আরিফকে রানার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার নির্দেশ দেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত ‘অসদাচরণের’ অভিযোগে সাংবাদিক রানাকে ছয় মাসের কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেন।
তথ্য চাওয়ার ঘটনার সূত্র ধরে একজন সাংবাদিকের তাৎক্ষণিক ছয় মাসের কারাদন্ডাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, শুদ্ধাচার এবং জনগণের মালিকানার তথ্যে জনগণের অধিকার এবং সাংবাদিকতা পেশার স্বাধীনতা প্রশ্নে দেশব্যাপী নিন্দা, তীব্র সমালোচনা এবং প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তথ্য অধিকার আইনে তো বটেই, প্রশাসনিক কার্যক্রমে সাধারণ কার্যপ্রণালী অনুযায়ী, যে কোনো সরকারি দপ্তরে যে কোনো নাগরিক কোনো আবেদন দাখিল করলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর আবেদনকারীকে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রাপ্তি স্বীকারপত্র প্রদান করবে।
২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ‘তথ্যপ্রাপ্তি বিধিমালা’-এর ৩ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি তথ্যপ্রাপ্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে আবেদন করবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনপত্র গ্রহণকারীর নাম, পদমর্যাদা, তারিখ এবং রেফারেন্স নম্বর উল্লেখসহ লিখিতভাবে বা ক্ষেত্রমতো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে আবেদনপত্র গ্রহণের প্রাপ্তি স্বীকার করবেন। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেনো প্রাপ্তি স্বীকারপত্র প্রদানের সেই সাধারণ বিধিবদ্ধ দায়িত্বটি পালন না করে আবেদনকারীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়লেন। কেন তিনি একটি তুচ্ছ বিষয়ে এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন? এবং কেনই-বা তিনি ‘আইন মান্যকারী’ একজন আবেদনকারী নাগরিককে তথ্য চাওয়া এবং আবেদনের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র চাওয়ার কথিত ‘অপরাধে’ তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ছয় মাসের কারাদন্ডাদেশ দিয়ে পেশাগত দায়িত্বপালনরত একজন সাংবাদিককে কারাগারে প্রেরণ করার মতো চরম পন্থা অবলম্বন করলেন? ঘটনার এক সপ্তাহকাল অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার নয়। তবে ঘটনাটি নিশ্চয়ই প্রশাসনিক বা বিচারিক তদন্ত এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রানার স্ত্রীর দাবি, জাইকার কয়েকটি প্রকল্পের ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে ইউএনও কার্যালয়ে আবেদন করেন রানা। এসব প্রকল্পের তথ্য চাওয়ায় রানার ওপর ক্ষুব্ধ হন ইউএনও। অবশ্য ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিনের ভাষ্য, রানা তথ্য চেয়ে আবেদন করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রানা তখনই তথ্য চান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গোপনীয় সহকারীর কাছে থাকা ওই তথ্যের ফাইল টানাটানি করেন। রানা অসদাচরণ করেছেন বলে তিনি সহকারী কমিশনারকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে বলেছেন। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে রানা ‘ফাইল ধরে টানাটানি’ করেছেন, সে ঘটনাটি প্রশমনে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তথ্য চেয়ে আবেদনকারী সাংবাদিককে ছয় মাসের জেল দিয়ে সাজা দেওয়া ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে কি আর কোনো সমাধানই ছিল না? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে রানা কোনো প্রকার গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ করেছেন তেমন অভিযোগ তো করা হয়নি। তবে ছয় মাসের কারাভোগের সাজা কেন? এর যথার্থতা কী? এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং শেরপুর জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আবেদন করে এবং বারবার ধরনা দিয়েও রানার পরিবার গত এক সপ্তাহেও ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্র্তৃক কারাদন্ডাদেশের সিদ্ধান্তের মামলার নথির দাপ্তরিক অনুলিপি সংগ্রহ করতে পারেনি। আবেদন করা সত্ত্বেও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবার কেন এক সপ্তাহ যাবৎ ভ্রাম্যমাণ আদালতের নথির যথাযথ অনুলিপি পাবেন না? প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী জেলা প্রশাসক (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিষয়ে পরস্পরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং সময় ক্ষেপণ করেন। ফলে রানার পরিবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার আদেশের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ আপিল দায়ের করতে পারেননি। অবশেষে, সপ্তাহব্যাপী দৌড়ঝাঁপ করে গত সোমবার সন্ধ্যায় রানার পরিবার মামলার নথির অনুলিপি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
সাংবাদিক রানা আইন মেনে তথ্য চেয়ে আবেদন দাখিল করেছেন। তার মানে তিনি আইনমান্যকারী। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন নাগরিক। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন নাগরিকের জন্য পুরস্কার হিসেবে ব্যবস্থা করলেন ছয় মাসের কারাদন্ড। কেন? এটা কি স্বাভাবিক এবং সংগতিপূর্ণ হলো? তথ্য চাওয়ার ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এতটা অসহিষ্ণু, স্পর্শকাতর, বেসামাল এবং ক্ষুব্ধ হলেন কেন?
প্রথমত, তিনি আইন মেনে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছেন। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকতার পেশাগত উদ্দেশ্যে তিনি প্রকাশযোগ্য তথ্য চেয়েছেন। যেখানে তথ্য চাওয়া এবং পাওয়ার অধিকারের প্রেক্ষাপট আইনগতভাবে এবং অবস্থাগতভাবে পরিষ্কার, সেখানে আবেদনকারীকে কী করে তাৎক্ষণিক বিচারে ছয় মাসের কারাদন্ড দেওয়া যায়?
একজন পেশাদার সাংবাদিক সম্ভাব্য দুর্নীতি, অনিয়ম, মানুষের স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়-আত্মসাতের ঘটনা উন্মোচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন সেটাই স্বাভাবিক এবং কাক্সিক্ষত। তর্কের খাতিরেও যদি ধরে নেওয়া হয় যে রানা তথ্য চেয়ে এবং আবেদনের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র চেয়ে এবং কথিত ‘ফাইল টানাটানি’ করে কোনো একটা ‘অপরাধ’ করে ফেলেছেন, তাহলেও সেই ‘অপরাধের’ প্রতিকার অন্য কোনোভাবেই করা যেত না? ছয় মাসের কারাদ-ই কি একমাত্র প্রতিকার ছিল? কেন? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কী কারণে সাংবাদিক রানার প্রতি এতটা অস্বাভাবিক ক্রুদ্ধ এবং ক্ষুব্ধ হলেন সে বিষয়টির অনুসন্ধান হওয়া জরুরি। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যে পরিষ্কার যে নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তথ্য চাওয়া এবং তথ্য চেয়ে দাখিলকৃত আবেদনপত্রের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র চাওয়ার ঘটনায় একজন নাগরিকের ওপর তার প্রশাসনিক এবং বিচারিক ক্ষমতার অস্বাভাবিক, মাত্রাতিরিক্ত এবং অনুপাতহীন অপব্যবহার করেছেন। কেন তিনি এমন অস্বাভাবিক কঠোর পন্থা প্রয়োগ করলেন? এর মাধ্যমে তিনি সাংবাদিক এবং পেশাদার সাংবাদিকতার প্রতি কী বার্তা দেওয়ার প্রয়াস নিলেন?
সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রানার তাৎক্ষণিক কারাদন্ডে দন্ডিত হওয়ার ঘটনাটি নেহাত বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি যুগ-পুরাতন, ঔপনিবেশিক রুগ্ণ মানসিকতারই প্রকাশ মাত্র। এই অনভিপ্রেত, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অগ্রহণযোগ্য এবং ন্যক্কারজনক নিবর্তনমূলক ঘটনাটি দেশে পেশাদার স্বাধীন সাংবাদিকতার বর্তমান হালহকিকত এবং সাংবাদিকতা পেশার স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশেষত নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা অনুধাবনে একটি তাৎপর্য ইঙ্গিতও বটে।
এ প্রসঙ্গে গত সোমবার সম্পাদক পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মোবাইল কোর্ট বসিয়ে একজন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানোর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের চিরায়ত আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।’ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ও ব্যক্তিস্বার্থে যারা মোবাইল কোর্ট আইনের চরম অপব্যবহার করেছেন, সম্পাদক পরিষদ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
২০০৯ সালে প্রণীত ‘তথ্য অধিকার আইন’ এবং ‘তথ্যপ্রাপ্তি বিধিমালা’ ও এর পরের বছর প্রণীত ‘তথ্য অধিকার প্রবিধানমালার’ মূল লক্ষ্য এবং মর্মাথই হলো নির্দিষ্ট কতিপয় ক্ষেত্র ব্যতিরেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরিচালনা এবং শাসনব্যবস্থার সব তথ্যে জনগণের অধিকার, অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং তথ্যে জনগণের অভিগম্যতা নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রের একজন বেতনভূক কর্মকর্তা হিসেবে দেশের জনগণের তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত করা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর আইনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তথ্য অধিকার আইনের আলোকে তথ্যের সহজ এবং অবাধ অবমুক্তি নিশ্চিত করতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সহায়কের ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আলোচ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যা করলেন তা তো আইনের বাধ্যবাধকতা, মর্মার্থ, মৌলিক লক্ষ্য এবং আকাক্সক্ষার পরিপন্থী। নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংঘটিত ঘটনার ফলে সুষ্ঠু ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হলো এবং পেশাদার স্বাধীন সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের পথে এক ধরনের ভয়ভীতি, নিরুৎসাহ এবং বাধা দানের দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো যা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি অবাঞ্ছিত হুমকির শামিল। এই ঘটনা স্পষ্টতই রাষ্ট্রের একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীন অপব্যবহার, অনুপাতহীন বেসামাল প্রতিক্রিয়া মাত্র। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একজন সরকারি কর্মকর্তার স্বাধীন সাংবাদিকতার মর্মার্থ অনুধাবনের অক্ষমতার পাশাপাশি তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে জনগণের ক্ষমতায়নে রাষ্ট্রের একজন সরকারি কর্মকর্তার যে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা অনুধাবনের ব্যর্থতারই দুঃখজনক নজির।
প্রায় দেড় দশক আগে তথ্য অধিকার আইনটি প্রণীত হলেও তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং তথ্যে জনগণের অবাধ অভিগম্যতার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণের যে সমষ্টিগত আকাক্সক্ষা সে লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি এখনো অতিনগণ্য। তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগে তথ্য লাভ করে জনগণের ক্ষমতায়নের পথে ইচ্ছাকৃত নানা ধরনের দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানি সৃষ্টি করা দুর্ভাগ্যজনকভাবে নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে রয়ে গেছে।
লেখক: সাংবাদিকতার প্রশিক্ষক; সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, দি ডেইলি স্টার