কৃষিক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল জনগোষ্ঠীর এই দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষি খাতে উচ্চ ফলন খুবই জরুরি। এর জন্য দরকার যথাযথ সেচব্যবস্থা। কিন্তু ডিজেলের ব্যবহারে একদিকে যেমন বিপুল ব্যয় হচ্ছে অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। এই বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎ আমাদের জন্য খুবই একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারে।
দেশ রূপান্তরের মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, কৃষিতে সেচের জন্য সারা দেশে প্রায় চার হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প স্থাপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রায় ৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর ফলে গ্রিড বিদ্যুতের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি কমেছে ডিজেলের ব্যবহার। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-দূষণ কমানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে কৃষিতে উৎপাদন খরচও কমেছে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডো)-এর হিসাবমতে, বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের পাশাপাশি রয়েছে ডিজেলচালিত ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৫০৭টি পাম্প এবং বিদ্যুৎচালিত পাম্পের সংখ্যা রয়েছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৭টি। ডিজেলচালিত পাম্পের কারণে প্রতি বছর অন্তত ৮ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয় হয় আমদানিতে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয়ের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এ পাম্পগুলো সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা গেলে কৃষক তুলনামূলক কম খরচে সেচ দিতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঈদের পর একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে কার্যকর ভূমিকা রাখা যেতে পারে। সেচে পরিমাণের চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার থেকেও আমাদের বিরত থাকা দরকার।’ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, সোলার ইরিগেশন পাম্পের ব্যাপক প্রসারে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। ডিজেল পাম্পের ব্যবহার কমাতে পারলে কার্বন-দূষণের পরিমাণও কমবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
সরকারের এই নীতি প্রশংসনীয়। কিন্তু, এর আগে বহু বছর আমরা দেখেছি কুইক রেন্টাল খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে আমাদের দেশের বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে এবং পরিবেশ দূষণ হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোর বোঝা এখনো দেশকে টানতে হচ্ছে এবং সৌরবিদ্যুৎ গোটা দেশের না হোক অন্তত কৃষিক্ষেত্রে যথেষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে কি না তা দেখার বিষয়। প্রারম্ভিক খরচ এবং আবাদি জমিতে প্যানেল স্থাপন করায় মূল্যবান ফসলি জমি বিনষ্ট এবং অপচয় হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে, বেসরকারি উদ্যোগে যেসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, তারা কখনোই এই প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন চাইবে না। শুধু এই বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা গেলে, কোনোভাবেই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। মোদ্দা কথা, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগের ওপরই নির্ভর করছে এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। পাশাপাশি এই উদ্যোগ যেন মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট উপযোগী করা যায় সেই বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। আর আগে আমরা দেখেছি সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে ট্রাফিক বাতি চালানোর মতো ছোটখাটো উদ্যোগও ভেস্তে গেছে।
বর্তমানে মোট ডিজেল পাম্পের এক শতাংশেরও কম সৌরবিদ্যুতে চালিত হচ্ছে। ফলে, বিপুল আকারে এর প্রয়োগ করতে হলে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কৃষি খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করারও সুযোগ নেই, কারণ তা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এসব বিষয়কে লক্ষ রেখে, সৌরবিদ্যুৎ আরও বিস্তারের দুরূহ কাজটি এগিয়ে নিতে হবে।