এক যুগ পর আবার সোমালীয় জলদস্যুদের কবলে পড়েছে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’। মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে প্রায় অর্ধশত সশস্ত্র জলদস্যু। জাহাজের ২৩ বাংলাদেশি নাবিককেও জিম্মি করে রেখেছে তারা।
এমভি আবদুল্লাহ নামের জাহাজটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান এস আর শিপিং লিমিটেড। এটি কবির গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি’ ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আরব সাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল।
এস আর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম দেশ রূপান্তরকে জানান, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে জাহাজের নাবিকদের মাধ্যমে তারা ঘটনার বিষয়ে জানতে পারেন। তিনি জানান, মোজাম্বিকের মাপুতু বন্দর থেকে কয়লা নিয়ে আরব আমিরাতের হামরিয়া বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় অন্তত ৫০ জন জলদস্যুর একটি দল জাহাজটিতে উঠে নাবিকদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তিনি জানান, জলদস্যুরা নাবিকদের কেবিনে আটকে রাখে। তারা অক্ষত রয়েছেন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) একটি সূত্র জানায়, জাহাজটির ২৩ জন নাবিকের মধ্যে ৭ জন বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা ক্যাডেট রয়েছেন। তারা হলেন চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খান, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, থার্ড অফিসার মো. তারেকুল ইসলাম, ডেক ক্যাডেট মো. সাব্বির হোসাইন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এএসএম সাইদুজ্জামান, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন ও ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খান। বাকি নাবিকরা হচ্ছেন জাহাজের মাস্টার মো. আবদুর রশিদ, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভির আহমদ, ইলেকট্রিশিয়ান ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ, মো. আনোয়ারুল হক, মো. আসিফ উর রহমান, মো. সাজ্জাদ হোসাইন, জয় মাহমুদ, মো. নাজমুল হক, আইনুল হক, মো. শামসুদ্দিন, মো. আলী হোসাইন, মোশাররফ হোসেন শাকিল, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. নুর উদ্দিন ও সালেহ আহমদ। নাবিকদের মধ্যে চট্টগ্রামের ১১, ফরিদপুরের ১, টাঙ্গাইলের ১, নওগাঁর ১, খুলনার ১, নেত্রকোনার ১, লক্ষ্মীপুরের ১, নোয়াখালীর ২, ফেনীর ১, নাটোরের ১ ও বরিশালের ১ জন রয়েছেন।
একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, জলদস্যুরা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় জাহাজটির এক নাবিক বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতার কাছে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠান। ওই বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘এমভি আবদুল্লাহ। পাইরেটস অ্যাটাক অন সোমালিয়া, প্লিজ হেল্প আস। দে হ্যাভ গান। উই আর অ্যাটাকড।’
এরপর মার্চেন্ট মেরিন কর্মকর্তারা যোগাযোগ শুরু করেন জাহাজটির মালিকপক্ষ কবির গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে কবির গ্রুপের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ হয়। তারা জানতে পারেন, নাবিকদের কেবিনে আটকে রাখা হয়েছে। জলদস্যুরা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে জাহাজের নাবিক আসিফুর রহমান ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে আমরা আক্রমণের শিকার। আমরা সবাই সুস্থ ও নিরাপদে আছি। আমাদের প্রার্থনায় রাখুন।’ এ পোস্টে জলদস্যুরা জাহাজে উঠছে, এমন একটি ভিডিও শেয়ার করেন নাবিক আসিফুর রহমান।
এর আগে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় জাহাজের চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খান ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এতে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমরা ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। দুশ্চিন্তা কোরো না।’
জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান কবির গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার মিজানুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, জাহাজে থাকা নাবিকদের সঙ্গে তাদের মোবাইলে যোগাযোগ হয়েছে। তারা সবাই অক্ষত আছেন। তিনি জানান, জলদস্যুরা এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
কবির গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সোমালিয়ার জলদস্যুরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার দিকে জাহাজটি নিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিয়ে জাহাজ ও নাবিকদের মুক্তিপণ নিয়ে দরকষাকষি শুরু করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তারা কোনো যোগাযোগ করেনি।
এস আর শিপিংয়ের মালিকানাধীন আরেকটি জাহাজ এমভি জাহান মনি ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর আরব সাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে। ওই সময় জলদস্যুরা জাহাজটির চিফ অফিসার ও তার স্ত্রীসহ ২৫ জন নাবিককে জিম্মি করে ১০৫ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। ১০০ দিন জিম্মি থাকার পর বড় অঙ্কের মুক্তিপণের মাধ্যমে তাদের উদ্ধার করা হয়।
এদিকে এমভি আবদুল্লাহ জলদস্যুদের হাতে পড়ার খবর পাওয়ার পর জাহাজটির নাবিকদের স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাদের অনেকেই এস আর শিপিংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাবিকদের অবস্থা জানতে চাইছেন। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে নাবিকদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হবে বলে স্বজনদের আশ^স্ত করা হচ্ছে।
