সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহর অশেষ রহমতে চলতি রমজান মাসের প্রথম তারাবি, সাহরি আদায় করে রোজা পালন ও ইফতারের সুযোগ পেয়েছি। আজ দ্বিতীয় রোজা। তুলনামূলক সহনীয় আবহাওয়া রোজা পালনকে আরও সহজ করে দিয়েছে। এটাও আল্লাহতায়ালার এক বিশেষ রহমত বটে। এমনিতে পবিত্র রমজান মাস শুরু হলে, চারপাশের পরিবেশে বেশ বদল ঘটে, মানুষের মন-মেজাজ, আচার-আচরণ ও
কথাবার্তায়ও পরিবর্তন আসে। মসজিদে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকে। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।
বছরের বিভিন্ন সময়ে আমরা ব্যস্ত থেকেছি বস্তুগত নানা আয়োজনে এবং পার্থিব নানা ঝামেলা ও চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নিয়ে। ফলে আমাদের অসচেতন আত্মা খোদাপ্রেমের রাজপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবলই নেমে গেছে নীচ থেকে নিচু পর্যায়ে। তাই দরকার ছিল এমন একটি সুযোগ আসার, যেখানে আত্মাকে উন্নীত করা যাবে আধ্যাত্মিকতার উচ্চশিখরে।
আল্লাহতায়ালার একান্ত সান্নিধ্য লাভের জন্য হৃদয়-মনকে আল্লাহমুখী করে নামাজ আদায় করা এক অতি বড় সুযোগ, তাতে কোনো সংশয়-সন্দেহ নেই। অন্য ইবাদতগুলোতেও রয়েছে একই ধরনের সুযোগ। কিন্তু রমজানে খোদাপ্রেমের সুযোগগুলো অনেক বেশি প্রশস্ত এবং এ মাসে আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমগুলোও বেশি বৈচিত্র্যময়। যেমন নফল নামাজ ছাড়াও প্রেমময় জিকির-আজকার ও দোয়া-মোনাজাত রমজানের বাড়তি আকর্ষণ। খোদাপ্রেমের মোহনীয় সব সংলাপ শেখার এক দারুণ মাধ্যম এসব দোয়া-মোনাজাত। দোয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রিয় হয়, তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই আমাদের উচিত রমজানে বেশি বেশি দোয়া-মোনাজাত করা। এ প্রসঙ্গে নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষরা। বেহেশতের দরজাগুলো এ মাসে তোমাদের জন্য খোলা থাকবে। আল্লাহর কাছে এমনভাবে দোয়া করো যাতে তা তোমার জন্য বন্ধ হয়ে না যায়। রমজান মাসে দোজখের দরজাগুলো বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা করো যাতে তা তোমার জন্য কখনো খুলে না যায়। এ মাসে শয়তানগুলোকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দি রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা করো যাতে তারা তোমাদের ওপর কর্র্তৃত্ব করতে না পারে।
হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না ১. রোজাদারের দোয়া ইফতার পর্যন্ত। ২. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর দোয়া। ৩. মাজলুমের দোয়া।’ আল্লাহতায়ালা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে উঠিয়ে নেন। এজন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আর আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমার ইজ্জতের কসম। বিলম্বে হলেও আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব।’ (জামে তিরমিজি : ৩৫৯৮)
রমজানে রোজা পালন, নামাজ আদায় ও দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে বিশেষ ফজিলত ও বরকত অর্জন ছাড়াও কোরআন তেলাওয়াত এ মাসের নুরানি আকর্ষণের বাড়তি দিক। রমজান মাসকে বলা হয় কোরআনের বসন্তকাল। আত্মগঠন ও চরিত্র সংশোধন এবং মনের ওপর জমে থাকা মরিচাগুলো অপসারণের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করার ও সব জঞ্জাল এবং পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করার মাধ্যম হলো কোরআন তেলাওয়াত ও অধ্যয়ন। তাই রমজানের কোরআন তেলাওয়াতে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।
রমজান আল্লাহর দিকে সফর করার মাস। তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, গোনাহ বর্জন করা। ফরজ ও নফলসহ আমরা যত বেশিই ইবাদত করি না কেন, পাপ বর্জন করা না হলে কাক্সিক্ষত আত্মসংশোধন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা অসম্ভব হয়ে যাবে।
লেখক: পরিচালক, মারকাযুত তারবিয়াহ বাংলাদেশ