অপরাধ করিনি ভুলও স্বীকার করিনি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৪, ০২:২১ এএম

শেরপুরের নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরে তথ্য চাইতে গিয়ে অসদাচরণের অভিযোগে ছয় মাসের কারাদণ্ড পাওয়া দেশ রূপান্তরের নকলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানা ভ্রাম্যমাণ আদালতে দোষ স্বীকার করেননি বলে দাবি করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জামিনে মুক্তির পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন।

শফিউজ্জামান বলেন, ‘মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়ার আগে আমাকে সরি বলার জন্য বলেছিল। আমি বলছি, আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমি এখানে তথ্য অধিকার ফরমে আবেদন নিয়ে আসছি। আমি কেন সরি বলব? এরপর ওসিকে ফোন দেয়। আমি ও আমার বড় ছেলে সিসি ক্যামেরার নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর ওসি সিভিল কাপড়ে এসে আমাকে নিয়ে যায়।’

গতকাল দুপুরে সাংবাদিক শফিউজ্জামানকে দেওয়া কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিএম) আবদুল্লাহ আল খায়রুমের আদালতে আপিল করেন আইনজীবী মো. আবদুর রহিম। আপিলে আইনজীবী উল্লেখ করেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতে শফিউজ্জামানকে দেওয়া সাজা বিধিসম্মত হয়নি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে শফিউজ্জামান দোষ স্বীকার করেননি। এজন্য সাজার আদেশ রহিত ও বাতিলের আবেদন জানান আইনজীবী। ডিএম আবদুল্লাহ আল খায়রুম আপিলটি গ্রহণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) জেবুন নাহারের আদালতে পাঠান। পরে বিকেলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে শফিউজ্জামান কারাগার থেকে মুক্তি পান। ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া সাজায় ৫ মার্চ থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।

ইউএনওর দপ্তরে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শফিউজ্জামান বলেন, তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাইতে ৫ মার্চ বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইউএনওর দপ্তরে যান। তিনি তথ্য অধিকার আইনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও জাইকার কয়েকটি প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন এবং রিসিভড কপি চান। এতে ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন তার (শফিউজ্জামান) ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে ও তার ছেলেকে গালাগাল করেন। একপর্যায়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিহাবুল আরিফকে ডেকে এনে ইউএনওর দপ্তরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে (শফিউজ্জামান) দুটি ধারায় কারাদণ্ড দেন। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো।

এ বিষয়ে গত শনিবার ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন বলেছিলেন, ‘সাংবাদিক রানা তথ্য চেয়ে আবেদন করতে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি তখনই তথ্য চান। আমি তাকে বলি, এখন আমার মিটিং আছে। তথ্য দেওয়ার জন্য আমার হাতে ২০ দিন সময় আছে। কিন্তু রানা সিএ শীলার কাছে থাকা তথ্যের ফাইল টানাটানি করেন এবং নানা ধরনের অশালীন ভাষায় কথাবার্তা বলেন। তিনি অসদাচরণ করেছেন। এতে অফিসের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। তাই আমি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে বলেছি।’

সাংবাদিক শফিউজ্জামান তার মুক্তির প্রতিক্রিয়ায় শেরপুর, নকলাসহ সারা দেশের সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তাকে সাজা দেওয়ার পর তথ্য কমিশন দ্রুত অনুসন্ধানের যে উদ্যোগ নিয়েছে সেজন্য তথ্য কমিশনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সাংবাদিকদের প্রতিবাদ মানববন্ধন : সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন সাংবাদিকরা। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

শেরপুর : গতকাল সকাল ১০টায় ঝিনাইগাতী বাজারের ঐতিহাসিক আমতলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ঝিনাইগাতীতে কর্মরত সাংবাদিকরা। সিনিয়র সাংবাদিক আমিরুজ্জামান লেবুর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ঝিনাইগাতী প্রেস ক্লাব সভাপতি নমশের আলম, সাধারণ সম্পাদক দুদু মল্লিক, সহসভাপতি জিয়াউল হক, উপজেলা প্রেস ক্লাব সভাপতি হারুন অর রশীদ দুদু, রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলামসহ অনেকে।

গাইবান্ধা : সকালে জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের চৌরাস্তা মোড় এলাকায় পলাশবাড়ী সাংবাদিক সমাজ ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে শতাধিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তি অংশ নেয়। ঘণ্টাব্যাপী এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পলাশবাড়ী প্রেস ক্লাব সভাপতি ফজলুল হক দুদু। এ সময় বক্তব্য দেন প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রতন, সহসভাপতি সাইদুর রহমান প্রধান, সহসভাপতি নুরুল ইসলাম, প্রেস ক্লাব পলাশবাড়ীর সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক আবুল কালাম আজাদ, রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলামসহ অনেকে। সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি আব্দুল্লাহ আদিল নাননু। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।

কুড়িগ্রাম : রানার মুক্তি ও নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া উম্মুল বানিমের তদন্তসাপেক্ষে বিভাগীয় শাস্তি দাবিতে মানববন্ধন করেছেন সাংবাদিকরা। এ সময় কুড়িগ্রাম টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলমগীর বলেন, ‘নকলায় সাংবাদিকের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন যে ব্যবহার করেছে এবং তার ছোট সন্তানের সামনে আদালত বসিয়ে যে সাজা দেওয়া হয়েছে তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিষয়টি স্বতন্ত্রের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) : নান্দাইল সাংবাদিক সমাজের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদের সামনে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সমাবেশে সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানাকে তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাকে কারাদন্ড দেওয়ার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপনসহ অবিলম্বে সাংবাদিক রানার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা। এ ছাড়া সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারকারী নকলা উপজেলার ইউএনও এবং এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।

পঞ্চগড় : নকলা প্রতিনিধির নিঃশর্ত মুক্তি ও ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন পঞ্চগড়ের গণমাধ্যমকর্মীরা। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায় জেলায় কর্মরত অর্ধশত গণমাধ্যমকর্মী স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন। গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম শহীদের নেতৃত্বে গণমাধ্যমকর্মীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসকের হাতে স্মারকলিপিটি তুলে দেন। জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম স্মারকলিপিটি গ্রহণ করে বলেন, স্মারকলিপিটি যথাস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে এবং সরকার বিষয়টির তদন্ত শুরু করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত