অনিশ্চয়তার ভার বইতে পারছেন না ৪১তম বিসিএসের চাকরিপ্রার্থীরা

  • এক বিসিএসে ৫১ মাস
  • তীব্র প্রতিযোগিতার ধকল আর নিতে পারছেন না ২৫০০ চাকরিপ্রার্থী
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ০১:৩৯ পিএম

দীর্ঘ সময়ে ধাপে ধাপে তীব্র প্রতিযোগিতার ধকল আর নিতে পারছেন না ২ হাজার ৫০০ চাকরিপ্রার্থী। সব ধাপেই বাদ পড়ার চরম আশঙ্কা, যা এখনো শেষ হয়নি। পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) ৫১ মাস আগে চাকরির আবেদন করেছেন তারা। পিএসসি চূড়ান্ত সুপারিশ করলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখনো চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে পারেনি। কবে ৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগ হতে পারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিগগির, যেকোনো দিনে নিয়োগ হয়ে যাবে।’

কিন্তু এই ‘যেকোনো দিনের’ অনিশ্চয়তার ভার বইতে পারছেন না ৪১তম বিসিএসের এ চাকরিপ্রার্থীরা। আর কোনো বিসিএস প্রার্থীকে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়নি। এর আগে ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছিল ৪৮ মাসে, যা ছিল রেকর্ড সময়। এবার ৩৮তম বিসিএসের রেকর্ডও ভেঙেছে। এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে ৫১ মাস।

যেকোনো দিন নিয়োগ হয়ে গেলে শুরু হবে রাজনৈতিক হয়রানির মাতম। কারণ পিএসসি সুপারিশ করার পরই শুরু হয়েছে কোন কোন পরিবারে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সমর্থক নেতা বা কর্মী রয়েছেন, তার তালাশ। পুলিশ ভেরিফিকেশনে তাদের খুঁজে খুঁজে বের করা হয়। ৪০তম বিসিএসেও ৩৪ জন প্রার্থীকে রাজনৈতিক বিবেচনায় পিএসসির সুপারিশের পরও নিয়োগ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ২০২২ সালের ১ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরিবারে কেউ বিএনপি করলে তার সরকারি চাকরি হচ্ছে না। এমনকি অতীতে কখনো বিএনপি করলে তার চাকরিও হচ্ছে না।

পুলিশ ভেরিফিকেশনে দুবার বাদ পড়া শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা আর নতুন কিছু না। পিএসসির সুপারিশ জনপ্রশাসনে এলে তাদের কাজ হচ্ছে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা। তারা পুলিশ ভেরিফিকেশনে পাঠিয়ে দেন। ঠিক আছে, পুলিশ ভেরিফিকেশনে পাঠাতে হবে। কিন্তু রাজনীতিকীকরণ হলো কেন? যারা মেধাবী তাদেরই তো বিসিএস হওয়ার কথা। কিন্তু কার ভাই বিরোধী রাজনৈতিক দল করেছে সেটা কেন চাকরিপ্রার্থীর বেলায় খুঁজে বের করতে হবে। একজনের ভাই, বাবা, মা, বোন, দাদা বা নিকটাত্মীয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতেই পারেন। তার জন্য চাকরিপ্রার্থীর চাকরির পথ বন্ধ করতে হবে কেন?’

জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, যেখানে পিএসসি ১২ মাস বা এক বছরে একটি বিসিএস শেষ করার রোডম্যাপ করেছে সেখানে চার বছর তিন মাসেও চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে না পারা সাংঘর্ষিক। পিএসসি ৪৫তম বিসিএস এক বছরে শেষ করার রোডম্যাপ করেছিল। কিন্তু পারেনি। পরে তা ৪৬তম বিসিএস থেকে শুরু করার রোডম্যাপ করা হয়। কিন্তু সেখানেও পিছিয়ে গেছে। গত ৯ মার্চ ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তা পিছিয়ে দিতে হয়েছে। বেকারের এই দেশে বর্তমানে পাঁচ লাখ সরকারি পদ শূন্য। তারপরও এ দেশে শূন্যপদে নিয়োগ পরীক্ষা অগ্রাধিকার পায় না। বিসিএস পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচন করা হয়।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১২ মাসে একটি বিসিএস শেষ করতে না পারার কোনো কারণ নেই। প্রতিবেশী দেশটি প্রতি বছর একটি করে ব্যাচ তাদের সিভিল সার্ভিসে ঢোকাচ্ছে। আমরা কেন পারছি না? বেকারদের সোনালি সময় কারা কেড়ে নিচ্ছে? যেকোনো অবস্থায় এক বছরে বিসিএস শেষ করার প্রত্যয় থাকতে হবে।’

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ৪১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট ২ হাজার ৫২০ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করে সাংবিধানিক এ সংস্থা। সুপারিশের সাত মাস পার হয়েছে। এখনো নিয়োগপত্র ইস্যু করতে পারেনি জনপ্রশাসন। করোনার কারণে আটকে যায় এ বিসিএস। করোনার প্রাদুর্ভাব কমার পর ২০২১ সালের ১৯ মার্চ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রার্থীরা পরীক্ষা কেন্দ্রে যান। ২০২১ সালের ২ আগস্ট প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করা হয়। এতে উত্তীর্ণ হন ২১ হাজার ৫৬ জন। ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বার থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষা হয়। ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ১৩ হাজার প্রার্থী। ২০২৩ সালের ২৬ জুন শেষ হয় ৪১তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা। এরপর ৬ আগস্ট চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত