সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র আসার পর বামপন্থার ঢেউ আছড়ে পড়ে বিশ্ব জুড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অবস্থা কী দ্য আটলান্টিক অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সমাজতন্ত্রকে একটা সময় মনে করা হতো অনিবার্য। বামপন্থিরা বলে থাকেন, পুঁজিবাদ তার অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে দেশে দেশ সমাজতন্ত্র আসবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ভøাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্ব সমাজতন্ত্র কায়েম হলে বিশ্ব জুড়ে এ ধারার রাজনীতির প্রতি অনেকে আকৃষ্ট হয়। তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বামপন্থিরা ক্ষমতায় চলে আসে। লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়া পর্যন্ত বামপন্থিরা বিভিন্ন নাম ও নীতি, শাসন পদ্ধতি অবলম্বন করে এখনো ক্ষমতায় আছে। বামপন্থি আন্দোলনের সুফল ভোগ করছে পৃথিবীবাসী। ভোটাধিকার, শ্রম অধিকার, নারীর স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছে বামপন্থিরা। কিন্তু তাদের অবস্থা এখন কেমন?
এ বিষয়ে দ্য আটলান্টিকে একটি নিবন্ধ লিখেছেন আরাশ আজিজি। তিনি দ্য আটলান্টিকের একজন প্রদায়ক লেখক এবং ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। যদিও তার লেখাটি আবর্তিত হয়েছে মার্কিন নির্বাচন নিয়ে। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের লড়াই হতে যাচ্ছে। সেখানে বামপন্থিরা কাকে সমর্থন করবেন? অবশ্যই তারা ট্রাম্পের বিরোধী। কিন্তু এবার বাইডেনের পক্ষেও তারা থাকতে পারছেন না। এর প্রধান কারণ ফিলিস্তিনে চলমান নির্বিচার গণহত্যা। যাতে শুধু সমর্থন নয়, অস্ত্র দিয়েও সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বামরা এ কারণে বাইডেনকে আবার ক্ষমতায় বসাতে আগ্রহী নন। তাহলে কি তারা চান ট্রাম্প ক্ষমতায় আসুক? এমনটা বামরা কিছুতে চাইতে পারে না। তাদের নিজেদেরও ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নেই? তাহলে কী করবে বামরা এবার? এ প্রশ্ন সামনে রেখে আরাশ আজিজি বৈশ্বিক বাম রাজনীতির প্রসঙ্গও এনেছেন। তিনি বলেছেন, অতি বিশুদ্ধতাবাদ বামপন্থিদের জন্য সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমেরিকান বাম
আরাশ আজিজি লিখেছেন, আমেরিকান বামপন্থিরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করতে জো বাইডেনকে সমর্থন করবেন, না দুই প্রার্থী ‘একই’ বিবেচনায় ভোটদানে বিরত থাকবেন এমন প্রশ্নের মুখোমুখি এখন। গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলার প্রেক্ষিতে বাইডেনের প্রতি সমর্থন দিতে পারছেন না তারা। চার বছর আগে দেশটির বৃহত্তম বামপন্থি সংগঠন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট অব আমেরিকা (ডিএসএ) ঘোষণা করে যে, তারা বাইডেনকে সমর্থন করছে না। তবে এ ঘোষণা সামগ্রিকভাবে দলটি মানতে পারেনি। ওই নির্বাচনে বাইডেনের সঙ্গে ছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স, অ্যাঞ্জেলা ডেভিস, তাদের নিজস্ব নেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, সবচেয়ে বড় ট্রেড ইউনিয়ন এবং পরোক্ষভাবে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন। তখন ডিএসএ নেতাদের কেউ কেউ বাইডেনের পক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠরা প্রস্তাবটি বাতিল করে দেয়। তারপরও ঠেকানো যায়নি বাইডেনকে, বামপন্থিদের সাহায্য ছাড়াই জিতে যান তিনি।
আরাশ আজিজির পরামর্শ হলো, আমেরিকান বামরা আন্তর্জাতিক ‘কমরেডদের’ অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারেন। বিশ্বের প্রায় সব দেশে বামরা ছোট বলে তারা জোট গঠনের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করে। তিনি বলছেন, ফ্রান্স, ভারত এবং জাপানের মতো দেশে বামরা শক্তিশালী শক্তি। লাখ লাখ সদস্য রয়েছে তাদের। এমনকি সংসদ বা সরকারেও তাদের প্রতিনিধি প্রেরণ করে। আমেরিকান বামপন্থিরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় কোনো বামপন্থি নেই। যদিও ২০ শতক জুড়ে নারী ভোটাধিকার, শ্রমিক অধিকার আদায়ের মতো আন্দোলনে বামরা নেতৃত্ব দিয়েছে।
এক হিসাবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থিদের সংখ্যা ধরা হয় ৭৮ হাজার। যার ২০২১ সালে ছিল ৯৫ হাজার। তারও আগে ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৬ হাজার ২০০। এরপর যে বামপন্থিদের সংখ্যা বাড়ে তার কারণ বার্নি স্যান্ডার্স। ডেমোক্র্যাটদের হয়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে তিনি বাইডেনের সঙ্গে লড়েন। তবে তার বাম মতাদর্শ মার্কিন জনগণের মাঝে নতুন জোয়ার তৈরি করে। অনেকে তখন এ মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
এ লেখক জানাচ্ছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক বামপন্থি বিংশ শতাব্দীর একনায়কতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ধারণা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সংগ্রাম করছে। আবার কিছু বামপন্থি আছে, যারা বাতাসে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আবার নতুন বামপন্থি দল যেমন গ্রিসের সিরিজা এবং স্পেনের পোডেমোস ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ধ্বংসাবশেষ থেকে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও পরবর্তী সময় তাদের অর্জন কম। অন্যদিকে একাধিক মহাদেশে সমাজতান্ত্রিক দল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে। এ লেখায় ভারতের বামপন্থিদের উদাহরণও দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের কমিউনিস্ট দলগুলো দেশটির বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছে। গত বছর তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আঞ্চলিকতাবাদী এবং এমনকি ডান দলগুলোর সঙ্গে একত্রিত হয়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স গঠন করে। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান শুরু করা। তাদের মতামত হলো, দেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে আছে, যে কোনো দল যদি আন্তরিকভাবে ভারতকে বাঁচাতে চায় এবং গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ হয়, তাহলে তারা তাদের সঙ্গে জোট করবে।
একইভাবে ওয়ার্কার্স পার্টি এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি মার্কসবাদী দল তুরস্কে গত বছর মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কামাল কিলিকদারোগ্লুর পক্ষে প্রচার করে। যদিও তারা রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে পরাজিত করতে পারেনি। কিন্তু সেখানকার বামরা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংসদীয় প্রতিনিধি পেয়েছে। অপরদিকে ইসরায়েলে আরব ও ইহুদি সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি বামপন্থি জোট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে বেনি গ্যান্টজকে সমর্থন করেছে।
রণকৌশল
একইভাবে পর্তুগাল এবং স্পেনে বামপন্থিরা জোট গঠন করছে। যার ফলে উগ্র-ডান বা উগ্রপন্থিরা দুর্বল হচ্ছে। এ দুই দেশে বামপন্থিরা ক্ষমতায়ও আছে। আরাশ বলেছেন, স্পেন এবং পর্তুগালে বামদের সরকারে যোগ দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু এটা স্বীকার করতে হবে যে, বামদের প্রভাবে এ দুই দেশের সরকার এমন কিছু নীতি গ্রহণ করেছে, যা লাখ লাখ মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। যেমন- স্পেন লিঙ্গ-সমতা আইন পাস করেছেম যা ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া বামদের কারণে পিরিয়ডে ভুগছেন এমন নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ছুটির বন্দোবস্ত হয়েছে স্পেনে। যা ইউরোপের মধ্যে প্রথম। রাজনীতিতে নারীর সক্রিয়তাও বেড়েছে। পর্তুগালে মজুরি, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তার কাটছাঁট বাতিল হয়েছে। বিপরীতে আমেরিকান বামরা এ ধরনের রাজনীতি করছে না। তারা প্রথাগত সমাজতন্ত্রের ধারণা নিয়ে আছে। তারা যদি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হতে চায়, তাহলে অবশ্যই নির্বাচনে জয়ী হয়ে, ক্ষমতায় আসতে হবে। মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার এসব সুযোগ লাগাতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে, ভারতের কেরালায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সরকার মানব উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, জনশিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যে বিশেষ অগ্রগতি ঘটিয়েছে। কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা করোনভাইরাস মহামারী মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও বামদের সোনালি ইতিহাস ছিল বলে জানান এ লেখক। তিনি লেখেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সোশ্যালিস্ট পার্টি অব আমেরিকার আকারে একটি শক্তিশালী বামপন্থি শক্তি ছিল। যার সদস্যরা বার্কলে, ক্যালিফোর্নিয়া এবং নিউইয়র্কের মতো জায়গায় মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন। মিলওয়াকি ১৯১০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মোট ৩৮ বছর মেয়র ছিলেন। আমেরিকান সমাজতন্ত্রীরা যদি সত্যি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়, তাহলে তাদের বিশুদ্ধতাবাদের খেলা বন্ধ করতে হবে এবং গণতন্ত্রকে রক্ষায় জোট গঠন এবং সফল সরকার পরিচালনা শিখতে হবে।
বিশ্বের দেশে দেশে বামপন্থা এখনো জনপ্রিয়। বামদের পক্ষে সম্ভব জনমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে একাট্টা থাকা। এ ছাড়া দুর্নীতি দমনেও বামপন্থিরা কঠোর বলে জানা যায়। পাশাপাশি তারা প্রথমে স্থানীয় প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যে কারণে অনেকে চায় না বামপন্থিরা ক্ষমতায় আসুক। কারণ এর ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতি হোঁচট খায়। উন্মুক্ত অর্থনীতির স্বার্থে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষার কৌশল জনগণ পছন্দ করতে পারে না। যদিও বামপন্থি অর্থনীতিও পরবর্তী সময় সংকটে পড়ে বলে দেখা যায়। যেমন কিউবার কথা ধরা যাক। এক সময়ের শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজ স্বার্থে তাদের ঐক্য করতে হচ্ছে এখন। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য বাম সরকারও উদার নীতির পথ বেছে নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে তারা জনমুখী নীতিনির্ধারণকে গুরুত্ব দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এমন অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থা চায় অনেকে। তবে বামপন্থিদের নিষ্ক্রিয় স্বভাব, আদর্শে অটল থাকা, সঠিন কৌশল অবলম্বন করতে না পারায় তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে না। ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়েও যেন তাদের অনাগ্রহ আছে। যে কারণে আরাশ আজিজি বলেছেন, জোট গঠনের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করতে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে। এর সঙ্গে মিশব না, তার সঙ্গে যাব না কৌশল অবলম্বন করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বামরা আরও কোণঠাসা হবে বলেই তার মত।
