রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঈদযাত্রায় আমাদের স্বেচ্ছাচারিতা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫২ এএম

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে বাড়ি ফেরার বিড়ম্বনা। উৎসব উপলক্ষে শেকড়ের টানে মানুষ তার গ্রামে স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারও পক্ষেই প্রতি ঈদে মহানগর বিশেষত রাজধানী ঢাকাবাসীদের নাড়ির টানে দেশের বাড়ি বা ঘরে ফেরার বিড়ম্বনা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। প্রতি বছর এই এক চিরচেনা দুর্গতি।

শহুরে জীবনের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, দুঃখ, দুর্দশা, ক্লান্তি ও অবসাদ থেকে সাময়িক মুক্তির প্রবল আকাক্সক্ষা থেকেই মানুষ পাহাড়সম বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে গ্রামবাংলার দিকে ছুটে যেতে সর্বদা ব্যাকুল। ফলে যাত্রাপথের বিড়ম্বনাকে তুচ্ছজ্ঞান করে আপনজনদের সঙ্গে মিলনের আনন্দে বিভোর থাকে মানুষ। বিপদসঙ্কুল যাত্রাপথে ঝুঁকিপূর্ণ, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চ, ট্রেন, বাসে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু পথে পথে তাকে পোহাতে হয় সীমাহীন ভোগান্তি। গত কয়েক বছরে দেশে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি হলেও যানজট বিড়ম্বনা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। সড়কপথে কোনো শৃঙ্খলা নেই। গত কয়েক বছরে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, অটোভ্যান, ট্যাফে ট্রাক্টর, পিকআপের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব যানও রাস্তায় নেমে পড়ছে। ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, বাড়ছে ভোগান্তি।

নাগরিক দুর্ভোগের সব দোষ সরকারের ঘাড়ে চাপাই। কিন্তু নিজেদের আচরণ মূল্যায়ন করে দেখি না। আমরা কি আমাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করি? দেশের পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা যেভাবে আমাদের পকেট কাটে, তার দায় কার ওপর চাপাব? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উৎসব-পার্বণে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয় ভাড়ায়। আর আমাদের দেশের পরিবহন মালিকদের জন্য ‘উৎসব’ হয়ে ওঠে বাড়তি টাকা কামানোর একটা মওকা। ঈদে বাড়তি ভাড়া আদায় করা পরিবহন মালিকদের জন্য অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ঈদের সময় অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়িগুলো, এমনকি নছিমন-করিমনও মহাসড়কে নামানো হয়। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত অসংখ্য গাড়ির ভিড়ে মহাসড়ক স্থবির হয়ে পড়ে। তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয় দশ-বারো ঘণ্টায়! গণপরিবহন তো বটেই, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরাও শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রতিযোগিতায় নামেন, যা দুর্ভোগ বাড়াতে সাহায্য করে। সিগন্যাল ভাঙা, ভুল দিক দিয়ে গাড়ি চালানো, লেন ভাঙা, জেব্রা ক্রসিংয়ে যানবাহন পার্কিংসহ নানা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে যাত্রাপথে সীমাহীন দুর্ভোগ নেমে আসে।

চালকরাও নিয়মনীতি মানতে চান না। তারা অনেক ক্ষেত্রেই গতির নেশায় মত্ত হন। ফলে সড়ক-মহাসড়কগুলো পরিণত হয় মরণফাঁদে। চালকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত না থাকায় ঈদযাত্রায় সড়কে সমস্যা দেখা দেয়। তাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও কাজ করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার পর যখনই তারা খালি রাস্তা পায় তখন হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। গতি বাড়ানোর চেষ্টা করে। তারা ট্রাফিক আইনও মানতে চায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। আর দুর্ঘটনা মানে শুধু জানমালের ক্ষতি নয়, সড়কে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরি। চালকের অজ্ঞতা, আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন এবং পুলিশের অসহায়ত্বএসব ছাড়িয়ে সড়কে যে বিশৃঙ্খলা দেখা যায় তার জন্য বহুলাংশে দায়ী পথচারী। ফুটওভারব্রিজ রেখে ডিভাইডারের ওপর কাঁটাতারের বেড়া ফাঁক করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়া ঢাকার অতিপরিচিত দৃশ্য। শ্রম লাঘবের জন্য অন্তত দুটো সেতুতে লাগানো চলন্ত সিঁড়ির সুবিধা দিয়েও পথচারীদের সেতুমুখী করা যায়নি। পুলিশ কিছুদিন চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছে। আসলে আমরা ‘নাগরিক’ হিসেবে আধুনিক সুবিধাগুলো ভোগ করার যোগ্যতা রাখি না। বিভিন্নস্থানে ৮ লেনবিশিষ্ট সড়ক তৈরি করা হয়েছে। তার সুফল আমরা পাইনি। আমাদের ষোলো লেনের রাস্তা তৈরি হলেও, আমরা চার লেনই মাত্র ব্যবহার করতে পারব। আবার লেন মেনে গাড়ি চালানোর জ্ঞান চালকদের নেই। বেআইনি লেন পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের সমাজের আরেকটি বাস্তবতা প্রতিফলিত হয় যে, আইনভঙ্গকারীরাই আইন মানা মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে ট্রাফিক পুলিশ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথরোধ না করলে সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলার পরও গাড়ি না দাঁড় করানো তো আমাদের মজ্জাগত অসুস্থ মানসিকতা! রাস্তার মোড়ের ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর চরম বেআইনি ব্যবস্থাটাও রয়েছে।

সড়কপথে চলাচলের ভোগান্তির জন্য দেশের পরিবহন সেক্টর যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের ভূমিকাকেও খাটো করে দেখা যাবে না। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ, যারা নিয়মিত গণপরিবহনের যাত্রী, তাদের যাতায়াতের জন্য সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের পরিবহনব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু, যে পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে সাধারণ, মধ্যবিত্ত, এমনকি ধনী শ্রেণির নাগরিকরাও প্রয়োজনে যাতায়াত করে থাকে, ওই পরিবহনব্যবস্থায় মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একে তো গণপরিবহনের যাত্রীরা তার নির্ধারিত আসনে ন্যূনতম স্বস্তিকর পরিবেশে যাতায়াতে অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে; তার ওপর পরিবহনগুলোতে বিন্যাস করা আসন ব্যবস্থাগুলো যারপরনাই অস্বস্তিকর। যাত্রীকে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আসনে স্থান করে নিতে হয়। সিট কভারগুলোর অবস্থা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে নতুনদার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা করেও নিতান্ত বাধ্য হয়ে ব্যবহার করা র‌্যাপারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তেল চিটচিটে সিট কভারগুলোর অবস্থা এমনই, যেখানে নিতান্ত বাধ্য না হয়ে কেউ নোংরা ওই আসন ব্যবহারের কথা ভাবতেও পারে না। দেশের প্রায় ৬০ ভাগ পরিবহনের বাস্তবচিত্র এমনই। অনেক সময় অস্বস্তিকর এ পথযাত্রায় প্রশিক্ষণহীন পরিবহনকর্মীর সঙ্গে অনেক ভদ্রলোক যাত্রীকেও অপ্রাসঙ্গিক তর্কে জড়িয়ে মেজাজ হারাতে দেখা যায়।

গণপরিবহনগুলোর ভেতরে যেখানে-সেখানে লোহার ধারালো বাড়তি অংশের কারণে মানুষের পরিধেয় বস্ত্র ছিঁড়ছে অহরহ। হাতল, আসনের বিভিন্ন অংশে, পেরেকের মতো ধারালো লোহার অংশ লেগে রক্তাক্ত হচ্ছে মানুষ। এতসব যন্ত্রণার পরও না আছে অভিযোগের স্থান, না আছে সমাধানের উপায়। বাসস্ট্যান্ডে অকারণেই পেছনের পরিবহনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে আগে আসা গাড়িটি। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের যাত্রীদের প্রতি কোনো দায় নেই, দায়িত্ব নেই, কোনো সহানুভূতিও নেই। এটা কি কোনো সভ্য সমাজে পরিবহনব্যবস্থা হতে পারে? দেশের প্রতিটি নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হলে সমাজ জীবনের শৃঙ্খলা অনেক অটুট ও সুন্দর হয়। প্রায়ই দেখা যায়, অনেকেই রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে রাখে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ফুটপাতগুলো দখল করে রাখে। এতে মূল রাস্তায় চাপ বেশি পড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটের আরেকটি বড় কারণ হলো, যত্রতত্র বাস স্টপেজ। ঈদের ব্যস্ত সড়কে গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে অন্য গাড়ির চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ফলে যানজট তৈরি হয়। সবার মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থাকলে কখনো এমনটা হতো না।

অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা যানজট অনেকাংশে কমিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে। বন্ধ হতে পারে অযথা ওভারটেকিং। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার ৯৮ দশমিক ৩ ভাগ গণপরিবহন এবং ৬৮ ভাগ প্রাইভেটকার ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে। অথচ একে অন্যের প্রতি সহনশীল ও কল্যাণকামী হলে এবং অন্যকে অগ্রাধিকার দিলে সবার জন্যই পথচলা সহজ হয়। আমরা কি তা করতে প্রস্তুত? নাকি সরকারের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে আমরা এবারও ঈদযাত্রায় স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে উঠব?

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত