ফিলিস্তিনিদের প্রতি এ কী ‘নৃশংস’ যুক্তরাজ্য

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫৫ এএম

যুক্তরাজ্যে শরণার্থী হতে আসা ফিলিস্তিনিদের প্রতি যুক্তরাজ্যের বিরূপ আচরণের অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাজ্যের সাবেক এমপি রিচার্ড বার্ডেনের কলাম অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

একই সময়ে দুটি যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ব। একটি ইউরোপের অভ্যন্তরে রাশিয়া-ইউক্রেন বলে পরিচিত। অপরটিকে যুদ্ধ নামে ডাকা হলেও আসলে একতরফা হামলা। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম হামলায় এ পর্যন্ত ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের বিরামহীন হামলায় বাস্তুচ্যুত হয়েছে গাজাবাসী। তারা কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছে মিসরে। সেখান থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করছে। কিন্তু রাশিয়ার হামলায় উদ্বাস্তু হয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়া ইউক্রেনীয়দের জন্য যত সহজ ছিল, ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিস্থিতি তত কঠিন।

রাশিয়ার হামলার পর  ইউক্রেনের নাগরিকরা ইউরোপে আশ্রয় নিতে থাকে। তখন ইউরোপের অন্যান্য দেশ তাদের আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইনফো মাইগ্রেন্টস জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৮০ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। তাদের তথ্যে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৮০ লাখ শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আর ৫০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

আর বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, গাজায় অন্তত ১৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যাদের বেশিরভাগ গাজা এলাকায় অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলা করতে করতে ইসরায়েল গাজাবাসীকে মিসরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের খুব সামান্য অংশ আশ্রয় নিতে চাইছে যুক্তরাজ্যে। তবে সেখানে তারা নানা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সাবেক এমপি রিচার্ড বার্ডেন মিডল ইস্ট আইতে লিখেছেন, গাজা থেকে আসা শরণার্থীরা ইউকে সরকারের কাছ থেকে বাধা এবং চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে। আমার পরিচিত একটি পরিবার দুই ধরনের অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হয়।

দুই নীতি

তিনি লেখেন, যা-ই হোক, এ বিষয়ে কথা বলার আগে একটি জিনিস পরিষ্কার করা যাক। গাজাবাসীর দুর্ভোগের অবসানের উপায় হলো অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সহায়তার  প্রবেশ। ফিলিস্তিনিরা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যাবে এমনটা কখনো আশা করা যায় না। যদিও ইসরায়েলের বর্তমান সরকারে আধিপত্য করা চরমপন্থিরা গাজাবাসীকে যতটা সম্ভব সীমান্ত দিয়ে মিসরে ঠেলে দিতে চায়। গাজায় বসবাসকারী বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি ইতিমধ্যেই উদ্বাস্তু। যেসব পরিবার ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার সময় তাদের বাড়িঘর থেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে যায়। ফিলিস্তিনিরা একে ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় বলে। গাজার (বর্তমান) গণহত্যা ইতিমধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব যেন সেই ভয়াবহতাকে নাকবা ২.০-তে পরিণত হতে না দেয়। আবার কেউ এটাও চায় না যে, ইউক্রেনের জনগণ রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে দেশ ত্যাগ করুক। কিন্তু ইউক্রেনের রক্তপাত থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলোকে আশ্রয় দিতে যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ দরজা খোলা রেখেছে। এ ধরনের মানবিক সহায়তা অস্বাভাবিক নয়, যা ১৯৫১ সালের আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনের চেতনাকে প্রতিফলিত করে; যেখানে যুক্তরাজ্য স্বাক্ষরকারী দেশ।

তবে রিচার্ড বার্ডেন জানাচ্ছে, অথচ ইউক্রেনীয় শরণার্থী এবং গাজা থেকে পালিয়ে আসাদের সঙ্গে যুক্তরাজ্য যেভাবে আচরণ করে তার মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এটি ‘নৃশংস’। তিনি জানাচ্ছেন, গাজা থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার জন্য দুটি জিনিস প্রদর্শন করতে হয়। এর একটি হলো, ওই শরণার্থীর ছয় মাসের বেশি সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। এর সঙ্গে দেখাতে হবে যে, তিনি বিবাহিত, অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রী রয়েছে অথবা ১৭ বছর বা তার কম বয়সী শিশু রয়েছে যে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছে। বার্ডেন বলছেন, যদি ওই ফিলিস্তিনি শরণার্থীর কোনো ভাই বা বোন থাকে, যিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন অথবা সে যদি দুর্বল বয়স্ক ব্যক্তি হন এবং তার প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকে তাহলে যুক্তরাজ্য তাকে প্রবেশ করতে দেবে না। ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসাদের জন্য এ ধরনের কোনো শর্ত আরোপ করা হয় না। বরং ‘হোমস ফর ইউক্রেন’ স্কিমের অধীনে যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের নিজ বাড়িতে স্বাগত জানাচ্ছে। তাদের সঙ্গে ওই শরণার্থীর পারিবারিক সংযোগ থাকুক বা না থাকুক।

শুধু মুখে মুখে

যদিও স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার পাকিস্তান বংশোদ্ভূত হামজা ইউসুফ আল আহলি ব্যাপটিস্ট হাসপাতালে হামলায় ৫০০ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, মানুষ যদি হাসপাতালে নিরাপদ না থাকে তা হলে যাবে কোথায়? দ্ব্যর্থহীনভাবে জোরালো ভাষায় এই হামলার নিন্দা করতে হবে। অতীতে স্কটল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য শরণার্থীদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে। সিরিয়া, ইউক্রেন ও আরও অন্যান্য দেশ থেকে যারা এসেছেন আমরা তাদের স্বাগত জানিয়েছি।... আমরা অবশ্যই আবারও তা করব। গাজার ১০ লাখের বেশি মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে। আমি বিশ্বব্যাপী গাজাবাসীদের জন্য শরণার্থী কর্মসূচি শুরু করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধ করছি।

তবে বার্ডেন লিখেছেন, এসব নিয়ে পার্লামেন্টে প্রশ্ন করা হলে, যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা সংসদ অধিবেশনে প্রায়ই বলেন, তারা গাজা থেকে পালিয়ে আসা ফিলিস্তিনিদের বিষয়গুলো আলাদাভাবে দেখবেন। এখন পর্যন্ত তাদের মুখের কথা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে খুব কম। কারণ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারকে বাধ্য করার মতো কিছু নেই। বিভিন্ন দলের অনেক এমপি এবং হাউজ অব লর্ডসের সদস্যরা ব্যারনেস বেনেটের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন, যাতে ইউক্রেনীয়দের জন্য চলমান নীতির আদলে ফিলিস্তিনিদের ভিসা প্রকল্প চালুর আহ্বান জানানো হয়। হাউজ অব কমন্সেও একই ধরনের দুটি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। এ সমস্ত প্রচেষ্টা আমাদের সমর্থন পাওয়ার যোগ্য, তবে এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীদের শুধু কথায় কিছু হবে না।

চাঁদাবাজি

বার্ডেন এরপর জানাচ্ছেন, গাজা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের রাফাহ এবং মিসরের সিনাই মরুভূমির মধ্যবর্তী অংশ পার হতে হয়। যদিও সীমান্তটি সরাসরি মিসর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে কাকে অনুমতি দেওয়া হবে এবং কাকে হবে না তা নিয়ে ইসরায়েলের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর গাজা থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করা ফিলিস্তিনিদের প্রথম একটি তালিকায় নাম তুলতে হয়। সেই তালিকাটি আবার জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট জেনারেল, মিসর এবং ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ মিলে তৈরি করে। যদি ওই ফিলিস্তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক না হন বা দেশটির সরকারের ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পূরণ করতে না পারেন, তাহলে ওই তালিকায় তার নাম আসবে না। এমনকি যুক্তরাজ্য যদি তালিকায় নাম রাখতে সম্মত হয়ও, মিসরীয় এবং ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাফাহ পার হওয়ার অনুমতি নিশ্চিত করা যায় না।

তিনি আরও জানাচ্ছেন, যুক্তরাজ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ার পর, একজন ফিলিস্তিনি অন্য কোনো দেশে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে রাফাহ ক্রসিং পার হওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের টাকা গুনতে হয়। যেমন বার্ডেনের পরিচিত এক ফিলিস্তিনি পরিবারের মা এবং তার সন্তানদের মিসরে পাড়ি দিতে প্রায় নয় হাজার পাউন্ড গুনতে হয়েছিল।

বার্ডেন লিখেছেন, আমি এমন কয়েকটি পরিবারকে জানি যাদের আরও বেশি পরিমাণে নগদ অর্থ দিতে হয়েছে। আমার বন্ধুরা যথেষ্ট ভাগ্যবান যে, এ ধরনের অর্থের ব্যবস্থা তাদের ছিল। যে অঙ্ক বেশিরভাগ ফিলিস্তিনিদের নাগালের বাইরে। গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ আক্রমণে অনেকে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যান এবং গত ছয় মাসের যুদ্ধে কোনো কার্যকর অর্থনীতি ছিল না (গাজায়)। রাফাহ ক্রসিংয়ে ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে যে অর্থ দাবি করা হয় তা কতটা মিসর সরকারের আর কতটা দুর্নীতির মাধ্যমে নেওয়া হয়, সে হিসাব কেউ জানে না। যেভাবেই হোক, এমন লোকদের সঙ্গে এ চাঁদাবাজি চলে যারা ইতিমধ্যে গাজায় অকথ্য ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছে।

বার্ডেন দাবি করেছেন, অন্তত যাদের আত্মীয় আছে যুক্তরাজ্যে এমন ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য সরকারি যে নিষ্ঠুর প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে তা তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া অবশ্যই রাফাহ সীমান্তে টাকা নেওয়া বন্ধের জন্য মিসরের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, তা হোক সরকারি ফি বা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের চাঁদা। যদিও রাফাহ সীমান্তে চাঁদাবাজির অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে মিসর। চলতি বছরের শুরুর মাসে এক বিবৃতিতে তারা এ ধরনের কোনো কার্যকলাপের বিষয়ে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করে। এর আগে গার্ডিয়ান প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসর সরকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রাফাহ ক্রসিং পার হওয়ার সময় ফিলিস্তিনিদের থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে।

অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের খবর, ইউক্রেনের মিত্রদেশগুলোর মধ্যে জার্মানি ও পোল্যান্ড বেশিরভাগ শরণার্থীকে জায়গা দিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, জার্মানিতে ইউক্রেনের ১০ লাখ ৭০ হাজার এবং পোল্যান্ডে ৯ লাখ ৯৫ হাজার শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন। এর পরের অবস্থানে আছে চেক প্রজাতন্ত্র। দেশটি আশ্রয় দিয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার শরণার্থীকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সে সবচেয়ে কম ইউক্রেনীয় শরণার্থী আশ্রয় পেয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত