সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসানো কুমিরের ভ্রমণ কাহিনী

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪৪ পিএম

গ্রামের এক পুকুরে কুমির এসেছে। এমন খবরে শুক্রবার সকাল থেকেই ছোট্ট সেই পুকুর ঘিরে ভিড় পড়ে যায় উৎসুক মানুষের। বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার একটি গ্রামের পুকুরে কুমির আসা সবার কাছেই বিষ্ময়ের। বাংলাবাজার নামের ওই এলাকার প্রবীণরাও জানালেন, এই গ্রামের পাশে মধুমতি নদীতে কুমির দেখা গেছে বা কুমির এসেছে এমনটা তারা কখনোই শোনেনওনি।

বন বিভাগ জানাচ্ছে, সুন্দরবন থেকে শত কিলোমিটার দূরের জনপদে চলে আসা কুমিরটি আসলে এসেছে ওই বন থেকেই। একমাস আগে গবেষণার জন্য সুন্দরবনের নদী-খালে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে চারটি কুমির ছাড়া হয়েছিল। যার একটি এটি।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাতে পাশের মধুমতি নদী থেকে রাস্তায় উঠে পড়ে কুমিরটি। পাশে একটি খালও ছিল। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় স্থানীয় কয়েকজন কুমিরটিকে তাড়া দিলে সেটি দ্রুতই পাশের ওই পুকুরে গিয়ে নামে। এরপর থেকেই উৎসুক মানুষ পুকুরটি ঘিরে ভিড় করতে শুরু করে। ফলে কুমিরটি আর বের হতে পারেনি।

খবর পেয়ে শনিবার সকালেই স্থানীয় প্রশাসনসহ বন বিভাগের কর্মীরা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। সন্ধ্যার দিকে পুকুর থেকে পানি সেচে জালের সাহায্যে কুমিরটিকে ধরা হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মীরা কুমিরটিকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে জানিয়ে চিতলমারীর কলাতলা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড সদস্য মো. ফারুক হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ঈদের রাতে (বৃহস্পতিবার) স্থানীয় কয়েক যুবক মোটরসাইকেল নিয়ে ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। হেডলাইটের আলোতে তারা প্রথম কুমিরটি দেখতে পায়। এর মাথায় কিছু একটা লাগানো ছিল। তারা তখন ওই কুমিরের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। পরে এই খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ স্থানীয়দের মাঝে ওই খবর ছড়ায়। এরপর শুক্রবার ভোর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে তারা কুমির দেখতে পুকুর পাড়ে ভিড় করছে।

বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের কুমিরের জীবনাচরণ ও গতিবিধি জানতে সম্প্রতি চারটি কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসানো হয়। মাথার উপর বসানো এই স্যাটেলাইট ট্যাগ যুক্ত কুমির ছাড়া হয়েছিল সুন্দরবনে নদী-খালে। যার একটি বন থেকে বেরিয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন নদী খাল ঘুরে গেল প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কুমিরটি অবস্থান করছিল গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাটের সীমান্তবর্তী মধুমতি নদীতে। শনিবার সন্ধ্যায় এটি উদ্ধার করা হয়েছে।

‘কুমিরটি সুস্থ আছে, তাকে আবারও সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হবে’ জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন সংরক্ষক (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল। 

তিনি বলেন, গত ১৩ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ সুন্দরবনের করমজল কেন্দ্রের দুটি, যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ির একটি পার্ক থেকে উদ্ধার একটি এবং সুন্দরবনের প্রকৃতি থেকে ধরা একটি; মোট ৪টি কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে সুন্দরবনে ছাড়া হয়। এর মধ্যে যে কুমিরটি আজ ধরা পড়েছে, এটি করমজল কেন্দ্রে কুমির দম্পত্তি রমিও-জুলিয়েটের বাচ্চা। এটির বয়স হবে ৮-১০ বছর।

সুন্দরবনের কুমিরের উপর গবেষণা করতেই শরীরে স্যাটেলাইট ট্যাগ বসানো হয়। সুন্দরবনের নদীতে ছাড়া চারটি কুমিরের মধ্যে করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের পুরুষ কুমির জুলিয়েটও ছিল। তবে জুলিয়েটসহ অন্য তিনটি কুমির এখনও সুন্দরবনেই আছে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে বাইক আরোহীরা পিচের রাস্তার উপর হাটতে দেখে কুমিরটিকে। তারা কাছে গেলে কুমিরটি দৌড় দেয়। পিছু নিলে কুমিরটি বাংলাবাজার এলাকায় রাস্তার পাশে একটি পুকুরে নেমে পড়ে। পুকুরটিতে খুব বেশি পানিও ছিল না। সকাল থেকে মাঝে মধ্যেই কুমিরটি পানির নিচ থেকে একটু মাথা তুলে আবার ডুব দিচ্ছিল। যে পুকুর থেকে কুমিরটি উদ্ধার করা হয়েছে তার উত্তর পাশেই মধুমতি নদী। 

কুমির নিয়ে গবেষণার জন্য এর শরীরে স্যাটেলাইট ট্যাগ বসিয়ে নদীতে অবমুক্ত করার কাজটি যৌথভাবে করছে বন বিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)। তাদের সহযোগিতা করছে, জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকনোমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (জিআইজেড)।

বন থেকে কুমিরটি লোকালয়ের দিয়ে চলে যাওয়ার বিষয়ে আইইউসিএনের ম্যানেজার সারোয়ার আলম দীপু সাংবাদিকদের বলেন, সুন্দরবনের নদী থেকে কুমিরটি এমন দূরে যেতেই পারে। নদীতে তো আর বেড়া নেই। কুমির বিচরণ করবে, ছাড়ার পর থেকেই এটি ঘুরছিল। বনের নদী থেকে বেরিয়ে লোকালয়ের নদীতে চলে যায়। বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা হয়ে এটি পার্শ্ববর্তী পিরোজপুর জেলার নদ নদীতে বিচরণ করতে থাকে। পরে আবারও এটি বনের দিকে ফিরতে শুরু করে। কিন্তু এর মাঝে এটি আবার গোপালগঞ্জের দিকে চলে যায়।

সারোয়ার আলম আরও বলেন, সুন্দরবনের কুমির কোথায়, কীভাবে বিচরণ করে তা নিয়ে বিস্তারিত কোনো গবেষণা আগে কখনো হয়নি। সে জন্যই স্যাটেলাইট ট্যাগ বসিয়ে এই গবেষণাটি করা হচ্ছে। সারাবিশ্বেই পাখি, কচ্ছপ, নেকড়েসহ বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে তাদের আচরণ নিয়ে গবেষণার নজীর রয়েছে। তবে কুমির নিয়ে এমন গবেষণা দেশে এই প্রথম হচ্ছে।

বন বিভাগ ও গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইল্ড লাইফ কম্পিউটার নামে একটি প্রতিষ্ঠান কুমিরের শরীরে লাগানো এই স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার কিট তৈরি করেছে। এটি পানির নিচে গেলেও কোন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কুমিরের শরীরে বসানো এ ট্রান্সমিটার কিটটির মেয়াদ এক বছর। শরীরে বসানোর পর তা সংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। এর পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপডেত তথ্য ম্যাপের মাধ্যমে দিতে থাকে। ব্যাটারি চালিত এই যন্ত্রে একটি ক্ষুদ্র অ্যান্টেনা আছে। যার মাধ্যমে এটি স্যাটেলাইটের সাথে যুক্ত থাকে। 

তারা বলছেন, কুমিরের মাথার ওপরের অংশে আঁশের মতো একটি স্কেল থাকে। সেখানে ছোট একটি ছিদ্র করে ওই স্যাটেলাইট ট্যাগটি বসানো হয়। এই চিপটি খুব হালকা। ওজন দুই গ্রামেরও কম। এই ধরনের স্যাটেলাইট চিপ বসানোতে কুমিরের ক্ষতি হয় না।

আইইউসিএনের সারোয়ার আলম দীপু বলেন, কুমিরটি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার তুষখালির নদী পর্যন্ত যাবার পর আবার ফিরে আসছিল। একদম সুন্দরবনের কাছাকাছি চলে আসছিল। তারপর আবার উপরের দিকে আসছে। ইতপূর্বে বিভিন্ন সময়ে সুন্দরবনে কুমির ছাড়া হয়েছে। বনের করমজল কেন্দ্রে ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চাগুলো একটু বড় হলে মাঝে মাঝেই বন বিভাগ এগুলোকে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করে। এর আগেও বনে ছাড়ার পর লোকালয় থেকে কুমির উদ্ধার হয়েছে। বনে ছাড়ার পর এবারও স্যাটেলাইট যুক্ত কুমির বন থেকে উপরের দিয়ে উঠে আসার ঘটনা দেখা গেল। এটি গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগ জানায়, যে চারটি কুমির অবমুক্ত করা হয় এর মধ্যে ৩টিই বনে আছে। চিতলমারী চলে যাওয়া কুমিরটি রমিও জুলিয়েটের বাচ্চা। করমজলের এই কুমিরটি সুন্দরবনের জোংড়া খালের মুখে ছাড়া হয়েছিল। সুন্দরবনের পশুর নদ ধরে কুমিরটি বন থেকে বর হয়। এরপর মোংলা নদী ধরে রামপাল হয়ে পিরোজপুর চলে যায়। সেখানে তুশখালী বলেশ্বর, কঁচা নদী হয়ে সন্ধ্যা ও কালিগঞ্জা নদী পার হয়ে কুমিরটি মধুমতি নদীতে যায়। গেল প্রায় ৭ দিন ধরে গোপালগঞ্জের টু্ঙ্গিপাড়ার কাছে মধুমতি নদীতেই বিচরণ করছিল কুমিরটি।

আইইউসিএন ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধারের পর কুমিরটিকে এবার সুন্দরবনের গহীনে ছাড়া হবে।

ডিএফও নির্মল কুমার পাল বলেন, চিতলামারী থেকে উদ্ধারের পর কুমিরটি খুলনার বন্যপ্রাণি ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে নেওয়া হয়েছে। রবিবার এটিকে সুন্দরবনের ঝাপসি বা করাপুটিয়া এলাকার অবমুক্ত করা হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত