সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ট্রেনে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে যৌন নিপীড়করা

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১১ পিএম

সোমবার (১৫ এপ্রিল) সিলেট থেকে ছেড়ে আসা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে যৌন হয়রানির শিকার হন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীম (ছদ্মনাম)। মীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকালের ট্রেন ধরতে গিয়ে ঘুম হয়নি। তাই ট্রেনে ওঠার এক পর্যায়ে আমি সিটে ঘুমিয়ে পড়ি। শুরুতে আমার পাশে একজন মহিলা ছিলেন। কিন্তু তিনি স্বামীর সঙ্গে একসাথে বসতে গিয়ে সিট পরিবর্তন করেন। এরপর আমার পাশের সিটে একটা ছেলে বসে। আমি ঘুমিয়ে পড়লে ছেলেটি আমার গায়ে হাত দেয়। তার অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে আমার ঘুম ভাঙে এবং আমি বিষয়টি টিটিইকে জানাই (ট্রাভেলিং টিকিট এগজামিনার)।

এরপর টিটিইরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে অবহিত করেন। পুলিশ সদস্যরা অভিযুক্ত মো. শাকিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শাকিলের ফোন খুঁজে গোপনে ধারণ করা মীমের একটা ভিডিওও পাওয়া যায়। শাকিল একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী। তার বাড়ি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে।

পুলিশ সদস্যরা মীমকে লিখিত অভিযোগ করতে বলেন। এরপর মীম তার বাবা ও দুই বোনের সঙ্গে পরামর্শ করে মামলা বা লিখিত অভিযোগ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বললে তারা বিষয়টি মীমাংসা করে দিতে বলেন।

লিখিত অভিযোগ না করার কারণ জানতে চাইলে মীম বলেন, আমার আপু সেনাবাহিনীতে আছেন। আমি নিপীড়কের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়েছি। এ বিষয়ে আপু পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেবেন।

নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্য আলমগীর বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে আসি। মেয়েটির পরিবার মামলা বা লিখিত অভিযোগ করতে না চাওয়ায় তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেই। অভিযুক্ত শাকিল মেয়েটির পায়ে ধরে ক্ষমা চায়।

এর আগে চলতি বছর ভুল ট্রেনে উঠে একই ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট আক্কাস গাজীর ধর্ষণের শিকার হয় এক কিশোরী। এখানেই শেষ নয় রেলপথে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে নিপীড়করা। একাধিক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিকিট ছাড়া ভ্রমণ করার সময় তারা সবচেয়ে বেশী নিপীড়নের শিকার হন। এ ক্ষেত্রে ট্রেনের টিটিইরা এক কামড়া থেকে আরেক কামড়া নিয়ে যাওয়ার সময় সুযোগ বুঝে শরীর স্পর্শ করেন। আবার সিট না পেয়ে স্ট্যান্ডিং টিকেটে যাওয়ার সময় যাত্রী, টিটিই এমনকি বিভিন্ন পণ্যের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা বা হকাররাও সুযোগ বুঝে হয়রানি করেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ২০১৯ সালে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৫২টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৬টি ধর্ষণ, ১২টি দলবদ্ধ ধর্ষণ, ৯টি ধর্ষণচেষ্টা ও ১৫টি যৌন হয়রানি। ২০২১ সালে গণপরিবহনে ৬৮টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৩টি ধর্ষণ, ১১টি দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ৩৪টি যৌন হয়রানি। যদিও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশী।

ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলপথে নিয়মিত চলাচল করেন শারমিন আক্তার। ট্রেনে চলাচল করতে গিয়ে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন তিনি। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি ট্রেনের অপেক্ষা করছিলাম। ২টা ছেলে তখন থেকে আমাকে অনুসরণ করে। এরপর আমি ট্রেনে উঠে টিকিট না থাকায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলাম। ছেলে ২টিও আমার বগিতে উঠে এবং বারবার চলাচল করার অজুহাতে আমার শরীর স্পর্শ করে। সেদিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। এরপর এক যাত্রী বিষয়টি বুঝতে পেরে তার সিটে আমাকে বসতে দেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এ বিষয়ে ট্রেনে অভিযোগ না করার কারণ জানতে চাইলে এই ভুক্তভোগী বলেন, সত্যি বলতে ট্রেনে কার কাছে অভিযোগ করব সে বিষয়ে আমার কোনো আইডিয়া নেই। তাছাড়া অভিযোগ করলেও নানা বিড়ম্বনায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত