রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইসরায়েল ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কি হেরে যাচ্ছে?

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৮ পিএম

গত ৭৫ বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চালালেও ইসরায়েলকে অবিরাম সমর্থন দিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো। কিন্তু এবারের গণহত্যায় খোদ মার্কিন মুলুকেই বাড়ছে ইসরায়েল বিরোধী অনুভূতি। সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেক প্রতিষ্ঠান গুগুলের ২৮ কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। 

জানা গেছে, ‘প্রজেক্ট নিম্বাস’ নামে গুগল ও অ্যামাজনের সঙ্গে ইসরায়েলের ১২০ কোটি ডলারের ওই চুক্তি হয়। চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরকে ক্লাউড পরিষেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইসহ উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করা হবে। এর আগে আমরা দেখতে পাই যুক্তরাষ্ট্রের এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলতে পারেন এই ভয়ে এক ছাত্রীর বক্তৃতা বাতিল করা হয়েছে। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষোভ বাড়ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যথারীতি ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং অস্ত্র বরাদ্দ করছেন। কিন্তু দিনকে দিন মুসলিমসহ অন্যরা মার্কিন শাসকদের ইসরায়েলপ্রীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে। সংবাদমাধ্যমগুলো সবসময়ের মতোই এসব বিক্ষোভ চাপা রাখতে চাইছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রশাসন ‘এন্টিসেমিটিক’ অজুহাতে এইসব বিক্ষোভ আটকে দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিষ্কারভাবেই এগুলো উঠে আসছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে লাখো লোকের ফিলিস্তিনিদের পক্ষের মিছিল।

গাজার একটি বিধ্বস্ত ভবনে এক ফিলিস্তিনি কিশোরী

হামাস হামলা করেছে এই অজুহাতে গত বছরের অক্টোবর মাসে থেকে ইসরায়েল নির্বিচারে গাজায় মানুষ মারছে। ইতিমধ্যে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। ধ্বংস হয়েছে গাজার প্রায় সমস্ত স্থাপনা এমনকি স্কুল ও হাসপাতালগুলোও। এহেন নারকীয় হত্যাকাণ্ডে বিশ্বের সবপ্রান্তে ইসরায়েল এবং এর পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে নিন্দা জানানো হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছে। 

আবার এই কারণেই মার্কিন প্রশাসন আফ্রিকার দেশটির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। নানাভাবে দেশটিকে চাপে রাখতে চাইছে এই মামলা করার অপরাধে। কিন্তু এই দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ দিয়েই অন্য দেশগুলো বুঝতে পারছে যে, মার্কিনীদের বলয় থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। বিশ্ব জনমত থাকায় এই অকল্পনীয় ব্যাপারটা সম্ভব করাও যেতে পারে। তদুপরি ইউক্রেনের উদাহরণও ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’ ব্যাপারটা প্রমাণ করেছে।

মার্কিন এবং ন্যাটোর পূর্ণ সমর্থনেও দেশটি রাশিয়ার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র সমস্ত শক্তি দিয়েও রাশিয়াকে রুখতে পারেনি। ফলে স্পষ্টতই বিশ্বের সর্ববৃহৎ শক্তির ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

আবার এর প্রমাণ দেখা গেল সম্প্রতি ইরানের ঘটনায়। ইসরায়েলের আক্রমণ ও উসকানির বিপরীতে ইরানও ইসরায়েলে মিসাইল ছুড়েছে। ইরান যুদ্ধ চায়নি এই ব্যাপারটা অবশ্য স্পষ্ট হয়েছে আগে থেকেই সতর্ক করায় এবং মিসাইলগুলো তেমনভাবে ক্ষতি না করায়। কিন্তু এতে ইরানের মুখরক্ষা হয়েছে। 

সবচেয়ে বড় কথা, অন্যসময় হলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তেড়েফুড়ে যাইত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও সতর্কতা এবং মৌখিক আলাপেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ইতিমধ্যেই অনেকটাই জনপ্রিয়তা হারানো বাইডেন এই বছরের শেষদিকে হওয়া নির্বাচনের আগে যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন বলেই মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু প্রাণপণে চাইছেন কোনোমতে যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে। যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে। কিন্তু নিষ্ঠুর গণহত্যায় তার ইমেজ সারা দুনিয়ায় তো বটেই, নিজ দেশেও ক্ষতবিক্ষত।

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সিরিয়াতে বহুদিন ধরে চলার জের টানতে হচ্ছে ইউরোপকেও। বিপুল পরিমাণ অভিবাসী সে মহাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। এর ফলে সেসব দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিও অস্থিতিশীল হয়ে যাচ্ছে। মার্কিন শক্তি কমলে ইউরোপের বড় শক্তিগুলোও দীর্ঘদিনের বন্ধুকে শর্তহীন সমর্থন না-ও দিতে পারে।

এমনকি ইউরোপের কিছু কিছু দেশ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে মিলে মার্কিন প্রভাবের বাইরে একটি বড় জোট করেও ফেলতে পারে, যারা একতরফা মার্কিন শাসন ও আধিপত্যকে প্রতিরোধ করবে। ব্যাপারটা সূদুরপরাহত এবং মার্কিন প্রভাব অনেকটা কমলেও এই বিপুল শক্তিকে রোখা খুব সহজ হবে না।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে যতই বাণিজ্য যুদ্ধ থাকুক না কেন, দুই দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড ও বাজার দুইই চীনাদের জন্য বিপুল লাভজনক, ফলে কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত রাষ্ট্রটিও সরাসরি লড়াইয়ে নামবে না, অন্তত অদূর ভবিষ্যতে। তবে এ কথা বলাই যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করার ব্যাপারে নৈতিকভাবে পুরোপুরি পরাজিত হয়েছে। এখন রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত হয় কিনা তাই দেখার বিষয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত