আয় অর্ধেক শ্রমজীবী মানুষের

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:৪৪ এএম

রাজধানীর শাহবাগে গাছের নিচের ছায়ায় বসে ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে বারবার শরীরের ঘাম মুছছিলেন ৫৫ বছর বয়সী রিকশাচালক হানিফ মুন্সি। তিনি বলেন, ‘ধানমন্ডি থেকে একটা খ্যাপ নিয়া আসছিলাম। মনে হয় গায়ে কেউ আগুন লাগায়ে দিছে। মুখটা জ্বলতাছে। রিকশার গদির নিচে পানির একটা বোতল ছিল, সেই পানি যে হাতে-মুখে দিমু তারও উপায় নাই, পানিও যেন আগুন হইয়া গেছে।’ তার সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয় গতকাল রবিবার দুপুরে। পাশেই বসেছিলেন আরেক রিকশাচালক রহমান খাঁ। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে মাত্র তিনটা খ্যাপ মারছি। আধা ঘণ্টা হইল গাছের নিচে বইসা রইছি। রাস্তায় অনেক যাত্রী। গরমে কারণে অনেকে হাঁটাপথও রিকশায় যায়। কিন্তু আমাগো কুলাইতেছে না। প্যাডেলে চাপ দেওনের শক্তি নাই। সব শক্তি মনে হয় ঘামের লগে বাইর হইয়া গেছে।’

গত কয়েক দিনের টানা দাবদাহে হানিফ মুন্সি বা রহমান খাঁর মতো একই অবস্থা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব অঞ্চলের মানুষের। গরমের তীব্রতায় ছোট-বড় সবার হাঁসফাঁস অবস্থা। বিশেষ করে জীবিকার তাগিদে যেসব শ্রমজীবী মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন, তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনের অসহনীয় গরমে ওষ্ঠাগত প্রাণ। কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে সীমাহীন দুর্ভোগ নিয়ে চলছে জীবন। কেউবা গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে, আবার কেউবা মুখে, মাথায় পানি ঢেলে একটু স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাপপ্রবাহের পাশাপাশি তীব্র গরমে তাতেও কাজ হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম রাউজানের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন। কাজের জন্য কাতার যাবেন। দেশটির ভিসা পেতে হলে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। তাই রাজধানী ঢাকায় এসেছিলেন। গতকাল দুপুরে তাকে কাঁধে ব্যাগ হাতে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র নিয়ে বাংলা মোটর মোড়ে মেট্রোরেলের গার্ডারের নিচে সড়ক বিভাজকের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। একটু পরপর মাথায় পানি ঢেলে শরীর ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করছিলেন।

কাছে গিয়ে বসে থাকার কারণ জানতে চাইলে শাহাদাত বলেন, ‘কাতার যাওয়ার জন্য মেডিকেল টেস্ট করাতে হবে। তাই সকালে ঢাকায় আসছি। ভোরবেলা লাইনে দাঁড়ালেও সিরিয়াল পাইনি। তারা বলেছে, বিকেল ৪টার মধ্যে হবে। অনেকক্ষণ অফিসের সামনে অপেক্ষা করলে দায়িত্বরত গার্ডরা সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। পরে পাশের যাত্রী ছাউনির নিচে বসি। সেখানেও গরম। বাধ্য হয়ে তাই এখানে বসে আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সকাল থেকে বেশ কয়েকবার ঘামে জামাকাপড় ভিজে গেছে। কয়েক বোতল পানিও খেয়েছি। কিন্তু একটু পরপর গলা শুকিয়ে যায়। মাথাটা ঘুরছে। রাস্তায় আর কতক্ষণ এ গরমে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। এত মানুষ আসে এখানে, তাদের জন্য কর্র্তৃপক্ষ যদি একটু বসার ব্যবস্থা করত তাহলে এ গরম থেকে একটু হলেও রক্ষা পেতাম।’

গরমের কারণে আয় কমেছে বুড়িগঙ্গায় যাত্রী পারাপার করা মাঝিদের। গতকাল সকালে সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায়, অনেকে নৌকা ঘাটে বেঁধে পাড়েই বসে আছেন। বিশেষ করে যাদের বৈঠাচালিত নৌকা তারা পড়েছেন বেশি বিপাকে।

ওয়াইজঘাটের মাঝি মো. আমির (৬০) বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নৌকা চালানো যায়। এরপর আর নৌকা চালাইতে ইচ্ছে করে না। গরম শুরু হওয়ার পর থেকে হাফবেলা নৌকা চালাই। এরপর বাড়ি চলে যাই। যে টাকা আয় হয় তাতে চা-পান খরচ ওঠে। এ টাকায় সংসার চলে না। একটা ছেলে আছে সে প্রতিদিন কিছু দেয়, তাতে কোনোমতে সংসার চলে যাচ্ছে।’

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, সকালে সূর্যের আলো ফুটতেই গরম শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গরমের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অসহ্য গরম থাকে। সন্ধ্যার পর তৈরি হয় অস্বস্তিকর গুমোট পরিবেশ। রাতেও ভ্যাপসা গরম।

কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটের সামনে শরবত খাচ্ছিলেন বাজারটিতে মালামাল বহন করা (মিন্তি) মমিনুল। তিনি বাঁশের টুকরিতে পণ্য মাথায় করে পৌঁছে দেন আশপাশ এলাকায়। মমিন জানান, গরমের কারণে পরিস্থিতি খারাপ। দিনে তিন-চারবারের বেশি মালামাল বহন করতে পারেন না। উপার্জন নেমে এসেছে অর্ধেকেরও কম।

মমিনুল বলেন, ‘একবার মাল নিলে এক ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। শরীর একটু ঠাণ্ডা হলে তখন আবার কাজ করতে পারি। সকাল থেকে দুজনের মাল নিয়ে গেছি। এখন আর ইচ্ছা করতেছে না, কিন্তু উপায় নাই। বাড়িতে কিস্তির টাকা আছে, সংসারের খরচ আছে, নিজের খরচ আছে। কষ্ট হইলেও কাজ তো করতে হইব।’

একই অবস্থা এ বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদেরও। তীব্র রোদ মাথায় নিয়ে অনেকেই পণ্য সাজিয়ে বসেছিলেন। বেলা আড়াইটার দিকে কথা হয় কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা নূরনবীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যত গরমই হোক দোকান বন্ধ করা যাবে না। দোকান করলেও ভাড়া দিতে হবে, না করলেও ভাড়া দিতে হবে। কিন্তু গরমের কারণে বাজারে ক্রেতা কম। সবজিও কম বিক্রি হচ্ছে।’

গরমে বেহাল অবস্থা রাজধানীর সড়কে চলা বাসশ্রমিকদেরও। বিরূপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিদিন কাজে নামতে হচ্ছে তাদের। মিরপুর রুটে চলা দিশারী পরিবহনের চালকের সহকারী সাকিল বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরও তো গরম লাগে। কিন্তু কী আর করার থাকে। বাসের মালিককে মাঝেমধ্যেই বলা হয় ফ্যানের অবস্থা খারাপ। পরিবর্তন করে দেন। কিন্তু তারা এগুলো আমলে নেয় না। বাড়তি টাকা খরচ করে মালিকরা ফ্যান লাগায় না। তাই যাত্রীদের পাশাপাশি আমরা যারা পরিবহন শ্রমিক আছি, তাদেরও এ গরমে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

এদিকে গরমের কারণে মৌসুমি রোগের প্রকোপও বেড়েছে। গত কয়েক দিনে হিট স্ট্রোকে মৃত্যুর খবর এসেছে গণমাধ্যমে। এ ছাড়া অতি গরমে বমি, ডায়রিয়া ও জ্বরে ভুগছেন আনেকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞা ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাপপ্রবাহর কারণ দৈনন্দিন যে জীবনযাপন তাতে বেশ প্রভাব পড়বে। মানুষ ক্লান্ত বেশি থাকবে। শরীর থেকে ঘাম বেরিয়ে পানিশূন্যতা তৈরি হবে, স্ট্রোক হবে, এটা একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে যারা বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশু তাদের জন্য স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হচ্ছে। বৃদ্ধদের মধ্যে হিট স্ট্রোকের প্রবণতা এমনিতে বেশি থাকে, সেটা আরও বেড়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ যখন বাইরে বের হবে তখন ঘামবে। এ সময় যদি পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া হয় তবে পানিশূন্যতা তৈরি হবে। সব মিলিয়ে মানুষের পুরো জীবনযাত্রা প্রভাবিত হবে। শুধু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিই না, তীব্র গরম শ্রম অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত