বারবার সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কার্যকর করতে না পারায় এবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ যে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। এরই মধ্যে মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বজনদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী করেছেন। কোনো কোনো স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও যেন না হয় তাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
চার ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে ১৫২ উপজেলায় ভোট হবে ৮ মে। পরের ধাপের মনোনয়নপত্রও জমা নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র যশোরের শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে চরম হতাশা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় এমপি একজন ‘চিহ্নিত দুষ্কৃতকারীকে’ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী করায় মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা।
তারা বলছেন, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে মন্ত্রী-এমপিদের উপজেলা পরিষদে প্রার্থী বাছাই ও তাদের পক্ষে অবস্থান নিতে নিষেধ করেছেন, সেখানে শার্শা আসনের এমপি কীভাবে জনবিচ্ছিন্ন, বিভিন্ন মামলার আসামিকে প্রার্থী ঘোষণা করেন? উপজেলা আওয়ামী লীগ কোনো সভাও করেনি এ বিষয়ে। তার আগেই এমপি শেখ আফিল উদ্দীন তার নিজের মর্জিমতো মাদক ও অস্ত্র মামলার চিহ্নিত আসামি, সাবেক ছাত্রদল নেতা সোহরাব হোসেনকে মনোনীত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানতে চাইলে উপজেলা যুবলীগের নেতা ওয়াহিদুজ্জামান ওয়াহেদ বলেন, ‘সোহরাবকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী করা আমাদের দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি ব্যক্তি এমপির নিজের পছন্দ।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘টাকা-পয়সার বিনিময়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাকে (সোহরাব) প্রার্থী করা আমাদের দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি এমপি তার নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতেই করছেন।’
সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে ১৯৮১ সালে নাভারণে দলীয় সম্মেলনে মতিয়া চৌধুরীর গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, তোরণ পুড়িয়ে দেওয়া, মঞ্চ ভাঙচুর, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, সোনা চোরাচালানসহ নানা অপকর্মের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে তিনি র্যাবের হাতে অস্ত্র-গুলিসহ আটক হয়েছিলেন।
এসব বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মঞ্জু বলেন, ‘সোহরাবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনি জেলখাটা আসামি। এখানে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। দলীয় কোনো সিদ্ধান্তে তাকে প্রার্থী করা হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি শেখ আফিল উদ্দীন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো শতভাগ ভুল। শার্শার ১১টি ইউনিয়নের নেতারা বসেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিষয়টি আমাকে জানান।’ সোহরাবের বিরুদ্ধে চোরাচালান ইত্যাদির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরোধীপক্ষ এমন অভিযোগ আনে, এটা তারই নমুনা।’
যশোরের শার্শা উপজেলার মতোই সারা দেশের তৃণমূল আওয়ামী লীগের বিস্তর অভাব-অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেন্দ্রের কঠোর অবস্থান নিয়েও সন্দেহ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে তৃণমূলের।
নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে উপজেলা উন্মুক্ত রেখেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার না করতে দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি), মন্ত্রীদের দফায় দফায় কেন্দ্র থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কঠোর নির্দেশনার পর উপজেলা নির্বাচনে গতকাল রবিবার পর্যন্ত এমপি-মন্ত্রীদের স্বজন দুজনের প্রত্যাহার করার ঘোষণা জানা গেছে। তারা হলেন মাগুরার বীরেন সিকদার ও নাটোরের জুনাইদ আহমেদ পলকের স্বজন। ৪০টির বেশি উপজেলায় এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনরা ভোট করছেন বা করার ঘোষণা দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, যেসব এমপি-মন্ত্রী দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নিজের স্বজনদের উপজেলা নির্বাচনের মাঠে রাখবেন তারা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। দল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। আগামী নির্বাচনে তাদের মনোনয়নও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
৩০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা হবে। সেখানে যেসব এমপি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করবেন, তাদের বিষয়ে কী কী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি কেউ প্রত্যাহার না করে তাহলে কোনো এমপি উপজেলা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সেই ব্যাপারে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনাম সেলিম বলেন, ‘কেন্দ্রের নির্দেশনা মানছে বলে মনে হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, প্রত্যাহারের সময় এখনো আছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যাক।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরের এই বিশৃঙ্খলার শেষ কোথায় আমি জানি না।’ তিনি বলেন, ‘সবাই সবার প্রভাব ধরে রাখার লড়াই শুরু করেছেন। দলের কথা কেউ ভাবছেন না।’
দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নির্দেশনা দিয়ে বসে নেই। পর্যবেক্ষণও করছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা পর্যন্ত দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন এর সমাধান কী?’
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় এমপি মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী ও সাবেক এমপি আয়েশা ফেরদাউস ও এমপির বড় ছেলে আশিক আলী। এ উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান মাহবুব মোর্শেদ লিটন। তিনি মোহাম্মদ আলীর ছোট ভাই। ভাতিজার সমর্থনে এবার লিটন মনোনয়ন দাখিল করেননি। এখন এমপির স্ত্রী ও ছেলে মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে উপজেলার চেয়ারম্যান পদে আবারও তফসিল দিতে হবে।
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের এখানে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। দলের কেউ মনোনয়ন দাখিল করেনি। রানিং চেয়ারম্যান আমার ছোট ভাই। সে তার ভাতিজার নাম প্রস্তাব করেছে। যেটা সর্বসম্মতভাবে সবাই গ্রহণ করেছে। এর বাইরে কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করেনি। এখন আমি এখানে কী করব? এখন যদি কেউ না থাকে (স্ত্রী ও ছেলে প্রত্যাহার) তাহলে কি উপজেলাটি ফাঁকা যাবে? আমাদের এখানে চিত্র ভিন্ন।’
সুবর্ণচর উপজেলা থেকে স্থানীয় এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইশরাক সাবাব চৌধুরী উপজেলা নির্বাচন করছেন। একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (খায়রুল আনাম চৌধুরী সেলিম) জাতীয় নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করেছিলেন। সেটা আমি সাংগঠনিক সম্পাদককে (আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন) বলেছিলাম, তিনি আমাকে জানাবেন বলেছেন। আর আমার সঙ্গে কথা হয়নি। এখন পর্যন্ত আমার ছেলে ভোট করবে। ২৮ বছর বয়সের ছেলে, সে যে আমার কথা শুনবে এমন কোনো কথা তো নেই।’
স্থানীয় লোকজন বলছেন, আপনিই আপনার ছেলেকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন এ বিষয়ে একরাম চৌধুরী বলেন, ‘আমি তাকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করাইনি। ওকে জনগণ দাঁড় করিয়েছে।’
একাধিক ধাপে ৪৯৫ উপজেলার নির্বাচন করার পরিকল্পনা কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২৫টি জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যমতে, ৫৭টি উপজেলার মধ্যে ১১টিতে স্থানীয় এমপি ছেলে, আপন ভাই, স্ত্রীর ভাই, খালাতো ভাইকে প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছেন।
সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। সেখানে তিনি জেলা আওয়ামী লীগকে পাশ কাটিয়ে একক সিদ্ধান্তে খালাতো ভাই ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনার রশীদ হীরাকে আবারও প্রার্থী করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের তার পক্ষে কাজ করার জন্য শপথও করান। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে লিখিত অভিযোগও করেন। একই উপজেলায় নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন রাজ্জাকের মামাতো ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ধনবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র খন্দকার মঞ্জুরুল ইসলাম তপন।
রাজ্জাকের বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামী লীগের অভিযোগ প্রসঙ্গে গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এগুলো জানি। তদন্ত করে খোঁজখবর নিচ্ছি।’
মাদারীপুর সদর উপজেলায় প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খানের বড় ছেলে আসিবুর রহমান খান। তিনি জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় প্রার্থী হচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের ভাগ্নে সোয়েব আহমদ। নরসিংদীর পলাশে আনোয়ারুল আশরাফ খান দীলিপের স্ত্রীর বড় ভাই ও ঘোড়াশাল পৌরসভার সাবেক মেয়র শরীফুল হক প্রার্থী হবেন। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে স্থানীয় এমপি মাজহারুল ইসলাম সুজনের দুই চাচা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদ সাবেক সদস্য সফিকুল ইসলাম। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় নির্বাচন করবেন সংসদ সদস্য আলী আজগর টগরের ভাই আলী মুনসুর বাবু। বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলায় ছেলে ও ভাইকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন বগুড়া-১ আসনের এমপি সাহাদারা মান্নান।
