মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান লড়াইয়ে সেখানকার গ্রামগুলো থেকে ভয়ে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। আগের মতো এবারও এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শুধু স্থানীয় সূত্রই নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এক রোহিঙ্গা নেতার উদ্ধৃতি দিয়ে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত তীব্র আকার নেওয়ায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে চায় আরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে তারা জড়ো হয়েছেন।
তবে আগের মতো কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রোহিঙ্গারা যেন আগের মতো কোনোভাবেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর থাকতে হবে। এমনিতেই গত ছয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। এখন নতুন করে আবার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে।
এ প্রসঙ্গে কূটনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘মিয়ানমারে যে পরিস্থিতি চলছে তাতে রোহিঙ্গাদের মধ্যেও নতুন করে আরও ভীতি তৈরি হয়েছে। এটা রোহিঙ্গা ছাড়াও দেশটির অন্য নাগরিকদের মধ্যেও হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে একটা জোরালো মত তৈরি করতে হবে যে অন্য নাগরিকদের মতোই রোহিঙ্গারাও মিয়ানমারের নাগরিক। তা না হলে এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুধু রোহিঙ্গারাই দেশটি ছেড়ে পালাবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত করতে হবে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ সতর্ক। রোহিঙ্গারা যেন আর অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে সরকার।
জানা গেছে, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সঙ্গে স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদেরও এ ব্যাপারে যুক্ত করা হয়েছে। রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কড়া পাহারা বসিয়েছে, দিনেও চলছে কঠোর নজরদারি। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি-কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আদনান চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্তে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি যেন কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে।’
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ নুর হাশেম নামে এক রোহিঙ্গা নেতা জানান, সহিংসতার কারণে রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে ছোট নৌকায় করে নাফ নদী পার হয়ে ২০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে চলে এসেছে বলে জানান তিনি।
হাশেম বলেন, তার একজন ভাতিজা মংডুর গ্রামের বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। এরপর তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছেন না। রাখাইনের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন রোহিঙ্গারা।
কক্সবাজারে থাকা মোহাম্মদ রিজুয়ান খান নামে এক রোহিঙ্গাও আনাদোলুকে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ সীমান্তে হাজারখানেক রোহিঙ্গা প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনই দল বেঁধে বাংলাদেশ সীমান্তে আসছে রোহিঙ্গা।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিপীড়ন-ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এখনো তাদের একজনও ফেরত যায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে বাস করছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।
নাফ নদীতে দুই বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ : বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ শিকার শেষে ট্রলারে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ঘাটে ফেরার পথে নাফ নদীতে গুলিতে বাংলাদেশি দুই জেলে আহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) শাহপরীর দ্বীপ বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এ ঘটনা ঘটে। এফবি মায়ের দোয়া নামে ট্রলারটিতে থাকা মাঝি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নাফ নদীর মিয়ানমার অংশে থাকা একটি জাহাজ থেকে গুলি ছোড়া হয়।
বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মোহনার চ্যানেলটি বদরমোকাম এলাকা হিসেবে পরিচিত। এর বিপরীতে (নাফ নদীর ওপারে) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা। সেখানে আগে থেকে মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটি জাহাজ অবস্থান করছিল। তবে বিজিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) গুলিতে বাংলাদেশি ওই দুই জেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আহতরা হলেন সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ ছিদ্দিকের ছেলে মোহাম্মদ ফারুক এবং মাঝের ডেইল গ্রামের আলী আহমদের ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল।
গুলিতে ফারুকের ডান পায়ের তালু, বাঁ পায়ের হাঁটু ও বাঁ হাতের আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আর ইসমাইল পা ও হাতে আঘাত পান। দুপুরে ট্রলারের অন্যান্য জেলে গুলিবিদ্ধ দুই জেলেকে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সুরাইয়া নাজনীন জানান, দুপুরে গুলিবিদ্ধ দুজনকে হাসপাতালে আনার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে অবস্থার অবনতি হওয়ায় গুলিবিদ্ধ ফারুককে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ট্রলারটির মালিক ও শাহপরীর দ্বীপ মাঝেরপাড়ার বাসিন্দা মো. ছিদ্দিক জানান, এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারটি গত ১৮ এপ্রিল সকালে শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট থেকে বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে বাংলাদেশ জলসীমানায় মাছ ধরতে যায়। ট্রলারে জেলে ছিলেন ৯ জন। গতকাল সকালে মাছ নিয়ে ট্রলারটি শাহপরীর দ্বীপ ঘাটে ফিরছিল। বেলা ১১টার দিকে ট্রলারটি বদরমোকাম চ্যানেল অতিক্রম করে নাফ নদীতে ঢোকার সময় নাইক্ষ্যংদিয়ার অংশে অবস্থানরত মিয়ানমারের একটি জাহাজ থেকে অসংখ্য গুলি ছোড়া হয়।
হামলার শিকার ট্রলারটির মাঝি (সারেং) মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, কোনো ধরনের সতর্ক সংকেত ছাড়াই মিয়ানমারের জাহাজ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। ট্রলার লক্ষ্য করে ১০-১৫ মিনিটে অন্তত ৫০-৬০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। গুলি থেকে বাঁচতে ট্রলারের জেলেরা ভেতরে মাছ রাখার একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। এরপরও দুই জেলে গুলিবিদ্ধ হন। বাংলাদেশ জলসীমানা দিয়ে বাংলাদেশি ট্রলারের ঘাটে ফেরা অবস্থায় মিয়ানমার সীমান্ত থেকে গুলি ছোড়ার ঘটনায় বাংলাদেশি জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউসুফ আরও বলেন, ‘আমরা নাফ নদীতে বাংলাদেশের জলসীমায় ছিলাম এবং হাত নেড়ে বাংলাদেশের পতাকা দেখিয়ে তাদের গুলি না করার ইঙ্গিত দিচ্ছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের সংকেত উপেক্ষা করে।’
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশি দুই জেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় মিয়ানমারের বিজিপিকে প্রতিবাদলিপি পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
টানা দুই মাস ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) লড়াই-সংঘাত চলছে। কিছুদিন ধরে মংডু টাউনশিপের উত্তরের বলিবাজার, নাকফুরা, কাওয়ারবিল এবং দক্ষিণের নাইক্ষ্যংদিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় দুপক্ষের সংঘাত বেড়েছে। দিন-রাত মর্টার শেল, গ্রেনেড বোমার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। আরাকান আর্মির অবস্থানে আকাশ থেকে গোলা ছোড়ার পাশাপাশি নাইক্ষ্যংদিয়া, মংডুর কাছে নাফ নদীর জলসীমানায় মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজ অবস্থান করে।
