কথা শোনেননি মন্ত্রী এমপিরাই

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৫৭ এএম

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) সন্তান, পরিবারের সদস্য এবং নিকটাত্মীয়রা উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি তারা কারও পক্ষে কাজও করতে পারবেন না। এমনটি জানিয়ে এমপি ও মন্ত্রীর স্বজনদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশনা দেয় ক্ষমতাসীন দলটি। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এ নির্দেশনা ঘোষণা করেন। তবে অতীতের মতো এবারও নির্দেশনা মেনে নেননি দলটির মাঠপর্যায়ের প্রভাবশালী বহু নেতা। ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে একজন মন্ত্রী, মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন ডেপুটি স্পিকার এবং অন্তত পাঁচজন সাবেক মন্ত্রী (বর্তমান সংসদ সদস্য) ও নয়জন বর্তমান সংসদ সদস্যের স্বজন উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। যাদের মধ্যে কেউ কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতও হতে চলেছেন।

প্রথম ধাপে ১৫২টি উপজেলায় ভোট হবে আগামী ৮ মে। এসব নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দলের নির্দেশনা মেনে মাত্র তিনটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, বাকি প্রার্থীরা থেকেই গেছেন। যেসব এমপি ও মন্ত্রীর স্বজন সরে দাঁড়িয়েছেন তারা হলেন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম ও ড. বীরেন শিকদার। আর বাকিরা নির্বাচনে থেকে যাওয়ার মাধ্যমে এমপির রাজত্বে তিনিই সর্বেসর্বা এটারই যেন আবারও প্রমাণ মিলল।

মাঠপর্যায়ে এ অবস্থা দেখা গেলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, এমপি-মন্ত্রীরা দলীয় নির্দেশনা যে মানেনি সেটা বলা যাবে না। কারণ নির্বাচন থেকে যেকোনো সময় প্রার্থীর সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মনোনয়নপত্র যারা প্রত্যাহার করেননি তাদের মধ্যে রয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এমপি একরামুল করীম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইশরাক চৌধুরী, মাদারীপুর সদরে সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি শাজাহান খানের ছেলে আসিবুর রহমান খান, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে এমপি সাহাদারা মান্নানের ছেলে শাখাওয়াত হোসেন ও সোনাতলায় ভাই মিনহাদুজ্জামান, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় এমপি ও সাবেক মন্ত্রী শাহাবউদ্দিনের ভাগ্নে সোয়েব আহমদ, নরসিংদীর পলাশে এমপি আনোয়ারুল আশরাফ খান দীলিপের স্ত্রীর বড় ভাই ও ঘোড়াশাল পৌরসভার সাবেক মেয়র শরীফুল হক, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলামের দুই চাচা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য সফিকুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় সংসদ সদস্য আলী আজগর টগরের ভাই আলী মুনসুর, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী (বর্তমান এমপি) আবদুর রাজ্জাকের খালাতো ভাই হারুনার রশীদ হীরা ও মামাতো ভাই খন্দকার মঞ্জুরুল ইসলাম তপন, সিরাজগঞ্জ সদরে এমপি তানভীর শাকিল জয়ের চাচাতো ভাই রাশেদ ইউসুফ জুয়েল, পাবনার বেড়াতে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর ছোট ভাই সাবেক মেয়র আবদুল বাতেন এবং ভাতিজা আবদুল কাদের সবুজ, পিরোজপুরের নাজিরপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের ছোট ভাই এসএম নূরে আলম সিদ্দিকী, তেঁতুলিয়ায় পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনের বেয়াই অর্থাৎ ছেলের শ্বশুর কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল লতিফ তারিন এবং পঞ্চগড়ের সদর উপজেলায় সংরক্ষিত (৩০১) আসনের সংসদ সদস্য রেজিয়া ইসলামের দেবর আমিরুল ইসলাম। এ ছাড়া নীলফামারীর ডিমলায় উপজেলা চেয়ারম্যান পদে স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আফতার উদ্দিন সরকারের আপন ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক সরকার মিন্টু, আপন ভাতিজা উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌস পারভেজ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে এমপির আপন ভাতিজি বউ ডিমলা সদর ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পারুল বেগম দলীয় নির্দেশনা মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।

অন্যদিকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলাসহ একাধিক উপজেলায় এমপিদের স্বজনদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে হাতিয়ার এমপি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের এখানে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। দলের কেউ মনোনয়ন দাখিল করেনি। রানিং চেয়ারম্যান আমার ছোট ভাই। সে তার ভাতিজার নাম প্রস্তাব করেছে। যেটা সর্বসম্মতভাবে সবাই গ্রহণ করেছে। এর বাইরে কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করেনি। আমার স্ত্রী আয়েশা ফেরদাউস মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আমার ছেলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়।’

একইভাবে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের শ্যালক মহব্বত আলী ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিনা ভোটে নির্বাচত হতে যাচ্ছেন। আর মনোহরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের আপন ভাতিজা আমিরুল ইসলাম।

অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মো. ফয়সাল বিপ্লবের চাচা আনিছ-উজ্জামান আনিছ একমাত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

এভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, সেসব উপজেলায় এমপির আধিপত্যে একক প্রার্থী ছিলেন এমপির স্বজন। অন্য কারও নির্বাচন করার সুযোগ না পাওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তারা। বেশ কিছু উপজেলায় এমপির আশীর্বাদে উপজেলায় মাত্র একজন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কারণে সেসব উপজেলায়ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন গতকাল।

এমপিদের আধিপত্য থাকার কারণেই এগুলো হয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি তৃণমূল নেতারা। চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার কয়েকটি উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কথা হয়।

তৃণমূল আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমপিই শেষ কথা বলে বলয়ের বাইরের কেউ উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি বিজয়ী হওয়ারও সুযোগ নেই। বর্তমান রাজনীতিতে এমপিই শেষ কথা। রাজনৈতিক স্বার্থে নাম প্রকাশ করে ক্ষোভের কথা বলতে চান না তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতারা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী গতকাল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক দিন ছিল। সেদিন প্রত্যাহার করেনি বলে পরের ধাপেও এমনটি ঘটবে তা নয়। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করেন, ৩০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন অনেক এমপি-মন্ত্রীর স্বজন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আশা করি নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ এখনো আছে, শেষ হয়ে যায়নি। যারা এখনো আছেন তারা সরে যাবেন। দলের সাংগঠনিক সম্পাদকরা এ নির্দেশনা নিয়ে কাজ করছেন, মোবাইলে কথা বলছেন এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে।’

এখনো এমপি-মন্ত্রীর স্বজন যারা আছেন, শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন দাবি পাওয়া গেলেও নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা থেকে স্থানীয় এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইশরাক সাবাব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি উপজেলা নির্বাচন করব।’

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক সময় পার হয়েছে। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ তো আছে। আশা করি অনেকেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে দেবেন। আওয়ামী লীগ পর্যবেক্ষণ করছে। দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভা শেষে অন্য সিদ্ধান্ত আসবে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্দেশনা যারা মানেননি, তাদের ব্যাপারে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’

বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ চায় তৃণমূলে যেসব জনপ্রিয় নেতা, দুর্দিনের ত্যাগী নেতা রয়েছেন তাদের সুযোগ করে দিতে। দলেরও তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সে কারণে এবার উপজেলা নির্বাচনে মার্কা দেওয়া হয়নি। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় আওয়ামী লীগ। যেসব এমপি-মন্ত্রী স্বজনদের দাঁড় করিয়ে এ সুন্দর প্রক্রিয়াটি নষ্ট করে দুর্দিনের নেতাদের সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটাতে চান, নিশ্চয়ই তারাও ব্যাকফুটে চলে যাবেন।’

দল থেকে নির্দেশনা দেওয়া ও মাঠপর্যায়ে তা না মানা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল। মানা না মানায় কী প্রভাব ফেলবে সেটা সে দলের নীতিনির্ধারক মহলের ভাবনার ব্যাপার। এখানে আমার বক্তব্য ম্যাটার করে না। নির্দেশনা না মানা নিশ্চয়ই সংগঠনের জন্য কিছুটা অস্বস্তির।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত