তালিকা হচ্ছে নিষ্ক্রিয় নেতাদের

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৫৮ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ‘এক দফা’র আন্দোলনে ‘অসহযোগ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল বিএনপি। কিন্তু সে আন্দোলন-কর্মসূচির ফসল ঘরে তুলতে পারেনি দলটি। যাদের ওপর ভর করে ফসল ঘরে তোলার ছক কষেছিল বিএনপি হাইকমান্ড, দায়িত্বপ্রাপ্ত সেই নেতাকর্মীরা গা-ঢাকা দেওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে আন্দোলন, তাতে কোনো গতির সঞ্চার হয়নি।

আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়েছে তা জানতে সাংগঠনিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা পড়া প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, দলটির প্রায় ৬০০ নেতার জাতীয় নির্বাহী কমিটির ৮০ শতাংশই আন্দোলনের সময় মাঠে ছিলেন না। বরাবরের মতো তৃণমূলের অর্থাৎ জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ তাদের ওপর দেওয়া দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছেন।

প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা, আন্দোলন চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থের জোগানের অপর্যাপ্ততা, ‘গ্রেপ্তার’ হওয়া যাবে না ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এমন নির্দেশনাকে পুঁজি করে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকের আড়ালে চলে যাওয়া প্রভৃতিকে আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে দলটির আটটি সাংগঠনিক বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়, আন্দোলন-সংগ্রামে গা বাঁচিয়ে চলা নেতাদের তালিকা করার জন্য।

ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনে কোন কোন নেতা সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাদের বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল সাংগঠনিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের প্রতিবেদন চলতি মাসের শুরুতে জমা দিয়েছেন। সব প্রতিবেদনই জমা পড়েছে। বিচার বিশ্লেষণ করে হাইকমান্ড পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’

এ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, এক দফা আন্দোলনে কোন কোন নেতা রাজপথে ছিলেন, কোন নেতা সুযোগ বুঝে আত্মগোপনে গেছেন, তাদের সম্পর্কে জানতে চায় শীর্ষ নেতৃত্ব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে এ বিষয়ে পর্যালোচনামূলক ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। সেখানে নেতাদের কর্মকা- মূল্যায়নের প্রতিবেদন দিতে তাগাদা দেওয়া হয়। পরীক্ষিত, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি ঢেলে সাজাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়তার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে, দলের অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থান করেছে, বিভিন্ন ফোরামে গিয়ে বিএনপির সমালোচনা করেছে এসব বিষয়কে প্রতিবেদনে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। যারা অসুস্থ এবং মাঠের রাজনীতিতে আর সক্রিয় হতে পারবেন না, তাদের তালিকাও চেয়েছে হাইকমান্ড।

দুটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বিভাগের প্রতিবেদনের তথ্য দেশ রূপান্তর জানতে পেরেছে। এতে নেতাকর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাহী কমিটির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নেতা আন্দোলনের সময় মাঠে ছিলেন না। তবে জেলা পর্যায়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ নেতাকর্মী সক্রিয় ছিলেন। দুটি প্রতিবেদনেই এ সংখ্যা ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমবেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্দোলনের সমন্বয় সাধনের জন্য বিভাগীয় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের আলাদাভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিভাগীয় সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকরা স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু ওই সময় তাদের ফোনে বা সরাসরি পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের শুরুতেই নেতাকর্মীদের প্রতি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা ছিল কোনোভাবে ‘গ্রেপ্তার’ হওয়া যাবে না। আড়ালে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম সফল করতে হবে। অনেক নেতা এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। তারা আড়ালে গেছেন ঠিকই কিন্তু ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে মাঠে নামেননি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজপথে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়নি উল্লেখ করে আন্দোলন-সংগ্রাম সফল না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়, এবার মূলত সংঘর্ষ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ’৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর মতো হামলা করেছে। নেতা বা কর্মীকে না পেয়ে তার বাবা-ভাই-বোন অথবা পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে গেছে। কারও কারও গাড়ি বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে গেছে। ফলে অনেক নেতা বা কর্মী আন্দোলনের গতি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

নেতা বা কর্মীদের আর্থিক সমস্যার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকায় দলের নেতাকর্মীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেনি। আর্থিকভাবে তারা দুর্বল হওয়ায় আন্দোলনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থেও জোগান দিতে পারেননি। আবার জেলা পর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে যে সহায়তা প্রয়োজন ছিল তাও তারা পাননি। দল থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আন্দোলন তেমন গতি পায়নি।

প্রতিবেদনে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিতে গিয়ে বলা হয়, এই মুহূর্তে দলের নেতাকর্মীদের জেল থেকে মুক্ত করে ঘরে ফিরিয়ে আনা এবং জামিন না হওয়াদের জামিন করানোই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের যেখানে বাকি রয়েছে সেখানে সম্মেলন করে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শেষ করা দরকার। দ্রুততম সময়ে এ কাজ সম্পন্ন করার পর নতুন করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিভাগে আন্দোলনের সমন্বয়কারী মাহবুবের রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত বয়স্ক নেতাদের কেউ কেউ সক্রিয় না থাকলেও অধিকাংশ নেতাকর্মীই মাঠে ছিলেন। জেলাপর্যায়ের প্রায় ৮০ শতাংশ নেতাকর্মী তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘বিগত আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ও সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করা সবচেয়ে জরুরি। দল এখন এ কাজটিই করছে। জানবাজি রেখে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন যারা, তাদের অবশ্যই মূল্যায়ন করবে হাইকমান্ড।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত