হিটস্ট্রোকের চিকিৎসা জানা নেই কারও

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৪০ পিএম

প্রতিদিনের মতো রিকশা নিয়ে গত সোমবার বাসা থেকে বের হন রাজধানীর বকশিবাজার এলাকায় আব্দুল আওয়াল (৪৫)। প্রচন্ড গরমে বকশিবাজার সংলগ্ন ঢাকা নার্সিং কলেজের পেছনের রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়ে যান তিনি। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের ধারণা তিনি হিট হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। 

বগুড়ার শেরপুরে বুধবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে গরম উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে  বাড়ির পাশের জমিতে ঘাস কাটতে যান কৃষক মো. আব্দুস ছালাম (৬০)। কাজ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জমিতেই জ্ঞান হারান এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকরা তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হিটস্ট্রোককে দায়ী করেছেন। 

কেবল আব্দুল আওয়াল কিংবা আব্দুস ছালামই নয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত শুক্রবার থেকে বুধবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই তাপপ্রবাহ বইছে। এরমধ্যে ৯টি অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে। এসব অঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ ডিগ্রির উপরে। এই পরিস্থিতিতে দেশে বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) থেকে আরও ৩ দিনের হিট অ্যালার্ট বা তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। চলতি মাসে এ নিয়ে টানা চতুর্থ দফায় ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি করা হলো।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান বলেন, আপাতত বড় পরিসরে বৃষ্টি হয়ে তাপপ্রবাহ দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চলতি এপ্রিল মাসের শেষেও এই তাপপ্রবাহ পুরোপুরি দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বরং তা মে মাসের ২ থেকে ৩ তারিখ পর্যন্ত চলবে। এরপর হয়তো বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এর আগে পর্যন্ত বড় পরিসরে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। স্থানীয়ভাবে বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে তাপদাহের কারণে বাইরে বের হতে গিয়ে অনেকেই হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। কেউ কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পাশাপাশিতীব্র গরমের কারণে ডায়ারিয়া, পেটের পীড়া, ঠান্ডা, জ্বর-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে রোগীদের। গত কয়েকছর ধরে দেশে হিটস্ট্রোক পরিচিতি লাভ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত হিটস্ট্রোকে বছরে কত মানুষ আক্রান্ত হন কিংবা মারা যান সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই। এমনকি চলতি তাপপ্রবাহে কত মানুষ মারা গিয়েছেন সে বিষয়েও কোনো সরকারি বেসরকারী ডাটাবেইস তৈরী হয়নি। কেবল তাই নয় হিটস্টোকে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা বিষয়েও স্বচ্ছ ধারণা নেই চিকিৎসকদের। কি কি উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা গেলে হিটস্ট্রোকে মারা যায় কিংবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলে তাকে কি চিকিৎসা দেওয়া হবে সে বিষয়ে ধারণা নেই অনেক চিকিৎসকদের। 

সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ডা. মাহবুব হোসেনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কেউ চিকিৎসা নিতে আসলে কি চিকিৎসা দেওয়া হয়? তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে চিকিৎসা দিতে হবে তা আমাদের ধারণা নেই। এমনিতে আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেই তারপর সুস্থ না হলে তাকে বিভাগীয় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যখন মেডিক্যালে পড়াশোনা করি, তখন দেশে হিটস্ট্রোক বিষয়টি ছিল না, ফলে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এখন আমরা আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি, এতে বেশীরভাগ রোগীই সুস্থ হয়ে উঠেন। 

হিটস্ট্রোক বিষয়ে চিকিৎসকদের সঠিক ধারণা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. রোবেদ আমিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হিটস্ট্রোকের বিষয়টি একেবারেই নতুন। অধিকাংশ চিকিৎসক ও নার্সদের এ বিষয়ে সঠিক জানাশোনা নেই। এই চিকিৎসকরা যখন মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করেন তখন পাঠ্যসূচীতে এ বিষয়ে কিছু ছিল না। এমনকি দেশে এ বিষয়ে কোনো গাইডলাইনও ছিল না। ফলে নিজ আগ্রহ থেকে যারা ঘাটাঘাটি করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাদের বাইরে এ বিষয়ে জানাশোনা নেই। গত বছর যখন দেশে অনেক গরম পড়ে এবং মানুষ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন এ বিষয়ে আমি বিভিন্ন জায়গায় কথা বলি। 

তিনি বলেন, তবে এই সমস্যা উপলব্দি করে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। হিটস্ট্রোকের মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায়  জাতীয় নির্দেশিকার (গাইডলাইন) খসড়া তৈরি করেছি আমরা। ৭১ পাতার এই নির্দেশিকায় হিটস্ট্রোকের রোগীদের বিষয়ে চিকিৎসকদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এই গাইডলাইনের আলোকে প্রশিক্ষণ ও শুরু হয়েছে।

ঢাকা কমিউনিটি মেডিক্যাল হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. শাকিল বলেন, এই গাইডলাইন তৈরীকে সাধুবাধ জানাই। এটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যেগ। তবে প্রশিক্ষণ কিংবা গাইডলাইন বিতরণ যেনো ঢাকা কেন্দ্রীক না হয়, কেনোনা রোগীদের বড় অংশ ঢাকার বাইরের। দ্রুত এই গাইডলাইন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি কীভাবে হিটস্ট্রোক থেকে বেঁচে থাকা যায় সেই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্ঠি করতে হবে। মসজিদের খুতবায় এ বিষয়ে আলাপ করতে হবে, গণমাধ্যমে বিঙ্গাপন প্রচার করতে হবে। মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারলেই হিটস্ট্রোক থেকে রক্ষা করা যাবে। 

সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে তাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে থাকে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশী তাপমাত্রা হলে হিটস্ট্রোকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। 

প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে ঘাম বন্ধ হয়ে যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে,  তাকে হিট স্ট্রোক বলে। কোনো কারণে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ত্বকের রক্তনালি প্রসারিত হয় এবং অতিরিক্ত তাপ পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। প্রয়োজনে ঘামের মাধ্যমেও শরীরের তাপ কমে যায়। কিন্তু প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি সময় অবস্থান বা পরিশ্রম করলে তাপ নিয়ন্ত্রণ আর সম্ভব হয় না। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায় এবং হিট স্ট্রোক দেখা দেয়।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবদুল­াহ  দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি গত কয়েকবছর ধরে হিটস্ট্রোক নিয়ে কথা বলছি। গণমাধ্যমে কলাম ও সাক্ষাৎকার দিয়ে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরীর চেষ্টা করেছি। যেহেতু এই বিষয়টি একেবারেই নতুন তাই এ বিষয়ে চিকিৎসকদের তেমন ধারণা নেই। যে গাইডলাইন তৈরী করা হয়েছে তা দ্রুত সারা দেশের চিকিৎসকদের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। অনলাইনে কিছু প্রশিক্ষণ সভার আয়োজন করা যেতে পারে। তাহলে চিকিতসকরা রোগীদের সেবা দিয়ে সুস্থ করতে পারবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত