আর্থরাজনীতির সফল মানুষ আবুল মাল আবদুল মুহিত

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০০ পিএম

আবুল মাল আবদুল মুহিতের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। একটি পরিতৃপ্ত, কর্মবহুল ও বর্ণাঢ্য জীবন অতিবাহিত করে ৮৮ বছর বয়সে ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল মারা যান তিনি। দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে জীবনের শেষ ভাষণে বলে গেছেন তিনি কাটিয়েছেন 'মহা তৃপ্তির,মহা প্রাপ্তির' এক জীবন।

ভাষা সংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, সচিব, মন্ত্রী, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, লেখক, গবেষক, পরিবেশবিদ কতো পরিচয় ছিল তার। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে বাংলাদেশের সম্পৃক্তি ও সমৃদ্ধিতে তিনি ছিলেন এক রূপান্তরের নায়ক।

১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্ম নেন। বাবা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ এবং মা  সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরী। দু’জনই রাজনীতি ও সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন। সংস্কৃতিমান পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠা মুহিত  কৈশোরেই সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় জড়িয়ে পড়েন। শিশু কিশোর সংগঠন ' মুকুল ফৌজ' গঠন করে নেমে পড়েন সৃজনশীল চর্চায়। আটাশি বছর বয়সে তার সৃজনশীল চর্চা থেমে থাকেনি। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বিষয়ে লিখে গেছেন। দেশের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে ব্যক্ত করেন নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি ১৯৪৮ সালে স্কুল ছাত্র হিসেবে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জড়িত হন। ১৯৪৯ সালে সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ  থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এমএ পাশ করেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাত্র জীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অবদান রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। পরবর্তীতে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সর্বোচ্চ ধাপে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে অবসর জীবনে হয়ে ওঠেছিলেন দেশের সুশীল সমাজের এক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস-এ (সিএসপি) যোগ দেওয়ার পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনা সচিব নিযুক্ত হন। তবে এই দায়িত্ব গ্রহণ না করে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকোনোমিক মিনিস্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে নিযুক্ত হন। এখন পর্যন্ত তিনি একমাত্র বাংলাদেশি যিনি এ পদে আসীন হয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপ-সচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এই বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১- এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন।

১৯৮১ সালে চাকরির ২৫ বছর পূর্তিকালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। শর্তসাপেক্ষে ১৯৮২-৮৩ সালে তিনি এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবার নির্দিষ্ট সময়ের পর মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করেন। অতঃপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি সার্বক্ষণিক দেশে অবস্থান করে একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনে সম্পৃক্ত হয়ে দেশের সুশীল সমাজের একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনে তিনি একজন পথিকৃৎ এবং ব্যাপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালের আগস্টে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং অক্টোবরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট ১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে সিলেট ১ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তিনি নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ২০১৪ সালে সিলেট ১ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি আবারও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।  টানা দশ বছর অর্থমন্ত্রীর কর্তব্য পালন করে দেশকে নিয়ে গেছেন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায়। আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রথাগত রাজনীতির পথে না হেঁটে জাতির বিকাশমান ধারাকে অগ্রবর্তী করেছেন। ঐতিহ্যের পরম্পরা ধারণ করে যুগোপযোগী মিশেলে আধুনিকতা লালন করেছেন।

দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করে আর নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের ঘোষণায়ও তিনি ব্যতিক্রম। অবসর নিয়েও ২০২১ সালে  বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের জাতীয় আয়োজনে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন অফুরন্ত জীবনীশক্তির অধিকারী এক প্রাণবন্ত মানুষ। সদা হাস্যোজ্জ্বল কর্মযোগী, ধ্যানী, ধীমান এই মানুষটির স্পষ্টতা, সরলতা ও সাহসিকতা ছিল সকল মহলে প্রশংসিত। লেখক হিসেবেও মুহিত ছিলেন খ্যাতিমান। প্রশাসনিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তার ৩০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিষয়ে তাঁর 'জেলায় জেলায় সরকার' একটি আকর গ্রন্থ। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মহকুমা গুলোকে জেলায় রূপান্তর এবং গণতান্ত্রিক জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রশাসনিক প্রতিবেদন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালে তিনি প্রণয়ন করেছিলেন।

বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব আবুল মাল আবদুল মুহিত পরিণত বয়সে চলে গেলেন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য রেখে গেছেন এক অনুকরণীয় অর্থনৈতিক কৌশল। সমৃদ্ধি নিয়ে তার গভীর আশাবাদ। বাংলাদেশকে  স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে ভূমিকা রাখতে পেরে তিনি  গভীর আত্মতৃপ্তি খুঁজতেন। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হবে এই আত্মবিশ্বাসে রেখে গেছেন রূপকল্প।

বৃহৎ বাজেট, বৃহৎ প্রকল্প তারই ধ্যান ধারনার ফসল। যা বাংলাদেশ এখন বাস্তবায়ন করছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প তিনিই সূচনা করেন। সকল নাগরিকের জন্য পেনশন ব্যবস্থা তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত প্রকল্প। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত তিনি তৈরি করে দিয়েছেন। এক দশক আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সভরিন বন্ডের ফাঁদ থেকে রক্ষা করেছেন বাংলাদেশকে। যার সুফল ভোগ করছে এখন বাংলাদেশ।

তিনি গতানুগতিক রাজনীতি করতেন না। সস্তা জনপ্রিয়তার ধার ধারতেন না। সাধারণের সঙ্গে ছিলো না নিবিড় যোগাযোগ। এই মানুষটি ছিলেন আপাদমস্তক একজন কুসংস্কারমুক্ত, কুপমুন্ডকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক মানুষ। মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন জানিয়ে তাই কেবল তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব হয়েছে " সাম্প্রদায়িক অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা, এটিকে ভদ্রতার মধ্যে নিয়ে আসা একজন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আমি নিজে মনে করি এই উদ্দেশ্য নিয়েই আমি ৮৮ বছর পূর্ণ করেছি। এটাই আমার মহা তৃপ্তির কারণ; এটাই মহা প্রাপ্তির কারণ"।

আলোকিত ও সফল মানুষ মুহিত বাস্তবতা,অভিজ্ঞতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে কাজে লাগিয়ে রূপান্তরের নায়ক হয়েছেন জীবনের অধিক্ষেত্রে। অনেক সময় অসংগতির বিরুদ্ধে হয়েছেন উত্তেজিত আবার রাজনৈতিক কারণে হয়েছেন সংযত। বুদ্ধিবৃত্তিক মন ও রুচিশীল ভাবনায় সক্রিয় থেকেছেন আজীবন। নিজস্ব চিন্তাধারায় ছিলেন স্থির। রাজনৈতিক কারণে অনেক বিষয় মেনে নিতে হলেও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে আত্মমর্যাদা হারাননি । এমন কর্মতৎপর মানুষ সত্যিই বিরল। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন জাতির অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম নায়ক। তিনি নিশ্চয়ই নতুন প্রজন্মের মাঝে আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবেন। আর্থরাজনীতির সফল এই মানুষটি পরকালে চির প্রশান্তিতে থাকুন এই প্রার্থনা। দ্বিতীয়  মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত