বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচন সন্নিকটে। এ বছর অক্টোবরে শেষ হবে চলতি নির্বাহী কমিটির মেয়াদ। শোনা যাচ্ছে মেয়াদপূর্তির আগেই নির্বাচন হওয়ার। তার আগে ভোট ব্যাংক বানাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন বাফুফের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মহিলা কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ। চলমান ভাঙাচোরা নারী ফুটবল লিগের অখ্যাত, নামসর্বস্ব ক্লাবগুলোকে ভোটার বানাতে উদ্যোগী হয়েছেন বিতর্কিত এই কর্মকর্তা।
যদিও মঙ্গলবার মহিলা কমিটির সভা শেষে কিরণ জানিয়েছেন, ক্লাবগুলোই তার কাছে দাবি জানিয়েছে কাউন্সিলরশিপের। সেই দাবি তার কাছে ভীষণ যৌক্তিক! অথচ ভেতরের খবর ‘প্যাড সর্বস্ব’ ক্লাবগুলোকে কিরণ নেতৃত্বাধীন মহিলা ফুটবল কমিটি ভোটার বানানোর লোভ দেখিয়ে এবার লিগে খেলতে রাজি করিয়েছে। লিগ মাঠে গড়ানোর পর কথা রাখতে এবার তিনি তৎপর হয়েছেন ভোটের বছরে কিছু অখ্যাত ক্লাবকে ভোটার বানাতে।
মঙ্গলবার ছিল মহিলা ফুটবল কমিটির সভা। যেখানে ক্লাবগুলোকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার পক্ষে মত পাওয়া গেছে। তাই এই কমিটি প্রস্তাব আকারে বিষয়টি উত্থাপন করবে নির্বাহী কমিটির সভায়। যদিও নির্বাহী কমিটির ক্ষমতা নেই কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার। এ জন্য শোনা যাচ্ছে আগামী জুনে বাফুফে ২০২৩ সালের কংগ্রেস আয়োজন করতে চাইছে। অর্থাৎ কিরণের লক্ষ্য নির্বাচনের তিন মাস আগে বেশ কিছু ভোট নিজের করে নিতে।
মহিলা ফুটবলের দায়িত্বে অনেক দিন ধরেই আছেন কিরণ। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের আস্থাভাজন হওয়ায় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ফিফা-এএফসি পর্যন্ত বিচরণ করেছেন এবং করছেন। ফিফা থেকে নাম কাটা গেলেও এখনো এএফসির সদস্য তিনি। সর্বময় ক্ষমতা করায়ত্ত করে নারী ফুটবল নিজের মর্জি মতো চালান এই কর্মকর্তা। বাফুফের চতুর্থ তলার ডরমেটরিতে ৫০ থেকে ৬০ জন নানা বয়সের নারী ফুটবলারকে গাদাগাদি করে রেখে তিনি চান সাফল্য কুড়িয়ে নিতে। তাতে কিছু সাফল্য এসেছে ঠিক, তবে ঘরোয়া ফুটবলকে অবকাঠামোয় দাঁড় করাতে পারেননি। ফি বছর লিগও আয়োজন করতে পারেন না। করলেও একে-তাকে ধরে-বেঁধে নামসর্বস্ব কিছু দলকে খেলিয়ে দেন।
গত লিগ পর্যন্ত বসুন্ধরা কিংস থাকায় তারপরও লিগের একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তবে নানা অভিযোগ তুলে এ বছর দল গড়েনি গেল তিন লিগের চ্যাম্পিয়ন কিংস। বাফুফের সব ঘরোয়া আসরের স্পন্সর বসুন্ধরা গ্রুপও এ বছর নারী লিগের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলো অনেক আগে থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে নারী ফুটবল থেকে। দল গড়ার মতো পরিবেশ নেই বলেই তারা আগ্রহী হয় না। তাই কিরণ তার কিছু বিশ্বস্ত লোককে দিয়ে প্যাড সর্বস্ব ক্লাব গঠন করিয়ে আয়োজন করেন নারী লিগ। এবার লিগে খেলছে ১০টি দল।
মঙ্গলবার সভা শেষে কিরণ জানালেন, এর মধ্যে ৯টি ক্লাবই তাদের কাছে কাউন্সিলরশিপের দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দল ছাড়া বাকিরা চায় স্বীকৃতি। কিরণদের যুক্তি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগের ক্লাবগুলো যদি কাউন্সিলর হয়, তবে নারী লিগে খেলা দলগুলো সেই সুযোগ পাবে না কেন, ‘আমার কাছে তাদের দাবিটা যৌক্তিক মনে হয়েছে। আমরা তাই তাদের দাবিগুলো সুপারিশ আকারে নির্বাহী কমিটিকে দেব। এরপর কংগ্রেসে তোলা হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য।’
তার বিশ্বাস নারী লিগের ক্লাবগুলোকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়া হলে দেশের প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত ক্লাবগুলো ভবিষ্যতে খেলতে আগ্রহী হবে, ‘কাউন্সিলরশিপ যদি দেওয়া যায়, তবে বড় বড় ক্লাবগুলো নারী ফুটবলের ব্যাপারে আগ্রহী হবে। তারাও ভালো দল গড়বে। তখন লিগের চেহারাই বদলে যাবে। গতকাল (সোমবার) নাসরিন স্পোর্টস অ্যাকাডেমি ১৯-০ গোলে কাচারিপাড়াকে হারিয়েছে। লিগের সবচেয়ে ভালো দল সবচেয়ে দুর্বল দলের বিপক্ষে খেলেছে। এমন ফলই স্বাভাবিক। যখন বড় ক্লাবগুলো আসবে তখন এইরকম হবে না।’
কিরণের এই উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ও বাফুফের সহ-সভাপতি ইমরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাউন্সিলরশিপ চাইলেই যে কাউকে দিয়ে দিলেই তো হবে না। একটা নীতিমালার মাধ্যমে দিতে হবে। অতীতে যারা নিয়মিত খেলেছে, তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেউ চাইলেই তো হবে না।’ তিনি মহানগরীর ক্লাবগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘কাউন্সিলরশিপ দেওয়ার কথাই যদি আসে, তবে সবার আগে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগের সব ক্লাবকে সেটা দেওয়া উচিত। কিন্তু সেখানে তো সবাইকে দেওয়া হয় না। এমন অনেক ক্লাব আছে যারা ২০ বছর ধরে নিয়মিত খেলছে, অথচ সুপার লিগে কিংবা সেরা আটে থাকে না বলে ভোটাধিকার পায় না।’
কিরণের অভিসন্ধি পরিষ্কার। গেল তিনটি বাফুফে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। ২০১২ সালের নির্বাচনে নির্বাহী সদস্য পদে হেরে যান। ২০১৬ সালে সর্বনিম্ন ভোট পেয়ে নির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হন। আর ২০২০ সালে সর্বশেষ নির্বাচনে হারের পরিণতির শঙ্কা জেগেছিল। ভোট গণনার সময় অনেকটা পিছিয়ে ছিলেন তিনি। তবে শেষ দিকে রহস্যজনকভাবে ভোট বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৭০ ভোট পেয়ে ১৫ নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে হন ১১তম। শেষ নির্বাচিত সদস্য মহিদুর রহমান মিরাজের চেয়ে মাত্র ২ ভোট বেশি পেয়েছিলেন কিরণ।
ভোটের মাঠের এই ঝুঁকি থেকে মুক্তির পথ হিসেবে তিনি চাইছেন নিজস্ব ভোট ব্যাংক তৈরি করতে। অথচ ফিফা-এএফসির নির্দেশনাই আছে, যাতে কাউন্সিলর সংখ্যা কমানো হয়। দেখার বিষয়, সালাউদ্দিন এখন কী করবেন? কিরণে যাবেন? নাকি ফিফা-এএফসির নির্দেশনায়?