একটি অডিওতে মাত্র কয়েক মিনিটের কথোপকথন। এ নিয়েই চলছে তোলপাড়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে মন্তব্য এবং নিয়োগ-বদলি সংক্রান্ত ‘রহস্যজনক তথ্য’ ফাঁসে অস্বস্তিতে পড়েছে পুলিশ। অডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিব্রত। তিন দিন আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল ইসলামের এই অডিও কথোপকথন ফাঁস হয়। এতে আপত্তিকর তথ্য সামনে আসে। বিশেষ করে পুলিশে নিয়োগ-বদলিতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের তথ্যের পাশাপাশি ভাটারা থানায় কোটি টাকা লেনদেনের কথা বলা হয়। এ ঘটনায় ওসি রাকিবুলকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এর আগেও একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার অডিও ভাইরাল হয়েছে।
কখনো ঘুষের অভিযোগ, কখনো বদলি-পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের দাবি, আবার কখনো বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড নিয়ে ‘বিস্ফোরক’ বক্তব্যের অডিও নিয়ে পুলিশে তৈরি হয়েছে নতুন অস্বস্তি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব রেকর্ডের কোনটি সত্য, কোনটি সম্পাদিত বা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ফাঁস হওয়া অডিওর বেশিরভাগই পুলিশ কর্তাদের। কিছুদিন আগের ফাঁস হওয়া অডিওটিও একজন ওসির। সরকার ও পুলিশকে বিব্রত করার পাশাপাশি কারোর ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে কি না সেই বিষয়ে জোরালোভাবে তদন্ত হচ্ছে। রাকিবুলের বক্তব্য অনুযায়ী কোটি টাকা কে নিয়েছে তাও উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। এর আগে পুলিশের কোন কোন কর্মকর্তা ও সদস্যের অডিও রেকর্ড ভাইরাল হয়েছে সেগুলো নিয়েও নতুন করে তদন্ত হচ্ছে।
পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার অডিও ফাঁস নতুন নয়। ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রামু থানার এক এসআইয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন বাদীর অনুকূলে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি আলোচনায় আসে। রাজশাহীর চারঘাট থানার তৎকালীন ওসিকে নিয়েও ২০২৩ সালে ঘুষ দাবির অভিযোগসংক্রান্ত অডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে তদন্তে অডিওটি নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মে মাসে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ আবুল হাশেমকে ঘিরে একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। অডিওর কণ্ঠ তার বলে দাবি করা হলেও তিনি সেটি অস্বীকার করেন। তাকেও দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। চলতি বছর সিআইডির এক পুলিশ কর্মকর্তার বদলিসংক্রান্ত একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত ৯ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরা থানায় করা লিখিত অভিযোগের তদন্তে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি মোবাইল ফোন কথোপকথনের অডিও রেকর্ডে টাকার অঙ্ক উল্লেখসহ বিকাশ নম্বর দেওয়ার কথা শোনা যায়।
ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অডিও ফাঁস হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার, সংযুক্ত বা তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কর্মকর্তা অডিওর কণ্ঠ নিজের নয় বলে দাবি করছেন। পুলিশ সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো অডিওর সত্যতা যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও তদন্তগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক ওসি রাকিবুলের বিতর্কিত অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশ কর্মকর্তারা বিব্রত। ওই অডিওতে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে কিছু হবে না। রাস্তার পুলিশ অনেক দুর্বল, তাই ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চলতি মাসেই তার দেশে আসা উচিত। এ সময় পুলিশ কিছুই করতে পারবে না।’ তা ছাড়া পুলিশের দুর্নীতি নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করছে। আমরা তো বিএনপি করছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবা-দাবা, ... নিয়ে থাকবা, আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’ মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও বলা হয় ওই অডিওতে।
অডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পোস্টিং পাইতেছে তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকালবেলা পোস্টিং হইতেছে। তার লজ্জা থাকা উচিত। তার চাকরি ছিল না। এখন যে পদে আছেন, সেখানে এক বছর থাকতে পারলে ১০০ কোটি টাকা এমনিতেই হবে।’ ওসি পদায়ন নিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আওয়ামী লীগের কমিশনার যারা ছিল, তারা ওসি পোস্টিংয়ে টাকা নেয় নাই। যত ওসি বেনজীরের আমলে ছিল, টাকায় কোনো সময় বদলি হয় নাই।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের অডিও ফাঁস নিয়ে ঊর্ধ্বতনরা বিব্রত। ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি ছাড়াও আরও একাধিক কর্মকর্তার ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। ইন্সপেক্টর রাকিবুলের অডিও ফাঁসের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তারা রাকিবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তিনি কাকে কোটি টাকা দিয়েছেন তাকে আমরা খুঁজছি। কোন উদ্দেশ্য তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বেশি।
সদর দপ্তরের ওই কর্মকর্তা বলেন, এই ধরনের অডিও ফাঁসে পুলিশে অস্বস্তি আছে। এই নিয়ে ঊর্ধ্বতনরা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। মোবাইলে কথাবার্তায় আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা ইউনিটকে ঘিরে অডিও ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সামগ্রিক ভাবমূর্তি, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মনোবল এবং সাধারণ মানুষের আস্থার ওপরও পড়ে। এসব ঘটনায় পুলিশের কেউ কেউ শাস্তির আওতায় আসার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাকিবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনার পেছনে অন্য কেউ সম্পৃক্ত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাকিবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফেসবুকে এ ধরনের তথ্য দেওয়া নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ওসি রাকিবুল কেন এমন ঝুঁকি নিলেন, নাকি তিনি কোনো অপকৌশলের শিকার হলেন এ বিষয়সহ তার অতীত কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক করা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গুলশানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের ঘটনায় গুলশান বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে ও থানার সাবেক ওসি দাউদ হোসেনের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।