গণতন্ত্র বিক্ষোভের মাধ্যমেই টিকে আছে

আপডেট : ০১ মে ২০২৪, ১২:১৬ এএম

২৭ এপ্রিল ছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের ৩০তম বার্ষিকী। ত্রিশ বছর আগে আমরা সবাইকে সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতির লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিলাম। এবারের এই দিবসটি উদযাপনের মাত্র এক মাস পর আগামী ২৯ মে দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের প্রতিটি নির্বাচন বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে এলেও এবারের নির্বাচনের বিশেষ অর্থ রয়েছে। গত তিন দশকের অনেক সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরা কী শিখেছি এবং কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি, তা প্রতিফলিত করার সুযোগ হবে এবারের নির্বাচন ও নির্বাচনপরবর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দিয়ে। প্রকৃতপক্ষে গত ত্রিশ বছরে আমরা শিখেছি, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফল শুধু ভোটের ওপর নয়; বরং মানুষ তাদের নেতাদের বিপক্ষে সমবেত হয়ে কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে কি না ইত্যাদির ওপরও নির্ভর করে।

জনশক্তির কার্যকারিতা

দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো বহু জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন শুরু হয় ২৬ এপ্রিল, ১৯৯৪ সালে। উক্ত নির্বাচনে ভোটাররা শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসনের অবসান ঘটিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলাকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে। নির্বাচনটি মানবাধিকার, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং আরও অনেক কিছুতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে ২৭ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা দিবসে পরিণত হয় এবং বর্ণবৈষম্যের বিলুপ্তি উদযাপনের জন্য দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়।

তথাপি বহুজাতি ও বহুদলীয় নির্বাচন বর্ণবাদের প্রভাব পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি। নিপীড়নের কালো দাগ এখনো কোথাও কোথাও রয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলা যায়। পরবর্তী সরকারগুলো গত ত্রিশ বছরে এর সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতিও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। মৌলিক সেবা ও নাগরিক অধিকারের ব্যবস্থাপনা এখনো অপর্যাপ্ত।

আমাদের স্মৃতিতে এখনো সেই সব দিন ভাসে, যখন বর্ণবিদ্বেষী পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে কৃষ্ণাঙ্গদের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে হতো, শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্যই সমুদ্র উপকূলের অধিকার দেওয়া হতো। আরও মনে পড়ে একটি নির্দিষ্ট রাস্তায় হাঁটা, কালো, রঙিন এবং ভারতীয় পরিবারের বাড়িগুলো বর্ণবাদী শাসন কর্র্তৃক গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সাদা প্রতিবেশীদের জন্য পথ তৈরির জন্য। আজ অবধি আবাসন বৈষম্য এখনো অনেকাংশে জাতিগত বৈষম্যের মধ্যেই পড়ে। এ বাস্তবতার অর্থ হলো, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গত ত্রিশ বছর ধরেই অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকানরা ব্যালটের মাধ্যমে নয়; বরং প্রতিবাদের মাধ্যমে অনেক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এবং ২০০০ সালের শুরুর দশকে চিকিৎসা অ্যাকশন ক্যাম্পেইনে জনগণ সমবেত হয়েছিল। যা সরকারকে এইচআইভি ছড়ানোর বাস্তবতা স্বীকার করে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ সরবরাহ করতে বাধ্য করে। কারণ, তখন এইডস মহামারী আমাদের জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।

২০০৫ সালে বর্ণবাদী শাসনের অধীনে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত এবং সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত ভূমিহীন লোকদের জন্য আবাসন অধিকারের দাবিতে অনানুষ্ঠানিক বসতিতে একদল বাস্তুচ্যুত বস্তির বাসিন্দারা একটি তৃণমূল সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে। স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষকে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা থেকে নিবৃত্ত করতে গোষ্ঠীটির প্রতিবাদী কৌশল এতটাই সফল হয়েছিল যে, সংগঠনটিতে বর্তমানে ১ লাখেরও বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন অধিকারকে মেনে নিতে বাধ্য করেছে।

আমাদের প্রতিবাদ সংস্কৃতি বর্ণবাদী বছরসমূহের জাতিগত উত্তরাধিকার। বর্ণবৈষম্য এখনো শেষ হয়নি। কারণ ক্ষমতায় থাকা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা একটা মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছিল। জনগণ পরিকল্পিত ও সম্মিলিতভাবে অবিরাম প্রতিবাদের মাধ্যমে এ মনস্তত্ত্বকে দুর্বল করেছে। সে ঐতিহ্য আজও চলমান। কিন্তু আমাদের এত প্রতিবাদের পেছনের প্রধান কারণ সহজ জনশক্তি আমাদের নিয়ামক। কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট ভাইজা মিয়ার ভাষায়, ‘প্রকৃত প্রতিবাদই একমাত্র ভাষা, যা সরকার বোঝে।’

বর্ণবৈষম্যের অধীনে কোনো ‘সুশীল সমাজ’ ছিল না। ছাত্র থেকে ট্রেড ইউনিয়ন, সংগীতশিল্পী থেকে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট সবাই সংগ্রামে যোগ দেয়। যা দেখায় যে কীভাবে রাষ্ট্র এবং বেসরকারি খাত ব্যর্থ হলে দক্ষিণ আফ্রিকানরা সহজাতভাবে একত্র হয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে। তবু দক্ষিণ আফ্রিকার অনেকেই আজও যে ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো বিভ্রম নেই।

আমাদের গণতন্ত্রের অধীনে এখানে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ সালের মেরিকানা গণহত্যার কোনো বিচার এখনো হয়নি। সেদিন সামান্য বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক ডজন প্লাটিনাম খনি শ্রমিককে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। ২০১৬ সালে দেড় শতাধিক রোগীর মৃত্যুর এখনো কোনো বিচার হয়নি। গাউতেং প্রদেশে নিম্নমানের মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে উক্ত রোগীদের স্থানান্তরিত করার পর তারা অবহেলা এবং অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল।

আমাদের গণতন্ত্র জাতীয় পর্যায়ে কার্যকরভাবে একদলীয় শাসন তৈরি করেছে। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) সেই ১৯৯৪ সাল থেকে টানা ছয়টি নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। যদিও এএনসি-র বারবার নির্বাচনে বিজয় লাভের কিছু ভালো কারণ রয়েছে। যেমন, বর্ণবাদের যুগে ফিরে যাওয়ার ভয় এবং রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র পরিচালনার জন্য অন্যান্য দলের সক্ষমতার বিষয়ে উদ্বেগ। সবকিছুর পর দক্ষিণ আফ্রিকার গণতন্ত্র একাধিক কার্যকর জাতীয় দলের অনুপস্থিতিতে ভুগছে এবং তা অস্বীকার করার কিছু নেই।

পরিবর্তনের হাওয়া

মে মাসে এএনসি প্রথমবারের মতো গুরুতর জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হবে। যার মধ্যে গণতান্ত্রিক জোট, বামপন্থি অর্থনৈতিক মুক্তিকামী যোদ্ধা এবং জুমার নতুন এমকে পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হবে। এটিকে দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচনী গণতন্ত্রের পরিপক্বতার চিহ্ন হিসেবে নেওয়া যায়। এবং এটা বলাও যথার্থ যে, প্রতিবাদ এবং নাগরিক সংগঠিত শক্তিই আমাদের এই মাইলফলক পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।

তাই বর্ণবৈষম্যের অবসান এবং গণতন্ত্রের সূচনার ত্রিশতম বার্ষিকী এবং মে মাসের নির্বাচনে দক্ষিণ আফ্রিকানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পটভূমি সম্পর্কে চিন্তার প্রচুর উপাদান রয়েছে।

সাফিয়া খান : অধিকারকর্মী এবং জোহানেসবার্গভিত্তিক সুশীল সমাজের বৈশ্বিক জোট সিভিকাসের সদস্য

ট্যারিন বুয়সেন : অধিকারকর্মী এবং জোহানেসবার্গভিত্তিক সুশীল সমাজের বৈশ্বিক জোট সিভিকাসের সদস্য

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মাদ ফজলে রাব্বি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত