ব্রাজিলের গরু নিয়ে দোটানা

আপডেট : ০১ মে ২০২৪, ০৬:১৫ এএম

কোনোভাবেই গরুর মাংসের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সরকার। বারবার গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করা হলেও ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। এতে গত এক দশকে দাম দেড়শ গুণ বেড়েছে। অথচ দেশে গরুর ঘাটতি তো নেই-ই, বরং উদ্ধৃত আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাম না কমানো হলে বিদেশ থেকে মাংস আমদানি করা হবে। ব্যবসায়ীরা বারবার আশ্বাস দিলেও গরুর মাংসের দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। সাধারণ ক্রেতার কথা মাথায় রেখে সরকার মাংস আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে। ব্রাজিলের সঙ্গে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে আলোচনাও চলছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে সরকার পড়েছে দোটানায়। আমদানি করলে খামারিরা লোকসানে পড়বেন। অন্যদিকে ভোক্তার সুবিধা নিয়েও ভাবছে সরকার।

এখনো গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর উৎসবে তা ৮০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তাই সাধারণ ক্রেতার কথা মাথায় রেখে সরকার আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গরুর মাংস রপ্তানিতে বিশ্বের বড় দেশ ব্রাজিল গরুর মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশকে। গত ৭-৮ এপ্রিল ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরার ঢাকা সফরেও এটি আলোচনায় প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এতে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। ব্রাজিলের পক্ষ থেকে মাংস রপ্তানির কথা বলা হলেও ঢাকার পক্ষ থেকে গরু আমদানির ওপর জোর দেওয়া হয়। আসন্ন ঈদুল আজহার আগেই গরু কোরবানির বিষয়ে বাংলাদেশকে প্রস্তাব করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত আলোচনা চূড়ান্ত হয়নি। আবার আলোচনা শেষও হয়ে যায়নি।

এদিকে দেশে গবাদি পশুর উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকার পরও বিদেশ থেকে গরুর মাংস বা আসন্ন কোরবানি ঈদ সামনে রেখে ব্রাজিল থেকে গরু আমদানির বিষয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, মাংসের চাহিদা সরবরাহে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। আসন্ন কোরবানির ঈদ ঘিরে গত এক বছর ধরেই খামারিরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। চাহিদার চেয়ে বেশি গবাদি পশু রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গরু আমদানি করলে দেশের খামারিরা লোকসানে পড়বেন এবং এই খাতটি ধীরে ধীরে আমদানির নির্ভর খাতে পরিণত হবে। ব্রাজিল থেকে গরু বা মাংস না এনে তাদের গরুর জাতগুলো বাংলাদেশে এনে খামারিদের সরবরাহ করলে মাংসের দাম কমানো সম্ভব।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার সঙ্গে দেশটির ডেইরি খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সফরের পর থেকেই এ নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে বলা হয়েছে, তারা এই মুহূর্তে বিদেশ থেকে গরু বা মাংস আমদানিতে রাজি নয়।

বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু দেশ রূপান্তরকে বলেন, গরুর মাংস আমদানির সিদ্ধান্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের, এটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধু মাংস আমদানি করলেই হবে না, অনেক বিষয় মাথায় রাখতে হবে। দেশের খামারিদের বিষয় মাথায় রাখতে হবে। তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করতে হবে। তবে গরুর মাংসের দাম ভোক্তাদের নাগালের বাইরে থাকাও চিন্তার বিষয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা হচ্ছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসন্ন কোরবানির ঈদের জন্য পর্যাপ্ত গবাদি পশু রয়েছে। আমদানির কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত গবাদি পশু থাকার পরও আমদানি করা হলে দেশের খামারিদের ক্ষতি হবে। বরং কোরবানির গবাদি পশুর দাম যেন না বাড়ে সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। এবার ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি গবাদি পশুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকার পরও কেন ব্রাজিল থেকে আমদানির বিষয় আসছে এ প্রশ্নে আবদুর রহমান বলেন, কোনো সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এটা করতে চায়। গবাদি পশুর বাজার যেন স্থিতিশীল থাকে, দাম যেন মানুষ ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে সে বিষয়গুলো নিয়ে প্রস্তুতিমূলকভাবে খামারিদের সঙ্গে কথা বলেছি।

প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, খামারিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বাইরে থেকে গরু আমদানির সিদ্ধান্ত আমাদের নিই। দেশের খামারিরা গবাদি পশু উৎপাদন করেন। নিজের উৎপাদিত গবাদি পশু দিয়েই কোরবানি হবে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের ব্রাজিল থেকে গরু বা মাংস কোনোটারই আমদানির দরকার নেই। কোরবানির ঈদ ঘিরে খামারিরা প্রস্তুতি নিতে থাকেন এক বছরের থেকে। এবারও আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে রেখে খামারিদের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। কোরবানির ঈদের মাস দেড়েক আগে ব্রাজিল থেকে গরু আমদানির বিষয়টি খামারিদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। যদি কোরবানির আগে ব্রাজিলের গরু দেশে ঢোকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন খামারিরা। বরং দামের কথা যদি সরকার চিন্তা করে তাহলে ব্রাজিলের কাছ থেকে আমরা প্রযুক্তি সহায়তা নিতে পারি। তাদের গরুগুলোর জাত যদি আমরা এখানে আনতে পারি তাহলে আমরাও ভোক্তাদের কম দামে মাংস দিতে পারব। কারণ তাদের একটা গরু পাঁচ কেজি খাবার খেয়ে যে মাংস দেয় আমাদের গরুকে ১৫ কেজি খাবার দিতে হয় সেই পরিমাণ মাংস উৎপাদন করতে হলে। এ ছাড়া আমাদের গো-খাদ্যের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিপণন খরচ যেন কমানো যায় তার ওপর নজর দিতে হবে। তাহলে মাংসের দাম কমে যাবে।

এ খামারি বলেন, উচ্চমূল্যের দানাদার খাবারের বদলে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত ও উচ্চ ফলনশীল সমৃদ্ধ ঘাস উৎপাদন, খামারিদের টেকনিক্যাল ট্রেনিং, চামড়ার দাম বাড়ানো, গো-হাটের খাজনা কমানো, ফার্মার মার্কেট তৈরি করে ভোক্তার সুবিধা এবং খামারিদের দিকে নজর দিতে হবে। আমদানি করা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেয়াজুল হক বলেন, গরুর মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রতি ঈদে অবিক্রীত থাকে কয়েক লাখ গরু। গত কোরবানিতে ২০ লাখ বড় পশু অবিক্রীত থাকে। এ ক্ষেত্রে লুকানোর কিছু নেই। কাজেই আমদানির সুযোগ নেই।

গরুর মাংস আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মতো আয়ের দেশগুলোর নেই এ তালিকায়। শীর্ষ ১৫ আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, হংকং, জার্মানি, ভিয়েতনাম, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, মিসর, তাইওয়ান ও চিলি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত