সদ্য শেষ হওয়া এপ্রিল মাসের প্রথম দিন থেকে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে। সেই তাপপ্রবাহ মৃদৃ থেকে অতি তীব্রতেও পৌঁছেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় গরমের মাত্রা ছাড়িয়েছে অতীতের সব রেকর্ড। ঘুরেফিরে প্রায় প্রতিদিনই চুয়াডাঙ্গা বা যশোরে হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। গতকাল মঙ্গলবার এপ্রিলের শেষ দিনে যশোরে রেকর্ড হয়েছে দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। এদিন চুয়াডাঙ্গায় ছিল রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গতকাল যশোরে রেকর্ড হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর চুয়াডাঙ্গায় ছিল ৪৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিকভাবে মহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের প্রবেশদ্বার যশোর ও চুয়াডাঙ্গার কাছাকাছি এলাকাগুলো। ফলে ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানকার আবহাওয়া চরম হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। এটিই এখন পর্যন্ত দেশের নথিভুক্ত ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। এরপর ১৯৯৫ সালের পহেলা মে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওই বছরের ২৫ এপ্রিল তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৩ ডিগ্রি। আর ২০১৪ সালের ২১ মে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা উঠেছিল ৪৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, বাংলাদেশে গরম হাওয়াটা প্রবেশ করে যশোর, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী হয়ে। এটা দিল্লি থেকে শুরু হয় উত্তর প্রদেশ ও বিহার হয়ে দেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে প্রবেশ করে। ফলে এসব জায়গায় তাপমাত্রা বেশি হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের একটি কারণ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, কয়েক বছর ধরে এপ্রিলে দেশের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ থাকছে। আর প্রতি বছরই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা আগের বছরের রেকর্ড ভাঙছে। এপ্রিলে বাংলাদেশের ইতিহাসে টানা তাপপ্রবাহের রেকর্ড ভেঙেছে। আবার ওই মাসের গড় তাপমাত্রাও আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে।
দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যশোরে : চলতি মৌসুমে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়ায় রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে, যা জেলাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আর দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। ১৯৭২ সালের ১৫ মে সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল রাজশাহীতে।
খুলনা বিভাগীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দুই সপ্তাহ ধরেই যশোরে তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। কয়েক দিন থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বিরাজ করেছে।
সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড চুয়াডাঙ্গায় : টানা ১৪ দিন ধরে তীব্র থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গায়। এবার জেলার ইতিহাসে স্মরণকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। গতকাল এ জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ১৯৯৫ সালে ৪৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। এরপর চুয়াডাঙ্গায় আঞ্চলিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার স্থাপনের পর ২০১৪ সালে ৪৩ দশমিক ২ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২০২৩ বছরের ১৯ ও ২০ এপ্রিল ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে ২০১৫ সালের ২২ মে ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৬ সালের ১১ ও ২২ এপ্রিল ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৮ সালের ১৮ জুন ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০২২ সালের ২৪ ও ২৫ এপ্রিল মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এদিকে আবহাওয়ার সুখবর দিয়ে চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, বুধবার থেকে (১ মে) তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। ৫ মে’র পর চুয়াডাঙ্গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
ইতিহাসের উষ্ণতম এপ্রিল : চলতি মৌসুমে এপ্রিলের প্রথম দিন থেকেই তাপপ্রবাহ শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যনুযায়ী, এর আগে ২০১৪ সালে টানা ২৬ দিন টানা তাপপ্রবাহ ছিল। ২০১৬ সালে তাপপ্রবাহ ছিল ২৫ দিন। এ ছাড়া গত বছর ২০২৩ সালে ১৩ এপ্রিল থেকে ৫ মে টানা ২৩ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, রাজশাহী, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাগুলোর ওপর দিয়ে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ যাচ্ছে এবং সেটি অব্যাহত থাকতে পারে।
এ ছাড়া টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর এবং খুলনা জেলাগুলোর ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যত্র মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
ভুল পরিকল্পনায় নগরগুলো এখন হিট আইল্যান্ড : বর্তমানে নগরীগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চেয়ে অনুভবের মাত্রা বেড়েছে। যার মূল কারণ ভুল নগর পরিকল্পনা। ফলে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য নগরীর বিভিন্ন এলাকা উত্তপ্ত দ্বীপের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তাপীয় দ্বীপ বা ‘হিট আইল্যান্ড’-এ রূপান্তরিত হয়েছে। গতকাল ‘নগর তাপদাহের তীব্রতা : দায় কার? করণীয় কী?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন এসব কথা বলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহসভাপতি ইকবাল হাবিব।
তিনি বলেন, বর্তমানে নগরীর এমন পরিস্থিতির পেছনে দায় আমাদের, সরকারের, সরকারের যন্ত্র ও ব্যক্তিগত লোভ। ঢাকার বিভিন্ন খালের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থল ভরাট করে ফেলেছে, নদী ও খালের সঙ্গে সংযোগ থাকা জরুরি। প্রয়োজনে নদী ও খালের সংযোগের জমি অধিগ্রহণ করা হোক। মাত্র কয়েক হাজার মানুষের জন্য কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে না।
বাংলাদেশে বনজ সম্পদ ও বনভূমির পরিমাণ ক্রমেই কমছে উল্লেখ করে ইকবাল হাবিব বলেন, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশে ভূখণ্ডের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের বন বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
তিনি জানান, ৯০ শতকের প্রায় ৩৬ শতাংশ বৃক্ষশোভিত ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় গাছ রয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ (ইউএস এইড জরিপ, ২০২২) এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ শতাংশেরও কম। গত ২৮ বছরে শুধু রাজধানী ঢাকা থেকেই প্রায় ৮৫ ভাগ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি এ সময়ে নির্মাণ এলাকা বা স্থাপনা বেড়েছে ৭৫ ভাগ অর্থাৎ সবুজ গাছপালা এবং জলাশয় ধ্বংস করে কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে।
বাপার সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করেন না। রাজনীতিবিদদের দেশের সবুজায়ন নিয়ে আরও সচেতন হওয়া জরুরি। দেশে বিপরীতমুখী উন্নয়ন চলছে, যা দেশ ও জনগণের জীবনের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হিট স্ট্রোকে গত ৯ দিনে ১১ জনের মৃত্যু : গরমের এমন পরিস্থিতির মধ্যে হিট স্ট্রোকে গত ৯ দিনে ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যদিও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। গত সোমবার পর্যন্ত হিট স্ট্রোকে ২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে দেশ রূপান্তরের কাছে। এ ছাড়া গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থান দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যনুযায়ী, পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নাটোরে হিট স্ট্রোকে মো. খাইরুল ইসলাম (৫০) নামে এক সৌদি প্রবাসী মারা গেছেন। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের উজানপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে হিট স্ট্রোকে মুনছের আলী নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। ১০৩ বছর বয়সী এ ব্যক্তি বাড়ির পাশের বাজার থেকে হেঁটে বাড়িতে পৌঁছলে বেলা ১১টার দিকে প্রচ- তাপমাত্রার কারণে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সাড়ে ১১টায় বাড়িতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
হিট স্ট্রোকে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার পৃথক স্থানে কৃষকসহ দুই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে জমি কেনাবেচার কাজে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আব্দুল বাতেন মাঝি মারা যান। এ ছাড়া পৌরসভার মোল্লারচর এলাকায় জমিতে কাজ করতে গিয়ে মারা যান ওমর আলী।
গতকাল সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ ইউনিয়নের চর তারাবাড়িয়া গ্রামে সকালে ধানের জমিতে কাজের সময় জিল্লুর রহমান (৩৫) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। তিনি ওই গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে।