গাজায় সর্বনাশ সিসির বন্ধুর পৌষমাস!

আপডেট : ০৫ মে ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

ইসরায়েলের নির্মম হামলা থেকে পালিয়েও স্বস্তি নেই ফিলিস্তিনিদের। মিসরেও তারা নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

গাজায় ইসরায়েলের নির্মম হামলায় অনেকে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে মিসরে। সীমান্ত পার হওয়ার সময় অসহায়, বিধ্বস্ত গাজাবাসীকে দিতে হয় অর্থ। যার পরিমাণ দিনে প্রায় দুই মিলিয়ন। আর এ অর্থ দিতে হচ্ছে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানকে। এর আগেও বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তখন মিসরের কর্র্তৃপক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করে। তবে দুদিন আগে ‘মিডল ইস্ট আই’ এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

তারা জানায়, পালিয়ে আসা ফিলিস্তিনিদের থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার উপার্জন করছে প্রভাবশালী মিসরীয় ব্যবসায়ী এবং প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির বন্ধুর মালিকানাধীন কোম্পানি। সিনাইয়ে জাতি নেতা এবং ব্যবসায়ী টাইকুন ইব্রাহিম আল-অরগানির মালিকানাধীন ওই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘হালা কনসাল্টিং অ্যান্ড ট্যুরিজম সার্ভিসেস’। তারা মিসরে আসা প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনিদের থেকে কমপক্ষে পাঁচ হাজার এবং ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ২৫০০ ডলার আদায় করছে।

এ অভিযোগ ওঠে আরও আগে। যদিও মিসর সরকার এ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে। চলতি বছরের শুরুর মাসে এক বিবৃতিতে তারা এ ধরনের কোনো কার্যকলাপের বিষয়ে অভিযোগ থাকলে জানানোর অনুরোধ করে। এর আগে গার্ডিয়ান প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসর সরকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রাফাহ ক্রসিং পার হওয়ার সময় ফিলিস্তিনিদের থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে।

দিনে দুই মিলিয়ন

মিডল ইস্ট আই জানাচ্ছে, রাফাহ ক্রসিংয়ে পরিষেবা দেওয়ার একচেটিয়া অধিকার রয়েছে সিসি-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী আল-অরগানির প্রতিষ্ঠানের। সংক্ষেপে এ প্রতিষ্ঠানকে হালা বলা হয়। গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল হামলা শুরু করলে গাজা থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই ফিলিস্তিনিদের জন্য। গাজা থেকে বের হতে তাদের রাফাহ এবং মিসরের সিনাই মরুভূমির মধ্যবর্তী অংশ পার হতে হয়। যদিও সীমান্তটি সরাসরি মিসর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখানে ইসরায়েলেরও প্রভাব রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যম সূত্রে আগেই জানা যায়। মিডল ইস্ট আই জানাচ্ছে, শুধু গত তিন মাসে সংস্থাটি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ছেড়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে ন্যূনতম ১১৮ মিলিয়ান ডলার বা পাঁচ দশমিক ছয় বিলিয়ন মিসরীয় পাউন্ড উপার্জন করেছে বলে অনুমান। তারা এপ্রিল মাসে ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে আদায় দ্বিগুণ করেছে। গড়ে দৈনিক অর্থ আদায় দুই মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। গত মাসে কোম্পানিটি প্রায় ১০ হাজার ১৩৬ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২৯১০ শিশুর কাছ থেকে কমপক্ষে ৫৮ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছে। এপ্রিল মাসে দৈনিক গড়ে দুই মিলিয়ন অর্থ আদায় করেছে, যা মার্চ মাসের দিগুণ। এপ্রিলে শরণার্থী ফিলিস্তিনিদের থেকে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে গত সপ্তাহের মঙ্গলবার। এ দিন ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের কাছ থেকে কমপক্ষে দুই দশমিক তিন মিলিয়ন অর্থ আদায় হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে এ বছরের শেষ নাগাদ কোম্পানিটি অর্ধ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করতে পারে। অর্থ আদায়ের জন্য একটি তালিকা করা হয়। এ তালিকা প্রস্তুতিতে আবার ইসরায়েলের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ। যুক্তরাজ্যের সাবেক এমপি রিচার্ড বার্ডেন মিডল ইস্ট আইতে এক লেখায় এ তথ্য জানিয়েছিলেন।

ফেব্রুয়ারির আগে ফিলিস্তিনিদের গাজা ছেড়ে যেতে প্রাপ্তবয়স্কপ্রতি ১১ হাজার ডলার পর্যন্ত চার্জ করে হালা। যুদ্ধের আগে তারা রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজা থেকে বের হতে জনপ্রতি ৩৫০ ডলার চার্জ করেছিল। সে হিসাবে ফিলিস্তিনিদের থেকে হালার লাভ ফেব্রুয়ারিতে কমপক্ষে ২১ মিলিয়ন, মার্চ মাসে ৩৮ দশমিক পাঁচ এবং এপ্রিলে ৫৮ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। মিসরের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত দিয়াব আলোহের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ফিলিস্তিনি মিসর হয়ে গাজা ছেড়ে পালিয়েছে।

অরগানি

তবে হালা এবং অরগানির অন্যান্য সংস্থার আয় সাধারণত তদারকি করা হয় না। মিসরীয় লেখক এবং সিনাই বিশেষজ্ঞ মোহান্নাদ সাবরি বলেন, এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, মিসর উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের থেকে অর্থ আদায়ে অরগানিকে থামাতে কিছু করছে না। অরগানির ব্যবসায়িক কার্যকলাপের সমস্যা হলো এটি মিসরীয় সামরিক বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং একটি বৃহত্তর, অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। অরগানি মিসরের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর একজন মিত্র এবং ব্যাপকভাবে সিনাই উপদ্বীপের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সিসি অরগানিকে সিনাই ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা যার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ওই এলাকার উন্নয়ন ও নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর।

তবে মিসর বারবার অভিযোগ অস্বীকার করেছে যে, তারা ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা থেকে মুনাফা করছে। ফেব্রুয়ারিতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ শউকরি জানান, তার সরকার হালা কর্র্তৃক নেওয়া ‘ক্রসিং ট্রান্সফার ফি’ প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেছিলেন, তার সরকার ইতিমধ্যেই এটি খতিয়ে দেখছে এবং যে কেউ এ ধরনের কার্যকলাপে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তারপরও হালা ফিলিস্তিনিদের থেকে অর্থা আদায় অব্যাহত রেখেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিনিয়র গবেষক আমর ম্যাগডি বলেন, রাফাহ দিয়ে চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর মিসরের বিধিনিষেধ বহু বছর ধরে চলে আসছে। মিসরীয় কর্র্তৃপক্ষের উচিত হালা কোম্পানির চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা।

মিসরের সিনাই উপদ্বীপে একটি চেকপয়েন্টে তার ভাই এক পুলিশ অফিসারের হাতে নিহত হলে কয়েক ডজন পুলিশ অফিসারকে অপহরণ করেন অরগানি। এরপর তিনি জেলে ছিলেন প্রায় দুই বছর। তখন মিসরে হোসনি মোবারকের শাসনামল। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে অরগানির প্রভাব বাড়ে। বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী অরগানি প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি এবং মিসরীয় সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন হিসেবে বিবেচিত। তিনি নির্মাণ, খনি খনন, ভ্রমণ, আতিথেয়তা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় বিস্তৃত একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মালিক। ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ছিটমহলের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে। তখন অরগানি তার কোম্পানির মাধ্যমে গাজা এবং মিসরের মধ্যে মানুষ ও পণ্য চলাচলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেন।

উপকার মেলে না

তবে এ পরিমাণ অর্থ দিয়েও ফিলিস্তিনিরা মিসরে ঢুকে কোনো উপকার পায় না। এ বিষয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে মিডল ইস্ট আই। তারা জানায়, মিসরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা চিকিৎসা, শিক্ষাসহ কোনো সুবিধা পায় না। ওই প্রতিবেদনে তিন সন্তানের জনক ৪২ বছর বয়সী হামিদ মিসরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন ১৭ হাজার পাঁচশ ডলার ‘সমন্বয় ফি’ দিয়ে। মিসরে তার প্রবেশের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে সেই ‘হালা ট্র্যাভেল এজেন্সি’। তাকে এ শর্তে অস্থায়ী ভিসা দেওয়া হয় যে, তিনি আবাসিক ব্যবস্থার জন্য আবেদন করতে পারবেন না বা শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধন করতে পারবেন না। ফলে হামিদ তার সন্তানদের মিসরের স্কুলে ভর্তি করাতে পারেননি এবং তিনি নিজেও কাজ পাননি। তার মন্তব্য, আমাদের জীবনযাত্রার অবস্থা ভয়ংকর। আমি সমস্ত সঞ্চয় খরচ করছি এবং শুধু আশা করছি যে, আমার অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এই যুদ্ধ শেষ হবে। হামিদ বলেন, গাজার অন্যান্য ফিলিস্তিনি যাদের তিনি চেনেন তাদের খাবারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই।

মিডল ইস্ট আই জানাচ্ছে, গাজা থেকে আসা ফিলিস্তিনিদের বাসা ভাড়া পেতেও সমস্যা হচ্ছে। যেখানে ভাড়া কমানোর কথা সেখানে বাড়ানো হয়েছে। আবার ‘কোনো ফিলিস্তিনি নয়’ এমন সাইন বোর্ডও টানাচ্ছে মিসরের বাড়িওয়ালারা।  এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা রয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী এক মা জানান, তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে মিসরে পালিয়ে গেলেও তার স্বামী গাজায় রয়েছেন। তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে যুদ্ধের সময় আহত হয়। কিন্তু মিসরে তার চিকিৎসা করানো যায়নি, কারণ তার আঘাতকে গুরুতর হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি। ওই মা জানান, তার মেয়ের বাম পায়ে এখনো তিনটি ছুরির টুকরো রয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি মিসরের হাসপাতালে গিয়েছিলাম, তারা আমার মেয়েকে সাহায্য করতে পারে কিনা এবং ছুরির টুকরোগুলো অপসারণ করতে পারে কিনা জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করে। কারণ আমরা গাজা থেকে এসেছি। কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। মিসরে তারা কাজ খুঁজে পাচ্ছে না। কেউ কেউ অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার প্রেক্ষিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় সাত মাসে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে কমপক্ষে ৩৪ হাজার ৫৬৮ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ৭৭ হাজার ৭৬৫ জন আহত হয়। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।

বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, গাজায় অন্তত ১৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যাদের বেশিরভাগ  গাজা এলাকায় অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলা করতে করতে ইসরায়েল গাজাবাসীকে মিসরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের খুব সামান্য অংশ আশ্রয় নিতে চাইছে যুক্তরাজ্যে। তবে সেখানে তারা নানা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সাবেক এমপি রিচার্ড বার্ডেন মিডল ইস্ট আইতে লিখেছেন, গাজা থেকে আসা শরণার্থীরা ইউকে সরকারের কাছ থেকে বাধা এবং চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে। আমার পরিচিত একটি পরিবার দুই ধরনের অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত