ভোগের জীবন শেষবেলায় যাবজ্জীবন

ব্যাংকক থেকে এখনো সক্রিয়

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০৮:০১ এএম

আজিজ মোহাম্মদ ভাই নব্বইয়ের দশকে দেশের আলোচিত চরিত্র। চলচ্চিত্র ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নানা ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার গুঞ্জন মানুষের মুখে ফিরত। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যার ঘটনায় তার ‘গডফাদার’ ভাবমূর্তি যেন সবার সামনে উন্মোচিত হলো। সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের যাবজ্জীবন সাজার রায় হওয়ার পর তাকে নিয়ে আবার মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

অনেক আগেই ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই দেশ ছেড়েছেন। এখন আছেন থাইল্যান্ডে। আর তার সঙ্গে আরেক আলোচিত চরিত্র গুলশানের ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলামও দেশ ছেড়ে কানাডায়। তারও যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায়।

থাইল্যান্ড থাকলেও ঢাকায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের প্রভাব কমেনি একটুও। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে এখনো ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে। মাঝেমধ্যে বাংলাদেশেও আসেন তিনি। কিছু রাজনৈতিক নেতার সঙ্গেও আছে তার গভীর সখ্য। তার ছোট ভাই আজম খান বাংলাদেশে ব্যবসা কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় সোহেল চৌধুরীকে। ঘটনার পর সোহেলের ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন। বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে বাদানুবাদই এ হত্যাকান্ডের নেপথ্যের কারণ বলে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। ঘটনার পরপরই আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও বান্টি ইসলাম পালিয়ে যান দেশের বাইরে। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থাকেন আজিজ মোহাম্মদ ও তার পরিবার। সেখানেই ব্যবসা করেন। ব্যাংককের সুকুনদীপ এলাকায় তার বিশাল বাড়ি রয়েছে। ওই বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য বাংলাদেশি প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তাছাড়া ব্যাংককে একটি পাঁচতারকা হোটেলসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। অ্যাম্বাসাডর হোটেলে আছে মানি এক্সচেঞ্জ ও কাপড়ের দোকান। মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে হুন্ডি কারবারও চালান। কথিত রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংকক গেলে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের আতিথ্য নেন।

নাম প্রকাশ না করে ব্যাংককে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী গতকাল টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই বাংলাদেশে যেমন রাজার হালে ছিলেন, থাইল্যান্ডেও একই হালে আছেন। তিনি বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডসহ সবকিছু এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন। মাঝেমধ্যে তিনি বাংলাদেশে যান। সবাইকে ম্যানেজ করেই দেশে যান বলে তারা জানেন। বছরখানেক আগে গুলশান ১ নম্বরে ১০ কাঠার একটি জমি বিক্রি করে এসেছেন। ওই জমিটি বেচাকেনার বিষয়ে একটি গ্রুপের লোকজন থাইল্যান্ডে তার সঙ্গে বৈঠক করে গেছেন। হুন্ডি কারবারেও তার হাত আছে।

ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, প্রতিদিন রাতে অ্যাম্বাসাডর হোটেলে আসেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। ঢাকার অপরাধ জগতের অনেকেই থাইল্যান্ড এলে তার সঙ্গে দেখা করেন। চলচ্চিত্র জগতের লোকজনও দেখা করেন তার সঙ্গে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, সিঙ্গাপুরে রয়েছে তার হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা। তিনি কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক।

পুলিশ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে এ মামলার নথি গায়েব হয়েছিল। ওই নথিটি লুকানোর পেছনে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হাত রয়েছে।

কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গডফাদার বলেই আজিজ মোহাম্মদকে ‘ভাই’ সম্বোধন করতেন কেউ কেউ। সাধারণত মাফিয়া ডন বা গডফাদারদের ভাই ডাকেন তাদের অনুগতরা। যদিও আজিজ মোহাম্মদের নামের ‘ভাই’ শব্দটি মূলত তাদের বংশপদবি। তাদের পরিবারের সবারই নামের শেষে ভাই পদবি আছে। এমনকি নারীদের নামের সঙ্গেও ভাই আছে। তার বাবার নাম মোহাম্মদ ভাই। মায়ের নাম খাদিজা মোহাম্মদ ভাই। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তাদের পরিবার ভারতের গুজরাট থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে আসে। তাদের পরিবার মূলত পারস্য বংশোদ্ভূত। তারা ‘বাহাইয়ান’ সম্প্রদায়ের লোক। বাহাইয়ানকে সংক্ষেপে ‘বাহাই’ বলা হয়। উপমহাদেশের উচ্চারণে এই ‘বাহাই’ পরবর্তীকালে ‘ভাই’ হয়ে যায়। ধনাঢ্য এ পরিবার পুরান ঢাকায় বসবাস শুরু করে। ১৯৬২ সালে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের জন্ম হয় আরমানিটোলায়। পারিবারিক সূত্রে তিনি নিজেও শুরু করেন ব্যবসা। দিনে দিনে বাড়তে থাকে তার অর্থ সম্পদ। অলিম্পিক ব্যাটারি, অলিম্পিক বলপেন, অলিম্পিক ব্রেড ও বিস্কুট, এমবি ফার্মাসিউটিক্যাল, এমবি ফিল্ম ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। আবার মাদক কারবারেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

পুলিশের ওই কর্মকর্তারা বলেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই সার্ক চেম্বারের আজীবন সদস্য। ভারতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে রয়েছে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ব্যবসার পাশাপাশি নব্বইয়ের দশকে আজিজ মোহাম্মদ ভাই এমবি ফিল্মসের ব্যানারে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় আসেন। পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, মিডিয়া মালিক ও সাংবাদিকরাও তাকে সমীহ করে চলতেন। ৫০টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। দেশের বিজ্ঞাপন জগতে গ্ল্যামার আনতেও তার ভূমিকা ছিল। নিজের প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক ব্যাটারির ‘আলো আলো বেশি আলো’ বিজ্ঞাপনে মিতা নূরের ঝলমলে উপস্থিতি তখন বেশ নজর কেড়েছিল। এরশাদ সরকারের আমলে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। এরশাদ এক নারীকে পছন্দ করেন, একই নারীর প্রতি আকাক্সক্ষা ছিল আজিজের। তবে প্রিন্স আবদুল করিম আগা খানের সুপারিশে মুক্তি পান তিনি। চলচ্চিত্র নায়িকাসহ বিভিন্ন নারীর সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পর্ক নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প ছড়াতে থাকে। একজন পত্রিকা সম্পাদককেও হত্যা করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। যদিও হত্যাকান্ডকে হার্ট অ্যাটাক বলে প্রচার করা হয়। ১৯৯৬ সালে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহকে হত্যা করার অভিযোগও ওঠে আজিজ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। এ মৃত্যুকেও আত্মহত্যা বলেই প্রচার করা হয়। যদিও সালমান শাহের পরিবার দাবি করে আসছে এটি হত্যাকান্ড। সালমান শাহর স্ত্রী সামিরার সঙ্গেও আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সুসম্পর্ক আছে। ২০১২ সালে মাদক কারবারে জড়িত থাকায় তার ভাতিজা, ইয়াবা সম্রাট বলেখ্যাত আমিন হুদার ৭৯ বছরের জেল হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত