চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী খুন হয়েছিলেন ২৫ বছরের বেশি আগে। এ দীর্ঘ সময়ে আলোচিত এ মামলা নিয়ে নানা ঘটনা পর বিচারিক আদালত গতকাল বৃহস্পতিবার রায় দিয়েছে। রায়ে বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, গুলশানের ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম ও আদনান সিদ্দিকীসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। একই সঙ্গে দ-িতদের ২ লাখ টাকা করে অর্থদ- অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক অরুনাভ চক্রবর্তী এ রায় দেন।
ট্রাম্পস ক্লাবের আরেক মালিক আশিষ চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনসহ ছয়জনকে খালাস দিয়েছে আদালত।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ তিনজনই পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারির নির্দেশনা এসেছে। খালাসপ্রাপ্ত ছয়জনের মধ্যে ইমন ছাড়া অন্য পাঁচজন পলাতক। এ মামলাসহ অন্য মামলায় কারাগারে থাকা ইমনকে রায়ের আগে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। খালাসপ্রাপ্ত অন্য ব্যক্তিরা হলেন সেলিম খান, হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ওরফে বস লিটন, আদনান সিদ্দিকী, তারিক সাঈদ মামুন ও ফারুক আব্বাসী।
মামলার ৩৪ সাক্ষীর মধ্যে ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি শেষ হয়। এরপর হয় সাক্ষীদের বক্তব্যের ওপর যুক্তিতর্কের শুনানি। গত ২৯ এপ্রিল যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৯ মে ধার্য করেছিলেন বিচারক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে সাক্ষীদের পক্ষপাতদুষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে। আদালত বলেছে, ‘সাক্ষীরা গা বাঁচিয়ে সত্য গোপনের চেষ্টা করেছেন।’ একই সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধের জেরেই এ চিত্রনায়ক খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে রায়ে উল্লেখ করে বিচারক বলেন, ‘মামলাটি দীর্ঘদিনের পুরনো। মানুষ অসীমকাল বিচারের অপেক্ষায় থাকতে পারে না।’
এদিকে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, নানা প্রতিবন্ধকতায় এ মামলাটি পরিচালনা করতে হয়েছে। যে কারণে বেশিরভাগ আসামি খালাস হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে পর্যালোচনা করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
যেভাবে খুন হন সোহেল চৌধুরী : মামলার নথি ও সাক্ষীদের বক্তব্য অনুযায়ী, চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ওই সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পারভিন সুলতানা দিতিকে (ইতিমধ্যে প্রয়াত)। বিয়ের কিছুদিন পর তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। এর জেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সোহেল চৌধুরী। একপর্যায়ে অন্ধকার জগতে পা ফেলতে শুরু করেন তিনি। সেই অন্ধকার জগতের অপরাধীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব ও বিরোধ। এর রেশ ধরেই অবসান ঘটে তার জীবনের। সাক্ষীদের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, সোহেল চৌধুরী যে বছর খুন হন (১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর), সেই বছরের ২৪ জুলাইয়ের একটি ঘটনা কেন্দ্র করে মূলত আজিজ মোহাম্মদ ভাই, তার আত্মীয় ও ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম, বান্টির বন্ধু আশীষ রায় চৌধুরীর সঙ্গে তার বিরোধের শুরু। বনানীর আবেদীন টাওয়ারে ট্রাম্পস ক্লাবে যাওয়া-আসা ছিল সোহেল চৌধুরীর। ওই রাতে সেখানে উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনা নিয়ে তাদের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সোহেলের এক বন্ধু কালা নাসির আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে গুলি করতে উদ্ধৃত হন। এ ঘটনার পর থেকে ওই ক্লাবে সোহেল চৌধুরীর প্রবেশে একপ্রকার নিষেধাজ্ঞা ছিল। এ ছাড়া ওই ক্লাবে আসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসল্লিদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন সোহেল চৌধুরী। এটিও বিরোধ ও দ্বন্দ্বের একটি বড় কারণ। একপর্যায়ে তাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন আসামিরা।
সোহেল চৌধুরীর মা নূরজাহান বেগম আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে বলেছেন, হত্যার ১৫ দিন আগে তার ছেলেকে টেলিফোনে হুমকি দেওয়া হয়।
অন্য এক সাক্ষীর বক্তব্যে জানা যায়, ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে সোহেল চৌধুরী ওই ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে রাত ৩টার দিকে আবার তিনি কয়েকজনকে নিয়ে ক্লাবের সামনে আসেন। একপর্যায়ে তাকে গুলি করা হয়। গুলি তার পেটে বিদ্ধ হয়। দুর্বৃত্তদের গুলিতে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে থাকা নীরব ও দাইয়ান নামে আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন। গুলির ঘটনার পর সন্ত্রাসী ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক গাড়িতে করে পালিয়ে যান। নায়ক খুনের এ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি তখন দেশ জুড়ে আলোচনায় আসে।
বিচারকাজ স্থগিত ছিল দীর্ঘ সময় : হত্যার ঘটনায় সোহেল চৌধুরীর ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী রাজধানীর গুলশান থানায় হত্যা মামলাটি করেন। তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সহকারী কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। এর দুই বছর পর মামলাটি দ্রুত বিচারের জন্য ঢাকার ২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ওই সময় আসামিদের মধ্যে একজন হাইকোর্টে রিট আবেদন দাখিল করেন। হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বর ওই রিট আবেদনে প্রথমে তিন মাসের জন্য বিচারিক আদালতে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল দেয়। এরপর ২০০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।
দীর্ঘদিন পর ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করে রায় দিলে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়। এরপর বিচারিক আদালতে পুনরায় মামলার বিচার শুরু হয়। তবে ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে এ মামলার নথির হদিস মিলছে না বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিষয়টি গড়ায় হাইকোর্টে। এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার নথি খুঁজে বের করতে নির্দেশসহ রুল দেয়। অভিযোগের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন প্রশ্নে এ রুল দেয় হাইকোর্ট। তবে এর দুই সপ্তাহের মধ্যে বিচারিক আদালতে নথি চলে আসার পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ মামলার আসামি আশিষ চৌধুরীর জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানিতে গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। তবে নির্ধারিত সময়ে বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় ওই বছরের ১৩ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের কাছে কৈফিয়ত চেয়ে তলব করে আপিল বিভাগ। ব্যাখ্যা দেওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে নির্দেশ দেয় আদালত।
‘সাক্ষীরা ছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট’ : চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার সাক্ষীরা তাদের জবানবন্দিতে আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন বলে মন্তব্য করেছে আদালত। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, সোহেল চৌধুরী কোনো অখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন না। আজিজ মোহাম্মদের সঙ্গে তার পূর্ববিরোধ ছিল। আদালত আরও বলে, ‘সাক্ষীরা পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। তারা সত্য গোপনের চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘদিনের পুরনো মামলার অনেক সাক্ষী মারা গিয়েছে, দুই আসামির ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে বারবার সমন দেওয়ার পরও আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি এবং যেসব সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন, তারা আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।’
আদালত বলে, ‘প্রতিটি মৃত আত্মাই বিচারের প্রত্যাশা করে। ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজনরাও বিচার দেখতে চায়। সবকিছু বিবেচনা করে আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আদনান সিদ্দিকী ও বান্টি ইসলাম খুনের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছে। তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হলো।’
যা বলল রাষ্ট্রপক্ষ : রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) সাদিয়া আফরিন শিল্পী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে মামলাটি পরিচালনা করতে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ছিল সাক্ষী হাজির করা। যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের অনেকেই ওই ক্লাবের কর্মচারী, দারোয়ান, গাড়িচালক। তারা আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সত্য গোপন করেছেন। এজন্য অন্তত তিনজন সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করেছিলেন আদালত। আর অন্য সাক্ষীদের মধ্যে যাদের ওপর ভরসা ছিল তাদের অনেকেই এই দীর্ঘ সময়ে মারা গেছেন। যারা এসেছেন তাদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে আদালত রায় দিয়েছেন।’
ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করা হবে। এরপর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের সাজা বাড়ানো ও খালাসপ্রাপ্তদের নিয়ে হাইকোর্টে আপিলের সিদ্ধান্ত হবে।’ আসামি ইমনের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সাক্ষ্য ও নথিতে প্রমাণিত হয়নি। তাই তিনি খালাস পেয়েছেন।
