বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনাবেচার নতুন পদ্ধতি ‘ক্রলিং পেগ’ নীতি ঘোষণার পরপরই অস্থির হয়ে উঠেছে কার্ব মার্কেট (খোলাবাজার)। সরকার ডলারের দাম ১১৭ টাকা নির্ধারণের পরের দিনই ১২৫ থেকে ১২৭ টাকায় ডলার বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে। ডলারের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোসহ অন্যান্য বিদেশি মুদ্রার লেনদেনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অনেক মানি এক্সচেঞ্জেই ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর, ফকিরাপুল, পল্টন, মতিঝিল এলাকার মানি এক্সচেঞ্জগুলো ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের এলসি খোলায় দামও বেড়েছে। গত বুধবার ১১৫ টাকায় এলসি করছিল এ রকম ব্যাংক গতকাল ১১৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১১৮ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দর নিয়েছে বলে জানা গেছে। এতে করে আমদানি করা পণ্যের দাম আরও বাড়বে।
খোলাবাজারে যেসব এলাকায় গত বুধবার প্রতি ডলার ১১৬ থেকে ১১৭ টাকায় বিক্রি হয়েছে গতকাল সেখানে ১২৫ থেকে ১২৭ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে অধিকাংশ এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতেই ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বেড়েছে। দুপুরে যেসব মানি এক্সচেঞ্জে ১২৫ টাকায় ডলার পাওয়া গেছে, বিকেলেই সেখানে ১২৭ টাকা করে দাম চেয়েছে। অবশ্য কেনার ক্ষেত্রে যে যার মতো করে দর ঠিক করে দিচ্ছে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো।
মিরপুরের জিসান মানি এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো ডলার নেই। কেউই আজ (বৃহস্পতিবার) ডলার বিক্রি করতে আসেননি। কিনতে না পারলে বিক্রি করব কীভাবে।’ তিনি জানান, যখন ডলারের রেট ঊর্ধ্বমুখী থাকে তখন যাদের কাছে ডলার রয়েছে আরও দাম বাড়ার আশায় তারা ধরে রাখেন। এতে করে ক্রাইসিস তৈরি হয়।
এদিকে ডলারের দাম বাড়ায় অনেক মানি এক্সচেঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ভীতি তৈরি হয়েছে। এক্সচেঞ্জ হাউজে ডলার থাকলেও গ্রাহক কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে তারা বিক্রি করছে না। গত বছর ডলারের উচ্চ দাম ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে অভিযান চালিয়েছিল। সে সময় কয়েকটি মানি এক্সচেঞ্জের লাইসেন্সও বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি মানি এক্সচেঞ্জে ক্রেতা সেজে ডলার কিনতে চাওয়ায় সেখানে কর্মরত একজন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত বিকেলে হয়েছে। এখনো সিদ্ধান্তই নিতে পারিনি কতো দামে বিক্রি করব। বিকেলের দিকে ভিসা-পাসপোর্ট নিয়ে আসেন, দেখি কি করা যায়। পরে এ প্রতিবেদক চলে আসার সময় পেছন দিক থেকে ডাকা হয়। বলা হয়, ‘মামা যদি কিনতে চান এক দাম লাগবে ১২৬ টাকা। যদি নিতে চান তাহলে পাশের চায়ের দোকানে আসেন।’
পাশেই আরেক কাউন্টারের একজন বলেন, ‘মামা এখন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা আছেন। আপনি সত্যিকারের ক্রেতা নাকি গোয়েন্দা বুঝি কেমনে। এখনো বিক্রি শুরু করিনি, অল্প পরিমাণ আছে, সন্ধায় কল দিয়ে আসবেন। দোকানের বাইরে গিয়ে দিয়ে আসব।’ দাম কত নেবেন এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আগে আসেন তারপর বাধবে না। তবে ১২৫ টাকার নিচে দেওয়া যাবে না।’
এদিকে ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য বিদেশি মুদ্রা বিনিময়েও দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ মানি চেঞ্জারগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ১০ টাকা ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার দাম বেড়েছে। ভারতীয় মুদ্রার দর গত বুধবার পর্যন্ত ১ টাকা ৪০ পয়সা ছিল, গতকাল তা ১ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। অন্যান্য দেশের ম্দ্রুার দামও বাড়িয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘আমাদের খুচরা ডলার পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ ঠিক আছে। এখন কে বিক্রি করবে কি করবে না, এটা তার নিজস্ব বিষয়। যারা মানি এক্সচেঞ্জে ডলার পায়নি তারা ব্যাংকে গেলেই ডলার কিনতে পারবেন। ব্যাংকে এখন ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ক্যাশ ডলার মজুদ আছে। যার ডলার দরকার ব্যাংকে গেলেই পাবেন।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বুধবার এক সার্কুলারে জানায়, ডলারের ক্রয় ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রলিং পেগ বিনিময় পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ডলারের জন্য ক্রলিং পেগ মিড-রেট (সিপিএমআর) নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা। এখন থেকে আন্তঃব্যাংক ও গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেনে তফসিলি ব্যাংকগুলো সিপিএমআরের আশপাশে ডলার ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে।
‘ক্রলিং পেগ’ হচ্ছে দেশের স্থানীয় মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি। এটা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত নীতিরই মতোই। এ নীতি হচ্ছে কোনো মুদ্রার বিনিময় হারকে নির্দিষ্ট একটি সীমার মধ্যে ওঠানামার অনুমতি দেওয়া। অর্থাৎ ডলারের বিনিময় হার ওঠানামার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা রেখা ঠিক করে দেওয়া। সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারজনিত অস্থিরতা তৈরি হলে এ সীমা সমন্বয় করা হয়।
