চিরশান্তিতে অক্লান্ত রনো

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৮:২০ এএম

পূর্ববাংলার রাজনীতিতে ষাটের দশক ছিল একটি গৌরবোজ্জ্বল সময়। সে সময় যেসব তরুণ ছাত্র-রাজনৈতিক কর্মীর উত্থান ঘটে, তাদের মধ্যে একজন হায়দার আকবর খান রনো। সুদীর্ঘ জীবনে জাতীয় পর্যায়ে সব রাজনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রশ্নে নিজের আদর্শের প্রতি অটল ছিলেন। কোনো প্রলোভন তাকে আদর্শ থেকে টলাতে পারেনি। আজীবন মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করে যাওয়া এই বামপন্থি নেতা গত শুক্রবার রাত ২টা ৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ সময়ে এসেও নিজের কর্নিয়া দান করেছেন দুজন দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য।

হায়দার আকবর খান রনো দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসতন্ত্রের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ৬ মে পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। সেখানেই মধ্যরাতে মারা যান তিনি।

হায়দার আকবর খান রনোর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। তার দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সঙ্গী ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘রনো আমার বাল্যবন্ধু ছিলেন। তার পারিবারিক আবহর কারণে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। যেটা ছাত্র অবস্থাতেই আমরা তার মধ্যে দেখেছি। পরে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলাম তখন সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে যে প্রবেশ ঘটল আমার, সেখানেও কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দুজনে একত্রে পার্টি গড়েছি। সব আন্দোলনে রনো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে তার সঙ্গে আমার মতবিরোধ হয়। মতাদর্শের কারণে তিনি পার্টি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কখনোই আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কচ্ছেদ হয়নি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। শেষ সময়ে আমি তার পাশে থাকতে পেরেছি। আচ্ছন্ন অবস্থায় কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন, বলতে পারেননি।’

আরেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান বলেন, ‘হায়দার আকবর খান রনো একদিকে যেমন রাজনীতিক ছিলেন, তেমনি তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। এমন রাজনীতিবিদ আমাদের দেশে খুব সহজে জন্ম নেবে না। তিনি আমাদের আগেই শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে টঙ্গীতে বিরাট প্রভাব তৈরি করেছিলেন।’

মঞ্জুরুল আহসান খান বলেন, ‘তিনি আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। তার মতো এ রকম পন্ডিত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া খুব কঠিন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন। সব সময় তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখতে হতো, চোখে দেখতেন না, তারপরও তিনি লিখে গেছেন। রনো ভাই আমাদের যেটা শিক্ষা দিয়ে গেছেন, সেটা হলো তিনি বন্ধুত্ব, পার্টি কোনো কিছুই তাকে তার আদর্শ থেকে টলাতে পারেনি। তিনি মার্কসবাদী তত্ত্ব অনুসারে কাজ চালিয়ে গেছেন। এটা যার বিরুদ্ধে যাক, এ বিষয়ে তার পরোয়া ছিল না। এটা তার বিরাট গুণ।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা মার্কসবাদী হায়দার আকবর খান রনো ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। নড়াইল জেলার এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান রনো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জন্ম হয়েছিল বলে তার ডাকনাম রাখা হয়েছিল রনো। পিতৃভূমি নড়াইল জেলার নড়াইল থানার অন্তর্গত চিত্রা নদীর পাড়ে বরশালা গ্রাম। তার নানা ছিলেন ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিক সৈয়দ নওশের আলী। বাবা হাতেম আলী খান ছিলেন একজন প্রকৌশলী।

হায়দার আকবর খান রনো অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। স্কুলজীবনে তিনি বরাবরই ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। যশোর জিলা স্কুল, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তিনি মেধাতালিকায় ১২তম স্থান লাভ করেছিলেন। ১৯৬০ সালে ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পদার্থবিদ্যার কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি কারাবাস ও অন্যান্য কারণে। পরে তিনি কারাগারে অবস্থানকালে আইনশাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি হাইকোর্টের সনদও লাভ করেছিলেন। কিন্তু কোনো দিন ওকালতি পেশা গ্রহণ করেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ১৯৬০ সালে তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে তার সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তার নেতৃত্বে ও দক্ষ সাংগঠনিক যোগ্যতার কারণে সে সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের কারণে ১৯৬৪ সালে তার নামে হুলিয়া বের হয়। ১৯৬৫ সালের তার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন, মুক্তির পর তিনি আর ছাত্রসংগঠন করবেন না এবং সরাসরি শ্রমিক বা কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সরাসরি শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তার ভূমিকা ছিল। ১৯৬৯-৭০ সালে দ্বিতীয় সামরিক শাসন আমলে টেক্সটাইল শ্রমিকদের যে ঐতিহাসিক দুই মাসব্যাপী বেআইনি ধর্মঘট হয়েছিল, রনো ছিলেন তার নেতৃত্বে। ১৯৭০ সালে তিনি তদানীন্তন সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় ১৪টি সশস্ত্র ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করার কাজে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। সম্মেলনেও তিনি যোগদান করেছেন।

১৯৭৩ সালে কমরেড রনো ও অন্য সহকর্মীরা মিলে গঠন করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী)। পরে ১৯৭৯ সালে পার্টির নাম পরিবর্তন করা হয় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। প্রথম থেকেই তিনি পলিট ব্যুরোর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯-৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৯ সালে রাশেদ খান মেননের সঙ্গে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিরোধ তৈরি হলে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির একাংশ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

একদিকে রাজনীতি, অন্যদিকে তিনি লেখালেখিও করতেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন এমনকি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ওপরও অজস্র লেখালেখি করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে শতাব্দী পেরিয়ে, ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব, পুঁজিবাদের মৃত্যুঘণ্টা, রবীন্দ্রনাথ : শ্রেণী দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ, বাংলা সাহিত্যে প্রগতির ধারা, পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ, মার্কসবাদের প্রথম পাঠ, মার্কসীয় অর্থনীতি, উত্তাল ষাটের দশক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত